ইরানি দার্শনিক শেইখ সোহরাওয়ার্দির পুস্তক 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি'
গত কয়েক পর্বে আমরা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির চারটি বিখ্যাত বইয়ের প্রতীকী ও রহস্যময় উপমা-সমৃদ্ধ গল্প নিয়ে আলোচনা করেছি।
তার ওই চারটি বইয়ের নাম হল 'জিব্রাইলের পাখা বা পালকের আওয়াজ', 'পিপড়া বা উই পোকার কথোপকথন', 'প্রেমের বাস্তবতা বিষয়ক রচনা'' এবং সাফিরই সিমোর্গ' বা 'সিমোর্গের দূত'। আজ আমরা সোহরাওয়ার্দির আরেকটি বই 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বা 'আকলে সোর্খ' নিয়ে আলোচনা করব। তার এ বইটিও প্রতীকী ও রহস্যময় উপমা-সমৃদ্ধ এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য রচনা।
সোহরাওয়ার্দির নানা মতামত ও চিন্তাধারার সারাংশ তুলে ধরা হয়েছে 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বা 'আকলে সোর্খ' শীর্ষক ছোট্ট এ বইয়ে।
ফরাসি প্রাচ্যবিদ অধ্যাপক হেনরি কোরবিন শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বা 'আকলে সোর্খ' বইটিসহ তার বেশ কিছু বই অনুবাদ করেছেন ফরাসি ভাষায়। ফ্রান্সের প্রখ্যাত নাট্যকার ও লেখক ইউজেনি ইউনেস্কো 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বা 'আকলে সোর্খ' বইটির অনুবাদ পড়ার পর অধ্যাপক কোরবিনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছেন:

'আমি দারুন বিস্ময় নিয়ে 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বা 'আকলে সোর্খ' শীর্ষক বইটি পড়েছি। আধ্যাত্মিক জগতের শীর্ষস্থানীয় ও সর্বোচ্চ বিস্ময়-জাগানো কিছু টেক্সট বা গদ্য আপনি তুলে ধরলেন পাশ্চাত্যের কাছে। নিঃসন্দেহে আপনি এই বাক্যগুলোকে ইরানিদের কাছেও জীবন্ত করেছেন। এই বাক্যগুলো বেশ কঠিন এবং যে কোনো সময় তা পড়া যায় না। এসব বাক্য পড়ার জন্য এমন সময়ের জন্য অপেক্ষা করা উচিত যখন হৃদয় আপনাকে সাহায্য করবে। কিন্তু যখন আমি পথ হারিয়ে ফেলি আপনার নোট ও ব্যাখ্যাগুলো আমাকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে। আসলে সম্ভবত আমার জীবনের শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো বই বা লেখা আমার জন্য পড়ার দরকার হবে না। আমি এ বইটি বার বার পড়তেই থাকব।'
শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বা 'আকলে সোর্খ' বইটির নামকরণ প্রসঙ্গে ডক্টর দিনায়ি বলেছেন, অতীতকালে বলা হত লাল রং হচ্ছে কালো ও সাদার মিশ্রণ। সোহরাওয়ার্দি লাল-বুদ্ধিবৃত্তি বলতে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে বুঝিয়েছেন। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি প্রকৃতিগতভাবে সাদা ও উজ্জ্বল বা নুরানি, কিন্তু মানুষের দেহ হচ্ছে অন্ধকার। তাই অন্ধকারের মধ্যে যখন আশ্রয় নেয় স্বাভাবিক, সাদা, স্বচ্ছ ও নুরানি বুদ্ধিবৃত্তি তখন তা হয়ে যায় লাল বুদ্ধিবৃত্তি।
ডক্টর ইব্রাহিম দিনায়ির মতে সোহরাওয়ার্দির চিন্তাধারা প্রকাশের ক্ষেত্রে তার ওপর মহাকবি ফেরদৌসি ও তার চিন্তাধারার গভীর প্রভাব দেখা যায়। দিনায়ি লিখেছেন: 'সোহরাওয়ার্দি সম্ভবত বার বার ফেরদৌসির শাহনামা পড়েছেন। কিন্তু একান্তই নিজস্ব আলোকিত দর্শন তুলে ধরার ক্ষেত্রে নানা প্রতীক ও রহস্যময় ভাষা ব্যবহারে অভ্যস্ত সোহরাওয়ার্দি কোনো উৎস বা মাধ্যম ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেননি। আর এটা তিনি ইচ্ছে করেই করেছেন। আর এ জন্যই তিনি ফেরদৌসির নাম উল্লেখ করেননি। অবশ্য তার এ সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা কারণও থাকতে পারে।'
সোহরাওয়ার্দির লাল বুদ্ধিবৃত্তি শীর্ষক বইটিতে প্রাচীন ইরানি সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। অধ্যাপক আবুল কাসেম ইসমাইলপুরের মতে সোহরাওয়ার্দির ১৩টি ফার্সি পুস্তিকা বা ছোট্ট বইয়ের মধ্যে ৫টিতে প্রাচীন ইরানি রূপকথার বহু পরিভাষা দেখা যায়। আকলে সোর্খ বা লাল বুদ্ধিবৃত্তি এ পাঁচটির অন্যতম। সোহরাওয়ার্দির প্রতীকী বা রহস্যময় গল্পগুলোতে আভেস্তা ও শাহনামার রূপকথার তথা প্রাচীন ইরানি রূপকথায় ব্যবহৃত নানা চরিত্রের নাম দেখা যায়। এসব চরিত্র ব্যবহারের উদ্দেশ্য রূপকথা তুলে ধরা নয় বরং দার্শনিক ভাবধারা তুলে ধরা। অবশ্য সোহরাওয়ার্দির এই লেখাগুলো গল্প ও বর্ণনামূলক সাহিত্য হিসেবেও গুরুত্ব পাবার দাবি রাখে। তিনি যেসব জায়গায় আলো ও অন্ধকারের প্রতীক ব্যবহার করেছেন তা হয়েছে একান্তই খাঁটি ইরানি উপমা।
সোহরাওয়ার্দি কখনও কখনও রূপকথা তৈরি করেছেন। আবার কখনওবা রূপকথা তুলে ধরেছেন তথা রূপকথার চরিত্রগুলোকে ব্যবহার করেছেন দার্শনিক নানা ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য। 'ইমাদউদ্দিনকে উৎসর্গ করা ফলকগুলো' শীর্ষক বইয়ে কিয়ামত বা পুনরুত্থানকে ফুটিয়ে তোলার জন্য সোহরাওয়ার্দি ব্যবহার করেছেন শাহনামার ফেরিদুন ও জাহ্হাকের গল্প যা দেখা যায় আভেস্তাতেও। তিনি আলো ও অন্ধকারকে কিংবদন্তির উপমার মতই ব্যবহার করেছেন যেখানে ফেরিদুন হচ্ছেন আলোর প্রতীক ও জাহ্হাক হচ্ছে অন্ধকারের উপমা। অবশ্য সোহরাওয়ার্দি কখনও কখনও একান্তই নিজস্ব রূপকথা ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রেও তার সৃষ্টিশীলতা অনন্য ও অপূর্ব।
বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর ইসমাইলপুরের মতে 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বইয়ে যেসব রূপকথার উপাদান ব্যবহার করেছেন সোহরাওয়ার্দি সেসব তার দারুন সৃষ্টিশীল নৈপুণ্যেরই স্বাক্ষর। 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' হচ্ছে চূড়ান্ত বা সামগ্রীক বুদ্ধিবৃত্তি ও চরম বাস্তবতার প্রতীক। এর আত্মপ্রকাশকে দেখানো হয়েছে একজন বৃদ্ধ লোক হিসেবে যার চুল ছিল লাল রংয়ের। এ বইয়ে সিমোর্গ, তুবা গাছ ও আরও কিছু প্রতীক ব্যবহার করেছেন সোহরাওয়ার্দি। আর এসবই তার নিজস্ব উদ্ভাবন। সোহরাওয়ার্দি 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' শীর্ষক বইয়ে এমনকি শাহনামার চরিত্র 'জাল'-কেও ব্যবহার করেছেন অনন্য কায়দায়।
আভেস্তা ভাষায় 'জাল' শব্দের আভিধানিক অর্থ সময় এবং তার চুল সাদা ছিল বলে তাকে আলো ও সময়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন সোহরাওয়ার্দি। এ ছাড়াও তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ দেখানো হয়। কারণ রূপকথায় 'জাল' তার বাবার মাধ্যমে পরিত্যক্ত হন এবং তাকে ফেলে রাখা হয় মরুভূমিতে। আর সেখানে তাকে উদ্ধার করে সিমোর্গ। সোহরাওয়ার্দি দেখিয়েছেন যে এ সিমোর্গের বাসা হল তুবা গাছে। আর এই কল্প-চিত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দি আলোর নেমে আসা বা পতনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন সোহরাওয়ার্দির 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি'সহ তার প্রতীকী গল্পগুলোর কোনো কোনোটি পোস্ট-মডার্ন বা উত্তর-আধুনিক গল্পের উৎস বা আদর্শ। লাল চুলের সেই বৃদ্ধ ও বর্ণনাকারী যিনি এক বাজপাখি বা শাহিন হিসেবে ভাগ্য-শিকারিদের হাতে থাকে তা এক নব-সৃষ্টি যা আধুনিক যুগের গল্প লিখন বা কথা-সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সোহরাওয়ার্দির 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি বা আকলে সোর্খ বই বা গল্প পড়লে বোঝা যায় ফার্সি সাহিত্য রোমান্টিকতা ও রহস্যময় প্রতীক ব্যবহারের শিল্পে কত বেশি সমৃদ্ধ! #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।