ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯ ১৬:০৬ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বে আমরা খ্রিস্টিয় দ্বাদশ শতকের ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির কয়েকটি বিখ্যাত বইয়ের প্রতীকী ও রহস্যময় উপমা-সমৃদ্ধ গল্প নিয়ে আলোচনা করেছি।

এ মহান দার্শনিকের 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি'  শীর্ষক বইটির গল্প নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম গত পর্বে।

সোহরাওয়ার্দির দর্শন ও ইসলামী আধ্যাত্মিক জ্ঞান তথা ইরফান বিষয়ক এ বইটিতে মহাকবি ফেরদৌসির শাহনামা ও প্রাচীন ইরানের নানা ভাব, বিষয় এবং প্রতীকের প্রভাব দেখা যায়। এতে রয়েছে পাখির মুখ দিয়ে রহস্যময় গল্পের বর্ণনা।

এ বইয়ের রহস্যময় গল্পের দুই প্রধান চরিত্র হল বাজ পাখি ও লাল চুলের বৃদ্ধ ব্যক্তি।

সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' বইয়ের বাজ পাখি তার নিজের ও অতীত দিনের অস্পষ্ট নানা স্মৃতিচারণ করে। বাজ পাখি হচ্ছে এমন মানুষের প্রতীক যে তার আসল দেশ থেকে দূরে রয়েছে এবং আটকা পড়েছে মাটির পৃথিবীতে। তার অবস্থা হচ্ছে বস্তু ও প্রবৃত্তির কারাগারে বন্দি দুর্দশাগ্রস্ত আত্মার মত।

সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' শীর্ষক বইটির রহস্যময় গল্পের দ্বিতীয় চরিত্র হল লাল চুলের অধিকারী এক বৃদ্ধ। এই বৃদ্ধ হচ্ছে মানুষের আকল্‌ বা বিবেকের প্রতীক। বাজ পাখি তার কাছে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে। আর সবজান্তা এই বৃদ্ধ সব প্রশ্নের জবাব দিতে থাকেন ধাঁধার বা রহস্যময় উপমা আর প্রতীকের মাধ্যমে।

সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' শীর্ষক বইটির রহস্যময় গল্পের দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র তথা বৃদ্ধ লোকটি বাজ পাখির কাছে তার বিশ্ব-ভ্রমণে দেখা বিশ্বের সাতটি বিস্ময়কর বস্তুর বর্ণনা দেয়ার সময় দ্বিতীয় বিস্ময়কর বস্তু হিসেবে রাতে জ্বলা দামী পাথরের কথা বলছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী ওই দামী পাথরটি রয়েছে কুহে কাফ পর্বতমালার তৃতীয় পাহাড়টিতে। আর ওই পাথরটি রাতের অন্ধকার দূর করে আলো দান করতে পারে। বৃদ্ধ লোকটি আরও জানান যে ওই দামী পাথরটির আলোর উৎস হল তুবা নামক গাছ। এরপর ওই বৃদ্ধ ব্যক্তি বাজ পাখির কাছে ১২টি কারখানা, সাত শিক্ষক বা অধ্যাপক ও তাদের শাগরেদ তথা ছাত্রদের কথা বলেন। তারা সবাই দিবা নামক অতি সূক্ষ্ম রেশমি কাপড় বোনেন। তাদের এই কাপড় আসলে দাউদ নবীর সেই বর্ম যা বাজ পাখির শরীরে দেয়া হয়। আর এ জন্যই সে ওড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং তার হাত ও পা আবদ্ধ হয়ে যায়।

হযরত দাউদ (আ)'র বর্মে ছিল জালের মত অসংখ্য লোহার আংটি ও সেগুলো ছিল খুবই মজবুত।

সোহরাওয়ার্দির 'আকলে সোর্খ' বা 'লাল বুদ্ধিবৃত্তি' শীর্ষক বইটির রহস্যময় গল্পের দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র তথা বৃদ্ধ লোকটি বাজ পাখিকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তার সব কাজের লক্ষ্য হল বাজ পাখির বর্মের আংটির এই রিংগুলো খুলে ফেলা ও তাকে মুক্তি দেয়া। এই বর্মটি অনেক সুতো বা তারের মতই জটা বেধে বাজ পাখির গলায় পড়েছে এবং সেগুলো ছিন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।  কেবল খরগোশের ব্লেড বা ক্ষুর দিয়েই এসব তার বা সুতো কাটা সম্ভব।  ওই বৃদ্ধ ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী এই বিশেষ ব্লেড বা ক্ষুর জল্লাদের হাতে কিংবা কারাগার-প্রধানের হাতে দেয়া হয়েছে। এই জল্লাদ সব বর্মের আয়ু সম্পর্কে জানেন এবং কেবল যথাসময়ে এর বাঁধগুলো ছিন্ন করবেন। কিন্তু সমস্যা হল এটা যে জল্লাদ যদি ওই বর্মকে টুকরো টুকরো করতে চান তাহলে তাতে বাজ পাখিরও ক্ষতি হবে।

সোহরাওয়ার্দির লাল বুদ্ধিবৃত্তি শীর্ষক বইয়ে বাজপাখি ও বৃদ্ধের ঘটনার এ পর্যায়ে বাজ ওই বৃদ্ধের কাছে আবেদন জানিয়ে বলে যে তাকে এমন পন্থা শিখিয়ে দেয়া হোক যাতে তার শরীরে ওপর চাপিয়ে দেয়া বাঁধগুলো কোনো ক্ষতি ছাড়াই খোলা যাবে। বৃদ্ধ তখন তাকে এই সমস্যা সমাধানের পথও বাতলে দেন। তিনি বলেন, এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ রয়েছে জীবন নামক পস্রবণ বা ঝর্ণার মধ্যে। বাজ যদি এই ঝর্ণা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে ও সেখানে গোসল করে তাহলে তার কোনো ক্ষতি ছাড়াই শরীরে পোশাকের মত আটকে থাকা নানা বাঁধগুলো খুলে যাবে এবং এরপর সে খুব সহজেই হাল্কা পাখা নিয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়তে পারবে। আর এ অবস্থায় সে সূর্যের দিকে উড়ে গিয়ে মুক্তি বা সৌভাগ্যের পথ অর্জন করবে।

সোহরাওয়ার্দির আক্‌লে সোর্খ বা লাল বুদ্ধিবৃত্তি শীর্ষক বইয়ের বৃদ্ধ ও বাজ পাখির গল্প এখানেই শেষ হয়েছে।   

ইসলামী ধারার ইশরাকি দর্শন ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি ছিলেন মাশ্‌শা বা  অ্যারিস্টোটলীয় দর্শনের দিকপাল ইবনে সিনা ও ইবনে রোশদের দর্শনের যে দুই যুগ তার মাঝামাঝি সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা বড় দার্শনিক। ইসলামী  দর্শনের এ দুই স্বর্ণযুগের মাঝামাঝি পর্যায়ে সোহরাওয়ার্দির যুগটি  জ্বলজ্বল করছে এক স্বর্ণালী বৃত্তের মতই।  

সোহরাওয়ার্দিকে ইসলামী দর্শনের ইস্ফাহানি ঘরানার পটভূমি সৃষ্টির রূপকারও বলা হয়। কারণ দর্শনের ইস্ফাহানি ঘরানার মির দমাদ ও মোল্লা সাদরার মত প্রখ্যাত অনেক ইরানি দার্শনিক সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনের চিন্তাধারায় হয়েছিলেন গভীরভাবে প্রভাবিত। সোহরাওয়ার্দি একদিকে যেমন ছিলেন সৃষ্টিশীল দার্শনিক তেমনি অন্য দার্শনিকদের চিন্তাধারা সংযোজন ও বিয়োজন এবং বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও ছিলেন অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ। তার এ ধরনের  কিছু চমৎকার বিশ্লেষণ-ভিত্তিক ও সুফি-তাত্ত্বিক রচনাও তাকে দিয়েছে বহুমুখী প্রতিভাধর মহান দার্শনিকের অনন্য সম্মান।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।