ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি
পাশ্চাত্যে ইরানি দার্শনিক ও আরেফ শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি বিষয়ক গবেষণা প্রথম কে শুরু করেছিলেন তা সুনিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
তবে নানা সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে মনে করা হয় যে জার্মান দার্শনিকরাই গত শতকের শেষের দিকে এই মহান ইরানি দার্শনিক সম্পর্কে গবেষণা শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন ফরাসি গবেষকরা। এরপর সীমিত পর্যায়ে সোহরাওয়ার্দি বিষয়ক গবেষণা শুরু করেন ব্রিটিশরা। আর ইরানি গবেষকদের মধ্যে যারা সোহরাওয়ার্দিকে পশ্চিমাদের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেন তাদের মধ্যে সাইয়্যেদ হুসাইন নাসর্-এর নাম সবার আগে উল্লেখ করা যায়। নাসর্ সোহরাওয়ার্দিকে নিয়ে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় লিখে তাঁকে পাশ্চাত্যে ব্যাপক মাত্রায় তুলে ধরেছেন।
সোহরাওয়ার্দির চিন্তাধারা নিয়ে স্পেন ও ইতালির একদল গবেষকও লেখালেখি করেছেন। সোহরাওয়ার্দিকে নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে ভারত উপমহাদেশেও।
পাশ্চাত্যের নানা বইয়ে বিশেষ করে দর্শনের ইতিহাস ও দর্শনের বিশ্বকোষ-জাতীয় বইগুলোতেই সোহরাওয়ার্দির নাম সর্বপ্রথম দেখা গেছে। এসব বইয়ে সোহরাওয়ার্দিকে তুলে ধরা হয়েছে অ্যারিস্টোটলীয় দর্শনের সমালোচক হিসেবে। পাশ্চাত্যে ইলিয়াদের মত কোনো কোনো লেখক ইরানের এই মহান দার্শনিককে ফারাবি ও ইবনে সিনার মত ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি উল্লেখ করে তাকে শীর্ষস্থানীয় মুসলিম দার্শনিকদের অন্যতম বলে অভিহিত করেছেন।
ম্যাক্স হার্টেন শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি বিষয়ে জার্মানির একজন বড় গবেষক। সোহরাওয়ার্দির আলোকিত দর্শন বিষয়ে তার বইকে অন্য জার্মান গবেষকরা আকর-গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। হার্টেন সোহরাওয়ার্দির আলোকিত দর্শন বিষয়ে যে বই লিখেছেন তাতে মোল্লা সাদরার কিছু টিকা বা ব্যাখ্যাও জুড়ে দিয়েছেন।
শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি বিষয়ক আরেকজন বড় জার্মান গবেষকের নাম অটো স্পাইস। তিনি এই মহান ইরানি দার্শনিকের তিনটি বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। এ তিনটি বই হল: সিমোর্গের দূত বা সিমোর্গের আহ্বান, উই পোকা বা পিপড়ার কথপোকথন ও পাখির রচনা বা দ্যা ট্রিটাইজ অফ দি বার্ড The Treatise of the Bird.
সোহরাওয়ার্দি বিষয়ক আরেকজন বড় জার্মান গবেষকের নাম হেলমুট রিটার। হেলমুট রিটার দু’টি দীর্ঘ প্রবন্ধে সোহরাওয়ার্দির দর্শনের মূল ও কেন্দ্রীয় বক্তব্যগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এ ছাড়াও জার্মান লেখক সাইমন ভ্যান ডিনবার্গ সোহরাওয়ার্দির আলোর পিরামিড বা 'হায়াকাল আননুর' শীর্ষক বইটির কিছু অংশ অনুবাদ করেছেন এবং কিছু সংশ্লিষ্ট টিকা ও নোটও যুক্ত করেছেন একই বইয়ে।
ফরাসি ভাষায় সোহরাওয়ার্দিকে নিয়ে সর্বপ্রথম লেখালেখির কাজ করেছেন কারা দোঁ ভো ' আলোকিত দর্শন ' শীর্ষক বইয়ে। বইটি লেখা হয়েছিল ১৯০২ সালে। ইরানের এই মহান দার্শনিকের বিষয়ে পরবর্তী প্রজন্মের বিখ্যাত ফরাসি গবেষকদের মধ্যে শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হলেন অধ্যাপক হেনরি কোরবিন। সোহরাওয়ার্দি বিষয়ে তার অবদান ও কাজ অন্য সবার চেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছে। ইসলামী দর্শনকে পাশ্চাত্যে তুলে ধরার ক্ষেত্রে কোরবিনের চেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন – এমন পশ্চিমা চিন্তাবিদদের সংখ্যা খুবই কম। তার লেখাগুলো কেবল পাশ্চাত্যে নয় ইরানেও ব্যাপকভাবে সাড়া জাগিয়েছে। সোহরাওয়ার্দিকে নিয়ে কোরবিনের লেখা অনুবাদ ও ব্যাখ্যামুলক বইয়ের সংখ্যা অনেক। তবে এ বিষয়ে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল সোহরাওয়ার্দির রচনা বিষয়ে লেখা নানা ধরনের গবেষণামূলক প্রবন্ধ। কোরবিনের এসব প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছে দু’টি ম্যাগাজিনে। সোহরাওয়ার্দিকে নিয়ে এমন সময় কোরবিনের লেখাগুলো প্রকাশ করা হয় যখন ইরানের এই মহান দার্শনিক ইরান ও পাশ্চাত্যে ব্যাপক উদাসীনতার শিকার হয়েছিলেন।

শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দিকে নিয়ে লেখা অধ্যাপক কোরবিনের প্রবন্ধগুলোতে ইরানের ইসলাম এবং সোহরাওয়ার্দির চিন্তাধারার সঙ্গে প্লেটোনিক ও নিও-প্লেটোনিক চিন্তাধারার বন্ধনগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যাপক কোরবিন ইসলামী দর্শনের ইতিহাস ও আলোকিত ব্যক্তি বিষয়ক যে দু’টি গবেষণামূলক বই উপহার দিয়েছেন তা ইংরেজি, জার্মান ও ইতালিয় ভাষায় অনূবাদ করা হয়েছে। এ দুটি বইয়ে সোহরাওয়ার্দির চিন্তাধারা তুলে ধরা হয়েছে। The Man of Light in Iranian Sufism বা 'ইরানি সুফিবাদের আলোকিত ব্যক্ত্বিত্ব' শীর্ষক বইয়ে সুফিবাদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কোরবিন সোহরাওয়ার্দির চিন্তাধারা ব্যবহার করেছেন এবং ইবনে আরাবির 'ওয়াহাদাতে অজুদ' তথা অস্তিত্বের একত্ব ও 'সেমনানির ওয়াহাদাতে শহুদ' তথা প্রত্যক্ষকরণের একত্ব বিষয়ক তত্ত্ব নিয়েও আলোচনা করেছেন। এ ছাড়াও কোরবিন এই বইয়ে সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি বা আলোকিত দর্শনের নানা বিষয়বস্তু এবং দূরপ্রাচ্য থেকে আলোকিত প্রাচ্যে নাফস্-এর আধ্যাত্মিক সফর সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন।
'ইশরাকি বা আলোকিত দর্শন ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা সোহরাওয়ার্দি' শীর্ষক বই অধ্যাপক হেনরি কোরবিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই। এ বইয়ে তিনি সোহরাওয়ার্দির জীবন ও চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করেছেন খুবই সুচারুভাবে।
সোহরাওয়ার্দি বিষয়ক দর্শন শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকজন যোগ্য ছাত্রও গড়ে তুলেছেন অধ্যাপক কোরবিন। সোহরাওয়ার্দির দর্শন-গবেষণার ক্ষেত্রে তার ছাত্রদের মধ্যে জুমবাত মাসিহি ও আমির নাফাকির নাম উল্লেখযোগ্য।
সোহরাওয়ার্দি বিষয়ক আরেকজন বড় ফরাসি গবেষক হলেন জর্জ আনাভাতি। তিনি সোহরাওয়ার্দির রচনার ওপর ইবনে সিনার কাঠামোতাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। আনাভাতির মতে সোহরাওয়ার্দি ছিলেন মূলত ইবনে সিনার অনুসারী। তিনি
সোহরাওয়ার্দির the Paths and Conversations বা 'আলমোশারে ও আলমোতারেহাত' তথা 'পথ ও সংলাপ' শীর্ষক বইয়ে উল্লেখিত অস্তিত্ব বিষয়ে এ মহান দার্শনিকের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। সোহরাওয়ার্দির এ সংক্রান্ত তত্ত্বের সঙ্গে ইবনে সিনার অস্তিত্ব সংক্রান্ত মতামতের মিল রয়েছে বলে আনাভাতি উল্লেখ করেন।
আবদুর রহমান বাদাভিও শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির অস্তিত্ব বিষয়ক মতামতের সঙ্গে আধুনিক অস্তিত্ববাদ বা একজিস্টিনসিয়ালিজমের তুলনা করে এ দুই দার্শনিক তত্ত্বের মধ্যে মিল ও অমিলগুলো তুলে ধরেছেন। শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি বিষয়ক আরেকজন বড় ফরাসি গবেষক হলেন লুইস গারদ্ত Louis Gardt. 'ইশরাকি দর্শনের গুরু সোহরাওয়ার্দি ও মুসলমানদের সংস্কৃতি শীর্ষক বইয়ে' লুইস গারদ্ত ফারাবির অ্যারিস্টটলিয় দর্শনের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দির দর্শনের তুলনা করেছেন।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।