মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির জীবন ও চিন্তাধারা
প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির জন্মস্থান, জন্মের তারিখ ও তার প্রাথমিক এবং উচ্চ-শিক্ষা ও শিক্ষামূলক সফর সম্পর্কে গত পর্বে আমরা কথা বলেছি।
সাইয়্যেদ আলী হামেদানি তার জীবদ্দশায় ইরান, তুর্কিস্তান ও ভারতসহ আশপাশের বহু অঞ্চলের নানা শহরের জনগণের মধ্যে ব্যাপক খ্যাতি ও বিশেষ সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন। তার খোদাভীতি ও সংযম-সাধনা এবং দর্শনসহ নানা বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান ছিল এমন জনপ্রিয়তা ও সম্মানের মূল কারণ। বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনা-ভিত্তিক নানা বিষয়ে সাইয়্যেদ আলী হামেদানির অনেক রচনা দেখা যায়। নানা শ্রেণীর মানুষের মধ্যে তার ছিল ব্যাপক আধ্যাত্মিক প্রভাব। আর তাই সমসাময়িক অনেক সরকার ও শাসকরা তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতেন এবং তার উপদেশ বা সতর্কবাণীগুলো মেনে চলতেন। সাইয়্যেদ হামেদানি তাজিকিস্তানের খাতলানে ইন্তেকাল করার পর তার অনুরাগীদের মন জয়ের জন্য তৎকালীন শাসক শ্রেণী এই মহান মনীষীর মাজারের শোভা বর্ধন, সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন।
কাশ্মিরের যে ভবনে থেকে সাইয়্যেদ আলী হামেদানি ওয়াজ-নসিহত করতেন ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন সেই ভবনটিতে একটি মসজিদ ও সুদৃশ্য স্মৃতি-স্তম্ভ নির্মাণ করেন তার স্থানীয় অনুরাগীরা। এটাও ছিল তার প্রতি বিশেষ সম্মানের প্রকাশ। আর এই স্থাপনাটি সেই হিজরি নবম শতক থেকে আজ পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের নানা তৎপরতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ও পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আশুরার সময় শোক মিছিলগুলো যখন এই স্থাপনার পাশ দিয়ে যেতে থাকে তখন মিছিলকারীরা সাইয়্যেদ আলী হামেদানির সেবামূলক নানা তৎপরতার স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদের পতাকা নিচে নামিয়ে আনেন। জম্মু ও কাশ্মির, গিলগিট ও বালতিস্তান অঞ্চলে বহু নতুন মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়েছে তার নামে। এ ধরনের অনেক স্থাপনার আগের নাম বদলিয়ে সাইয়্যেদ আলী হামেদানির নামে নামকরণ করা হয়েছে।

ইরানি কবি ও আরেফ বা সুফি সাধক মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির কোনো কোনো অনুরাগী ও ছাত্র এই মনীষীর নানা অলৌকিক ঘটনা বা কারামতের বিবরণ দিয়েছেন। মধ্য-এশিয়ার জনগণের মধ্যে এইসব কারামতের বিবরণ শোনা যায়। প্রতি বছরের ছয়ই জিলহজ তারিখে কাশ্মির, ভারত উপমহাদেশ ও বিশ্বের অন্য অনেক অঞ্চলে মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির সম্মানে নানা উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এই দিনটি হচ্ছে তার ওফাত বার্ষিকী। এসব অনুষ্ঠান ও সমাবেশে তার অনেক গুণ, অলৌকিক ঘটনা, আধ্যাত্মিক নানা অবস্থা ও তার রেখে যাওয়া প্রসিদ্ধ নানা শিক্ষা বা কার্যকর উপদেশ নিয়ে আলোচনা করা হয়। জনাব হামেদানির গদ্য ও পদ্য রচনার প্রশংসা করেছেন অনেক গবেষক ও ইতিহাসবিদ। এ নিয়ে তাদের অনেক লেখা বা রচনা দেখা যায়। মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির অনেক লেখা বা রচনা এবং সাহিত্য উর্দু, তুর্কি, পশ্তু ও ফরাসি ভাষায়ও হয়েছে অনূদিত। অনেকে তার রচনাগুলো সম্পর্কে মূল্যবান নানা ব্যাখ্যাগ্রন্থও লিখেছেন।
প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির লেখা বই ও পুস্তকের সংখ্যা ১১০টিরও বেশি। তার গদ্য ও পদ্য রচনাগুলোর ভাব ও মানের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বেশ আকর্ষণীয়। হামেদানির রচনাগুলোয় রয়েছে পবিত্র কুরআনের তাফসির, হাদিস, দর্শন, ইসলামী প্রজ্ঞা, নৈতিকতা, ইরফান ও সাহিত্য বিষয়ক নানা আলোচনা। তার সব লেখাই বেশ সুরুচিপূর্ণ, শিক্ষণীয় এবং আধ্যাত্মিক বিতর্কে সমৃদ্ধ। গদ্য ও পদ্য উভয় ক্ষেত্রেই নানা সূক্ষ্ম বিষয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সাইয়্যেদ হামেদানি। আর এ জন্যই তার লেখাগুলো সবার কাছেই আকর্ষনীয় ও সুখপাঠ্য।
প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি হিজরি ৭৮৬ সনে পবিত্র হজ পালনের জন্য কাশ্মির থেকে রওনা দেন। কয়েকদিন ধরে পথ চলার পর পাখলি অঞ্চলের শাসক তার শাসনাধীন অঞ্চলে কয়েকদিন অতিথি হিসেবে থাকতে হামেদানির প্রতি আমন্ত্রণ জানান যাতে জনগণ তার ওয়াজ-নসিহত ও জ্ঞান থেকে উপকৃত হয়। সাইয়্যেদ হামেদানি এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং প্রায় দশ দিন ধরে সেখানে বক্তৃতা দেন। এরপর আবারও হজের উদ্দেশে সফর শুরু করেন তিনি। কিন্তু এবার জনাব হামেদানি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ হওয়ার পাঁচ দিন পর হিজরি ৭৮৬ সনের ৬ জিলহজ নশ্বর দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নেন তিনি। মৃত্যুর আগের সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত তিনি মহান আল্লাহর স্মরণ বা জিক্রে মশগুল ছিলেন বলে জানা যায়। বলা হয় এ সময় তিনি বলছিলেন, ইয়া আল্লাহ! ইয়া হাবিব!- অর্থাৎ হে আল্লাহ! হে প্রিয় বন্ধু! জিক্রের এক পর্যায়ে তিনি বলছিলেন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আর এ সময় তার মহান আত্মা দেহ ত্যাগ করে মহান আল্লাহর সাক্ষাতের আহ্বানে সাড়া দেন।
প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি যে জায়গায় মারা যান সেই স্থানটি ছিল ইরান সীমান্তবর্তী বর্তমান আফগানিস্তানের কুনার শহরের কয়েক কিলোমিটার দূরে। গোসল ও কাফনের কাপড় পরানোর পর তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় খাতলান অঞ্চলে। এ অঞ্চলের কুলাব নামক এলাকায় দাফন করা হয় সাইয়্যেদ হামেদানির লাশ। কুলাবে তিনি নিজে গড়ে তুলেছিলেন একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা।
মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির মাজারের প্রথম স্থাপনাটি বর্তমানে তাজিকিস্তানের অংশ। এই মাজারে রয়েছে একটি বড় কক্ষ ও নয়টি ছোট রূম। এই নয়টি ছোট কক্ষে রয়েছে তারই বংশের দশ জন ব্যক্তির কবর।
মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির মৃত্যুর পর তার ছেলে সাইয়্যেদ মীর মুহাম্মাদ তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। তিনি বাবার তৎপরতাগুলো চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতেন। তিনি ৮০০ হিজরিতে ভারত থেকে মক্কায় যান এবং হজব্রত পালন করেন। সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ ৮০৯ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। পিতার কবরের পাশেই দাফন করা হয় তাকে। তার বংশধররা ইরানের হামেদানে, কাশ্মিরের শ্রীনগরে ও বালখ্ অঞ্চলের কাছাকাছি বালখাব অঞ্চলে পূর্বপুরুষদের তৎপরতার সেই ধারা তথা ইসলাম ধর্ম প্রচার ও মানুষকে সৎপথে আনার লক্ষ্যে ওয়াজ-নসিহত আর প্রশিক্ষণের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছিলেন।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।