জানুয়ারি ১৪, ২০২০ ১৫:১১ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা বলেছি প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির লেখা বই ও পুস্তকের সংখ্যা ১১০টিরও বেশি।

তার গদ্য ও পদ্য রচনাগুলোয় রয়েছে পবিত্র কুরআনের তাফসির, হাদিস, দর্শন, ইসলামী প্রজ্ঞা, নৈতিকতা, ইরফান ও সাহিত্য বিষয়ক নানা আলোচনা। সুরুচিপূর্ণ, শিক্ষণীয় নানা সূক্ষ্ম বিষয় ও আধ্যাত্মিক বিতর্কে সমৃদ্ধ এবং গদ্য ও পদ্যে স্বকীয়তায় ভাস্বর তার লেখাগুলো সবার কাছেই আকর্ষনীয় ও সুখপাঠ্য। মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি ইসলাম ধর্ম প্রচার, মানবীয় ও খোদায়ি দায়িত্বগুলো পালন করাকে পবিত্র বলে মনে করতেন এবং এসব লক্ষ্যে সফর, ওয়াজ-নসিহত ও প্রশিক্ষণে ব্যস্ত থাকতেন। আত্মিক পরিশুদ্ধি ও  নৈতিক নানা গুণের বিকাশের জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নিয়মিত ক্লাসও নিতেন এই মহান মনীষী। ধর্ম-প্রচারকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছিলেন হামেদানি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে তা তিনি শেখাতেন যাতে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা সংক্রান্ত কুরআনের নির্দেশ পালন করা যায়।

ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি শাসক ও প্রশাসকদের দিক-নির্দেশনা দিতেন এবং তাদেরকে ন্যায়বিচার ও  ইসলামের ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে চলতে বলতেন।  হামেদানির তত্ত্বাবধানে বা তারই উৎসাহে গড়ে উঠেছিল অনেক মসজিদ, মাদ্রাসা ও পাঠাগার।

মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি পরিকল্পিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক সফর শুরু করেছিলেন বিশ বছর বয়সে। তার এ কর্মসূচি কয়েক দশক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। মধ্য-এশিয়া, ট্রান্স-অক্সিয়ানা, পশ্চিম এশিয়া ও ভারত উপমহাদেশ সফর করেছিলেন তিনি এই কর্মসূচির আওতায়। উত্তর ও দক্ষিণ ভারত, শ্রীলংকা, তিব্বত ও কাশ্মিরও সফর করেছিলেন তিনি। তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্যোগ বহু মানুষকে দেখিয়েছে মুক্তির পথ। মধ্য এশিয়ার খাতলান অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে অবস্থানের সময় এখান তিনি দু'টি গ্রাম কিনে নিয়ে তা মহান আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করেন এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য এখানেই গড়ে তোলেন একটি মাদ্রাসা। এভাবে এ অঞ্চলে ধর্মপ্রচার ও প্রশিক্ষণমূলক তৎপরতাকে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন সাইয়্যেদ হামেদানি। এখানেই তিনি লিখেছিলেন কয়েকটি বই। 

উত্তর-পশ্চিম ভারত তথা জুম্মু-কাশ্মির ও তার আশপাশে দীর্ঘকাল ধরে অবস্থান করেছেন  মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি। কাশ্মির অঞ্চলে ইসলামের প্রচার শুরু হয়েছিল হিজরি প্রথম শতকেই। তবে এ অঞ্চলে ইসলামের প্রসার ও তা জোরদারের কাজ শুরু হয় হিজরি ৭৭৬ সাল থেকে। সাইয়্যেদ হামেদানির প্রচেষ্টায় এ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার বেছে নেন শিয়া মুসলিম মাজহাব। তিনি এ অঞ্চলে বেশ কয়েক বার সফর করেছিলেন এবং কখনও কখনও কয়েক বছর ধরে থেকেছেন এখানে। কাশ্মির অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারে তার সঙ্গী হয়েছিলেন ৭০০ জন প্রশিক্ষিত ছাত্র, সঙ্গী ও অনুসারী। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন বিশ্বনবী (সা)'র বংশধর তথা সাইয়্যেদ বংশের লোক। কাশ্মিরে  সাইয়্যেদ হামেদানি ও তার সঙ্গী আর ছাত্রদের প্রভাব খুব বেশি দেখা যায়। তাদের বংশধররা আজও এ অঞ্চলে বসবাস করছেন এবং এ অঞ্চলের বেশিরভাগ সাইয়্যেদ পরিবারের পূর্বপুরুষ হলেন হামেদানি ও তার সঙ্গীদেরই সেই প্রভাবশালী গ্রুপ।

কাশ্মিরের যে মহল্লায় বসবাস করতেন মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি তার নাম আলাউদ্দিনপুর। ঝিলাম নদীর পাশে আধুনিক শ্রীনগর শহরেই এর অবস্থান। তার মৃত্যুর পর এখানে গড়ে তোলা হয় একটি মসজিদ। হামেদানি কাশ্মিরে আসেন কুতুবউদ্দিনের শাসনামলে। তিনি ছিলেন শাহমিরি রাজবংশের চতুর্থ প্রজন্মের শাসক। মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানিকে অভ্যর্থনা জানান কুতুবউদ্দিন। তিনি হামেদানির মুরিদ হন এবং তার কাছ থেকে আধ্যাত্মিক উন্নতির নানা বিষয় শেখেন। তিনি প্রতি দিনই আন্তরিক চিত্তে হামেদানির কাছে আসতেন যাতে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করতে পারতেন। বলা হয় তিনি ইসলামী বিধান জানতেন না বলে দুই সহদোর বোনকে একই সময়ে বিয়ে করেছিলেন। সাইয়্যেদ হামেদানির নির্দেশে তিনি তাদের একজনকে তালাক দেন এবং শাসন-পরিচালনা ছেড়ে দেন। হামেদানি তার টুপি দান করেন কুতুবউদ্দিনকে এবং ইসলামী বিধি-বিধান শেখানোর জন্য 'কুদ্দুসিয়্যাহ' নামের একটি বই লেখেন। কুতুবউদ্দিনকে সম্বোধন করে তিনি কয়েকটি চিঠিও লিখেছিলেন।

কাশ্মির অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম ও ফার্সি ভাষা এবং সাহিত্যের বিস্তারে মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি ও তার সুযোগ্য ছাত্রদের অবদানের কথা তুলে ধরেছেন প্রখ্যাত ইরানি আলেম আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মুতাহ্হারি তার বই ' ইরান ও ইসলামের পারস্পরিক' অবদান শীর্ষক বইয়ে। অধ্যাপক হেনরি কোরবিনও হামেদানির রচনা ও দর্শনের প্রশংসা করেছেন। অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষক মনে করেন ভারত উপমহাদেশ এবং কাশ্মিরে বেশ কিছু শিল্পের প্রচলন ও বিকাশ সাইয়্যেদ হামেদানি ও তার সুযোগ্য ছাত্রদের শিল্প-সাধনার কাছে ঋণী।

হামেদানি এত বেশি সফর করেছিলেন তার সুফি পীরদের নির্দেশ মান্য করতে এবং তাসাওউফের অন্যতম ভিত্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। হামেদানি তার সুফি-তাত্ত্বিক চিন্তাধারা ও শিক্ষা বর্ণনায় গাজ্জালি, আত্তার, রুমি, সা'দী ও শাবিস্তারির মত খ্যাতনামা আরেফ বা সুফি-সাধকদের চিন্তাধারা এবং রচনা ব্যবহার করেছেন।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।