মার্চ ০৫, ২০২০ ১২:২০ Asia/Dhaka

চতুর্দশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির মাজার রয়েছে তাজিকিস্তানের কুলাব শহরে।

তার এই মাজার নানা বরকত ও কল্যাণের উৎস হিসেবে তাজিক জনগণের মধ্যে অত্যন্ত প্রিয় স্থান হয়ে আছে। ইরান ও তাজিকিস্তানের বিপুল সংখ্যক মানুষ তার মাজার জিয়ারত করে থাকেন। এ মাজারটি ইরান ও তাজিকিস্তানের মুসলিম জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সৌহার্দেরও বন্ধন হয়ে আছে।

তাজিকিস্তানে রয়েছে বিখ্যাত অনেক মুসলিম ব্যক্তিত্বের মাজার। যেমন, খাজা ইসহাক খাতলানি ও মাওলানা ইয়াকুব চারখির মাজার। আর কুলাবে সাইয়্যেদ হামেদানির মাজার মুসলিম এই দেশটির অন্যতম গৌরবময় ঐতিহ্য হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। তাজিকিস্তান ছিল প্রাচীন ইরানের অংশ। এই তাজিকিস্তানের চতুর্থ বৃহত্তম শহর হল কুলাব। দু-হাজার ৭০০ বছরের পুরনো এই শহরটির অবস্থান দেশটির রাজধানী দুশাম্বে থেকে ২৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে। শহরটির প্রধান সড়কের পাশেই একটি মনোরম বাগানের মধ্যে রয়েছে সাইয়্যেদ হামেদানির মাজার। এখানে এই মাজার ছাড়াও রয়েছে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা তথা হামেদানির নিজের গড়ে তোলা মসজিদ ও মাদ্রাসা। এ দুই ধর্মীয় স্থাপনার প্রাঙ্গনেই কবর দেয়া হয়েছিল সাইয়্যেদ হামেদানিকে। এখানেই কবর দেয়ার জন্য তিনি তার সঙ্গী ও অনুসারীদের ওসিয়ত করেছিলেন।

প্রতি বছর ছয়ই জিলহজ পালন করা হয় সাইয়্যেদ হামেদানির মৃত্যু-বার্ষিকী। কাশ্মির, তাজিকিস্তান, ইরান ও ভারত উপমহাদেশে পালন করা হয় এই দিবস নানা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।  এসব অনুষ্ঠানে হামেদানির নানা গুণ, ইরফানি অবস্থা ও শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। হামেদানির মাজারে তার বংশের দশ ব্যক্তির কবরও রয়েছে।

হামেদানির মাজার তাজিকদের জন্য সব সময়ই এক আকর্ষণীয় জিয়ারত-কেন্দ্র। এমনকি সাবেক সোভিয়েত শাসনামলেও এখানে লেগে থাকত অনুরাগীদের ভিড়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই মাজার আরও বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করতে থাকে। কুলাব ও খাতলান অঞ্চলের জনগণের মুখে মুখে প্রায়ই উচ্চারিত হয় মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানির নাম। এ অঞ্চলের জনগণের সন্তানদের মধ্যেও আলী নামটির প্রাধান্য ও জনপ্রিয়তা দেখা যায়।  

হামেদানির মাজার আজ তাজিকিস্তানের সর্বস্তরের জনগণের অন্যতম প্রধান জিয়ারত-কেন্দ্র। এ অঞ্চলের জনগণ হামেদানিকে শামসে তাব্রিজির সমপর্যায়ের সম্মান দিয়ে থাকে এবং তার নামের আগে হযরত শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। স্থানীয় যুব সমাজের অনেকেই দাম্পত্য-জীবন শুরু করেন এই মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে। অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে অনেকেই এই মাজারের উসিলা ধরেন এবং এখানে কুরবানি, নজর বা মানত করে থাকেন। সমস্যা বা সংকট-মুক্ত হওয়ার আশায় অনেকেই হামেদানির মাজারের সংস্কার বা পুনর্গঠনের কাজে শরিক হন বা আর্থিক সহায়তা দান করেন। রোগমুক্ত হওয়ার আশায় হামেদানির মাজার জিয়ারতে আসেন অনেক স্থানীয় বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা।

কুলাব শহরে হামেদানির মাজারের পবিত্র স্থাপনাটি থাকায় আশপাশের শহর ও গ্রামগুলোর জনগণের মধ্যে ইসলাম ধর্মের অনুসরণ বেশ জোরালো মাত্রায় দেখা যায়। এ অঞ্চলের নারীরা পুরোপুরি শালীন পোশাক তথা ইসলামী হিজাব মেনে চলেন। অথচ তাজিকিস্তানের অন্যান্য শহরের নারীরা পশ্চিমা তথা ইউরোপীয় পোশাকও পরে থাকেন।

সাইয়্যেদ হামেদানির মাজার ইরানের অন্য অনেক মাজারের মতই মসজিদ ও হুসাইনিয়া-ভিত্তিক তৎপরতাগুলো চালায় এবং অনেক সময় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মসূচিগুলোও পালন করে থাকে। তাজিকিস্তানের প্রথাগত ও স্থানীয় অনেক সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর সঙ্গেও এসব তৎপরতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

কুলাব শহরে সাইয়্যেদ হামেদানির মাজার কমপ্লেক্সের পাশেই রয়েছে কয়েকটি জাদুঘর। এসব জাদুঘর দেশি-বিদেশী পর্যটকদের জন্য এই মাজারের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ।  এই জাদুঘরগুলো ইসলামের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ এবং ইসলামের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের পরিচিত তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নানা ধরনের চিত্র-শিল্প, খোদাই-কর্ম ও ক্যালিওগ্রাফি এসব জাদুঘরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।  ইরানের আরাক শহরের কাছে বিশ্বনবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইতের ধারায় জন্ম-নেয়া ইমামদের সন্তান বা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের বংশধরদের মাজার সংলগ্ন জাদুঘরগুলোর সঙ্গে হামেদানির মাজার সংলগ্ন জাদুঘরগুলোর বেশ মিল রয়েছে। আরাকের কাছাকাছি এ অঞ্চলে রয়েছে ৭২ জন ইমামজাদার মাজার।  

ইরানের মাজারগুলোর মত তাজিকিস্তানের কুলাব শহরে অবস্থিত সাইয়্যেদ আলী হামেদানির মাজারের পাশেও রয়েছে নানা বিপনী-কেন্দ্র বা স্থানীয় বাজার।  এ ধরনের বিপনী-বিতান বা বাজার স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্য কথায় সাইয়্যেদ আলী হামেদানির মাজার নানা দিক থেকে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। কেউবা পড়াশুনা বা জানার জন্য, কেউবা ব্যবসার জন্য ও কেউবা স্রেফ বিনোদনের জন্য সাইয়্যেদ আলী হামেদানির মাজারের উসিলায় তাজিকিস্তান ও বিশেষ করে কুলাব অঞ্চল সফর করছেন।

প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির লেখা বইয়ের সংখ্যা ১১০টিরও বেশি। এসবের মধ্যে বেশিরভাগই হল হাতে-লেখা সংস্করণ, অপ্রকাশিত এবং সেগুলো রয়েছে গবেষকদের নাগালের বাইরে। হামেদানির লেখা প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা খুবই কম বা গুটি-কয়েক মাত্র।

অধ্যাপক হেনরি কোরবিনের মতে হামেদানির বইগুলো যদি ছাপানো হয় তাহলে দেখা যাবে একজন দার্শনিক সেসব বইয়ে পেতে পারেন দর্শনের অনেক খোরাক বা মাল-মশলা। তার মতে হামেদানি দর্শনের এক নতুন ধারার প্রবর্তক।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।