মার্চ ১০, ২০২০ ১৯:৩৭ Asia/Dhaka

প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির ব্যক্তিত্বের দুই প্রধান দিক হল ধার্মিকতা এবং ইরফানি বা খোদাপ্রেমের আধ্যাত্মিক রহস্যময় জ্ঞান সম্পর্কে দক্ষতা।

তার ব্যক্তিত্বের প্রথম দিকটির প্রকাশ দেখা যায় 'জাখিরাতুল মুলুক' শীর্ষক বইয়ে। আর হামেদানির ব্যক্তিত্বের দ্বিতীয় দিক তথা ইরফানি ব্যক্তিত্ব দেখা যায় তার অন্যান্য বইয়ে। 

মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি মানুষকে নানা ধরনের বিষয় শিক্ষা দেয়া ছাড়াও শাসক এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকেও নানা উপদেশ দিয়েছেন। জনগণের নানা অভাব-অভিযোগ দূর করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে বলতেন তিনি। তার মতে শাসকদের জন্য এ বিষয়টি সবচেয়ে বড় ইবাদত। রাষ্ট্র-পরিচালনা ও রাজনীতি বিষয়ে নানা ধরনের দায়িত্ব পালনে উপায় সম্পর্কে নেতৃবৃন্দ, উচ্চ-পদস্থ কর্মকর্তা ও শাসকদের পরামর্শ দিয়ে সাইয়্যেদ হামেদানি যে বই লিখেছেন সে বইটির নাম 'জাখিরাতুল মুলুক'। সমাজের সৌভাগ্যের জন্য কাজ করা আদর্শ শাসন-ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করতেন।

'জাখিরাতুল মুলুক' তথা 'রাষ্ট্রগুলোর সঞ্চয় বা সম্পদ' শীর্ষক বইটি সাইয়্যেদ হামেদানির লেখা সবচেয়ে বড় বই। ভূমিকা ও সমাপনী বক্তব্যের অধ্যায় ছাড়াও এ বইয়ে রয়েছে দশটি অধ্যায়। অনেক গবেষক মনে করেন হামেদানির এ বইটির বেশিরভাগ বক্তব্যই নেয়া হয়েছে ইমাম গাজ্জালির লেখা বই ' ইহয়িয়ায়ে উলুমে দীন' বা 'ধর্মীয় জ্ঞানের পুনরুজ্জীবন' শীর্ষক বই থেকে অনুবাদ ও সংক্ষিপ্তকরণের মাধ্যমে। হামেদানি গাজ্জালির বক্তব্যের পাশাপাশি নিজের অনেক মন্তব্য ও বক্তব্যও যোগ করেছেন এ বইয়ে। হামেদানি অবশ্য তার এ বইয়ের কেবল একটি ক্ষেত্র ছাড়া আর কোথাও গাজ্জালি ও তার 'ইহয়িয়ায়ে উলুমে দীন'- শীর্ষক বইটির উল্লেখ করেননি। আর ওই একটি ক্ষেত্রেও তিনি গাজ্জালির এ বইয়ের কোনো অংশ থেকে অনুবাদ করার ও সারাংশ গ্রহণের কথা বলেননি।

সাইয়্যেদ হামেদানি তার বই 'জাখিরাতুল মুলুক' তথা 'রাষ্ট্রগুলোর সঞ্চয় বা সম্পদ' শীর্ষক বইটির প্রত্যেক অধ্যায়ের আলোচনায় শুরু করেছেন অর্থসহ পবিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদিস দিয়ে। এরপর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কুরআনের আরও আয়াত ও হাদিস যুক্ত করার পর একই বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সুফি সাধকদের বক্তব্যও যোগ করেছেন।

সাইয়্যেদ হামেদানির 'জাখিরাতুল মুলুক' তথা 'রাষ্ট্রগুলোর সঞ্চয় বা সম্পদ' শীর্ষক বইটি লেখা হয়েছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের তথা সুন্নি মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। তার অন্যান্য বইয়ের বিপরীতে এ বইটি লেখা হয়েছে মূলত সুন্নি মুসলমানদেরকে দিক-নির্দেশনা ও উপদেশ দেয়ার উদ্দেশ্যে। এ বই লেখার মাধ্যমে হামেদানি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার দায়িত্বও পালন করেছেন। বইটি পড়লেই পাঠকের কাছে মনে হবে যে লেখক একজন সুফি-সাধক বা আরেফ হওয়া সত্ত্বেও মহানবীর (সা) সুন্নাতের কঠোর অনুসারী।

হামেদানির এ বইটি পাঠক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং বইটিকে তার লেখা বইগুলোর মধ্যে শীর্ষ-পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য বই হিসেবে স্মরণ করা হয়। সমসাময়িক যুগের অনেক লেখক তাদের লেখায় এ বই থেকে নানা অংশ ও বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এবং পরবর্তী যুগের অনেক লেখকও তাদের লেখাকে সমৃদ্ধ করেছেন হামেদানির এ বইটি ব্যবহার করে।

সাইয়্যেদ হামেদানির 'জাখিরাতুল মুলুক' তথা 'রাষ্ট্রগুলোর সঞ্চয় বা সম্পদ' শীর্ষক বইটির তুর্কি অনুবাদও দেখা যায়। এ অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছিল দশম হিজরিতে। অনুবাদকের নাম মুসলেহ উদ্দিন মুস্তাফা বিন শা'বান। তিনি ছিলেন তুর্কি লেখক, কবি ও অনুবাদক। সুরুরি তার সংক্ষিপ্ত নাম। হাতে-লেখা এ বইয়ের অনেক কপি ইরান, ফ্রান্স, ব্রিটেন, রাশিয়া ও আফগানিস্তানের লাইব্রেরিগুলোতে আজও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।  সাইয়্যেদ হামেদানির 'জাখিরাতুল মুলুক' শীর্ষক বইটি লাহোর ও মুম্বাই থেকে লিথোগ্রাফিক প্রিন্টে ছাপা হয়েছে।

প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির লেখা আরেকটি বিখ্যাত বই হল 'সিইরুত্‌তালিবিন'। বইটিতে খোদাপ্রেমের পন্থা ও খোদাপ্রেম সংক্রান্ত আধ্যাত্মিক রহস্যময় জ্ঞানের নানা দিক ও বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। এ বইটিও লেখা হয়েছে হামেদানির জাখিরাতুল মুলুক শীর্ষক বইটির স্টাইলে। কুরআনের আয়াত ও হাদিস ছাড়াও এ বইয়ে স্থান পেয়েছে আরবি ও ফার্সি কবিতার উদ্ধৃতি এবং বিখ্যাত আরেফ ও সুফি-সাধকদের নানা বক্তব্য।

মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির লেখা এই বইয়ে তথা 'সিইরুত্‌তালিবিন'-এ খোদাপ্রেমের নানা দিক, তরিকত, হাকিকত ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। বইটি পড়ার পর পাঠকের মনে হবে লেখক একজন পুরোদস্তুর সুফি সাধক এবং তিনি মুসলিম আলেমদের প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে পা রেখেছেন।

হামেদানির আরেকটি বইয়ের নাম হল নাম হল 'রেসালে(হ)-ইয়ে দাহ্ ক'য়েদেহ' বা 'দশ বিধান সংক্রান্ত রচনা'।  ছোট্ট এ বইটিতে খোদাপ্রেমের পন্থা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন সাইয়্যেদ হামেদানি। বইটিতে জিকর বা আল্লাহর স্মরণ, তওবা, যোহ্দ্‌ বা সংযম, অল্পে-তুষ্টি, মহান আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, আত্মিক পরিশুদ্ধি, মৃত্যু, ধৈর্য, সচেতনতা ও সন্তুষ্টির মত নানা বিষয়কে খোদাপ্রেমের দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সায়িদ নাফিসের মত কোনো কোনো গবেষক মনে করেন সাইয়্যেদ হামেদানির 'রেসালে(হ)-ইয়ে দাহ্ ক'য়েদেহ' আসলে প্রখ্যাত সুফি সাধক নাজমুদ্দিন কোবরার উল্লেখিত খোদাপ্রেমের দশ বিধান সংক্রান্ত আলোচনারই ব্যাখ্যা বা পর্যালোচনা মাত্র।   

প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির লেখা আরেকটি বিখ্যাত বই হল 'রেসালে(হ)ইয়ে দারভিশিয়ে' বা 'দরবেশি-রচনা'। এ বইয়ে খোদাপ্রেম তথা সুফি-সাধনার পথ-প্রদর্শক বা মুরশিদের প্রতি পুরোপুরি আনুগত্যের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এ বইয়ে হামেদানি বলেছেন, কুরআনের আয়াত, হাদিস, ইবাদত ও জিকরের নানা রহস্য কেবল আল্লাহর নবী-রাসুল এবং তাঁদের নির্বাচিত আওলিয়ার জানা রয়েছে। অনুপযুক্ত ক্ষেত্রে এসব বিষয়ের প্রয়োগ নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। মানুষের নানা রোগের যেমন রয়েছে নানা ধরনের ওষুধ তেমনি আধ্যাত্মিক নানা রোগের চিকিৎসার জন্যও রয়েছে বিশেষ ধরনের ইবাদত ও জিক্‌র। কেবল অভিজ্ঞ মুর্শিদ বা আল্লাহর ওলি এসব বিষয়ের প্রয়োগ সম্পর্কে অভিজ্ঞ। তবে খোদাপ্রেম বা তরিকতের পথে চলার ক্ষেত্রে শরিয়ত লঙ্ঘন করতে হবে- এমন কথা কখনও বলেননি সাইয়্যেদ হামেদানি। তরিকত পুরোপুরি শরিয়ত-নির্ভর বলেই তিনি উল্লেখ করতেন। এ বইটিও লেখা হয়েছে 'হামেদানির জাখিরাতুল মুলুক' শীর্ষক বইটির স্টাইলে। আর ওই বইটিরই অনেক বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি রয়েছে এ বইয়ে। এ বইয়ের একটি ছাপানো সংস্করণ রয়েছে এবং তা লাইব্রেরিগুলোতে পাওয়া যায়।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।