চাগতাই তুর্কি ভাষার মহান প্রতিষ্ঠাতার কথা
তৈমুরি যুগের গৌরব প্রখ্যাত ইরানি সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি'র জীবন
আজও আমরা হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি, লেখক, চিন্তাবিদ ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি'র জীবন, চিন্তাধারা এবং তার অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।
খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি'র জীবন, চিন্তাধারা এবং অবদান সম্পর্কিত গত পর্বের আলোচনায় আমরা শুনেছি যে আলী শিরনাওয়ায়ি ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভাবান, পরিশ্রমী বা অধ্যবসায়ী, সৎ ও ধার্মিক ব্যক্তিত্ব। হিজরি ৮৭৩ সনে হেরাতের শাসক হুসাইন মির্যা তার বাল্য-বন্ধু আলীশির নাওয়ায়িকে সমরকন্দ থেকে হেরাতে ফিরে আসার সাদর আমন্ত্রণ জানান সেই পাঠশালার জীবনের প্রতিজ্ঞার আলোকে। শৈশবে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল যে তাদের একজন যদি কখনও বড় কোনো পদে আসীন হয় তাহলে অন্যজনেরও সৌভাগ্যের ব্যবস্থা করবে। হুসাইন মির্যা তথা হুসাইন বোয়কারোর রাজদরবারের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও যোগ্যতার পরিচয় দেন আলীশির নাওয়ায়ি। তার নানা পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের ফলে হেরাতে হুসাইন মির্যার শাসনের ভিত্তিগুলো শক্তিশালী হয় এবং এ অঞ্চলের জনগণ নতুন সুলতানের সুশাসনের ছায়াতলে নানা ধরনের জুলুম ও অনাচার থেকে মুক্তি পায়।
কিন্তু আলীশির নাওয়ায়ির জনদরদি এবং জুলুম-বিরোধী তৎপরতায় ক্ষমতালোভী ও দুর্নীতিবাজ এক শ্রেণীর আমির-ওমরাহ ও দরবারের সদস্য ইর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। তারা তাদের দুর্নীতি ও জুলুমের পথে প্রবল বাধা-হয়ে-দাঁড়ানো মন্ত্রী আলীশির নাওয়ায়ির বিরুদ্ধে সুলতানের কানে নানা মিথ্যা তথ্য দেয়। ফলে মন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন তিনি। অথচ সুলতানের বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন মন্ত্রী হিসেবে তিনি 'এ'তেমাদ আদ দৌলা' ও 'রুক্ন্ আসসুলতানাহ' উপাধি পেয়েছিলেন।
ক্ষমতালোভী, হিংসুক ও দুর্নীতিবাজ প্রতিদ্বন্দ্বীরা আলীশির নাওয়ায়িকে মন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। তারা দরবারের মধ্যে সুলতানের প্রিয়ভাজন হিসেবে আলীশির নাওয়ায়ির অব্যাহত অবস্থানকেও তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অনাচারের পথে বাধা হিসেবে দেখতে পেয়ে তাকে দূরে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। তারা সুলতান হুসাইন ব'য়ক'রোকে দিয়ে আলীশির নাওয়ায়িকে আস্তারাবাদের গভর্নর করে যাতে শৈশবের এ দুই বন্ধু রাজধানী হেরাতের রাজ-দরবারে একত্রে থাকতে না পারেন।
হিজরি ৮৯২ সনে আলীশির নাওয়ায়ি নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ, সবুজ-শ্যামল ও সুবিস্তীর্ণ আস্তারাবাদ তথা বর্তমান যুগের উত্তর-পূর্ব ইরানে অবস্থিত গোরগান নামক প্রদেশের গভর্নর হন।

ইরানি মনীষী ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি যতদিন গোরগানের শাসক ছিলেন ততদিন সেখানকার জনগন তার সুশাসন ও যোগ্য পরিচালনায় সন্তুষ্ট ছিল। সে সময় নবী-বংশ ও মহানবীর (সা) হাশেমি বংশের রক্তধারী ব্যক্তিরা, আলেম সমাজ এবং সভ্রান্ত ব্যক্তিরা যথাযোগ্য ও সম্মানজনক অবস্থায় জীবন-যাপন করতেন। এ ছাড়াও ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ জনগণও আলীশির নাওয়ায়ির সুশাসনে সুখী ছিলেন। আমির আলীশির নাওয়ায়ি সেখানে দুই বছর শাসন-পরিচালনা করার পর সুলতান বয়করো আবারও তাকে হেরাতে ফিরে আসতে বলেন। দরবারের লোকেরা আলীশির নাওয়ায়ির শরীরে বিষ প্রয়োগ করেছে- এমন গুজব শুনে সুলতান উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আলীশির নাওয়ায়ি সুলতানের অনুরোধে সাড়া দিয়ে হেরাতে ফেরার উদ্যোগ নেন। হিজরি ৯০৬ সনে তিনি নিজের সেনাদল বা প্রহরীসহ রোবাত পারিয়ান নামক স্থানে পৌঁছেন। এ সময় তিনি সুলতান বয়করোর আবাসস্থলে পৌঁছার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ হৃদযন্ত্রের অসুস্থতার শিকার হয়ে ইন্তেকাল করেন আলীশির নাওয়ায়ি।
ইরানি মনীষী ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ির সাংস্কৃতিক তৎপরতার রেকর্ড অত্যন্ত প্রজ্জ্বোল। তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী লেখক, কবি ও সৃষ্টিশীল শিল্পী। তুর্কি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে তিনি এই ভাষাকে সাহিত্য-চর্চার উপযুক্ত ভাষায় উন্নত করতে সক্ষম হন। তাকে বলা হয় চাগতাই তুর্কি ভাষার প্রতিষ্ঠাতা। তার ত্রিশ বছরের শাসনামলে সাংস্কৃতিক ও শিল্প জগতে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ঘটেছে। হেরাতের আলেম সমাজ ও গুণী শিল্পীদের বৈঠকের ব্যবস্থা করে শিরনাওয়ায়ি এই শহরকে সে যুগের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেন। তিনি নানাভাবে এই আন্দোলনের ওপর প্রভাব ফেলেছিলেন। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা জোরদারের জন্য আলীশির নাওয়ায়ি মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহসহ বহু স্থাপনা গড়ে তোলেন এবং তুর্কি, ফার্সি ভাষায় বহু বই লেখেন। সে যুগের আলেম সমাজ ও শিল্পী এবং গুণীরা আলীশির নাওয়ায়ির বস্তুগত ও নৈতিক সহায়তা পেতেন। তিনি শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে হেরাতকে শিল্প-সংস্কৃতির এক বড় কেন্দ্রে পরিণত করেন এবং এখানে শিল্পী, কবি ও চিন্তাবিদরা কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়াই অবাধে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা করতে পারতেন। ফলে তারা এক্ষেত্রে সৃষ্টশীল অনেক অবদান রাখতে পেরেছেন।
ইরানি মনীষী ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি মন্ত্রীত্ব ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এবং সাহিত্যের সেবায় ও জনসেবায়ও ব্যাপক অবদান রেখেছেন। ব্যক্তি-স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট পার্থিব কোনো বিষয়ের প্রতি তার কোনো লোভ বা প্রবল আকর্ষণ ছিল না। কিন্তু দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির কাজে চিরকুমার আলীশির নাওয়ায়ির ছিল ব্যাপক আগ্রহ। বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, ইবাদত-কেন্দ্র, রাস্তা বা সড়ক, সেতু ও মাজার নির্মাণ এবং সংস্কার করেছেন তিনি। বলা হয় ৩৭০টি এ ধরনের স্থাপনা আলীশির নাওয়ায়ির কীর্তি হিসেবে তার স্মৃতি আজও ধরে রেখেছে। তার সেইসব তৎপরতার ফলে খোরাসান, ইরাক ও ফার্স অঞ্চলের ব্যাপক অগ্রগতি ঘটেছিল এবং সাফাভি শাসনামলে উন্নয়নের এই ধারারই অসাধারণ বিকাশ ঘটে।
মাশহাদে বিশ্বনবী (সা)'র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম রেজা (আ)'র পবিত্র মাজারের প্রাচীন বারান্দা বা চত্ত্বরটির অন্যতম নির্মাতা ছিলেন আমির আলীশির নাওয়ায়ি। মূল মাজারের গম্বুজের সঙ্গে যুক্ত এই চত্ত্বর নির্মাণ করা হয় হিজরি ৮৭২ সনে। এই চত্ত্বরের বাকি অর্ধেক নির্মাণ-কাজ শেষ করা হয় হিজরি এক হাজার দশ সনে ইরানের সাফাভি সম্রাট শাহ-আব্বাসের নির্দেশে।
ইমাম রেজার (আ) মাজার-প্রাঙ্গনের উত্তর-পশ্চিম অংশের সোনা-মোড়ানো (ছাদ ও স্তম্ভযুক্ত) প্রাচীন বারান্দাটির ওপরের দিকের ৫ টি খিলান ও নীচের দিকের চারটি প্রবেশ-পথ নির্মাণ করা হয়েছিল আলীশির নাওয়ায়ির নির্দেশে। ৮৭৫ থেকে ৮৮৫ হিজরিতে এই অংশগুলো নির্মাণ করা হয়। তবে এই অংশগুলোর ওপর খোদাই-করা লেখাগুলো যুক্ত হয়েছিল গুরকানিয়ান শাসনামলে।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।