এপ্রিল ০৫, ২০২০ ১২:৩৪ Asia/Dhaka

প্রখ্যাত ইরানি মনীষী ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি ছিলেন সাহিত্য-শিল্প-মোদী, সংস্কৃতিসেবী এবং একাধারে দুই ভাষার তথা ফার্সি ও তুর্কি ভাষার কবি।

তার শাসনামলে হেরাত হয়ে পড়েছিল কবি-সাহিত্যিক, সুলেখন শিল্পী  তথা ক্যালিগ্রাফার বা হাতে-লেখার আর্টিস্ট, শিল্প-রসিক, সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ, গল্প-কথক ও পাহলোয়ানদের  বিখ্যাত কেন্দ্র। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জ্ঞানী-গুণীদের সঙ্গে আলীশির নাওয়ায়ির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ও স্নেহময়। তার এ সম্পর্ক ছিল প্রজাদের সাথে তার বন্ধুসুলভ আচরণেরই প্রতিচ্ছবি। জ্ঞানী-গুণী ও শিল্পীদের সামনে তিনি বিনয়ী ছাত্রের মতই আচরণ করতেন এবং তিনি নিজেকে তাদের শাসক মনে না করে বা ক্ষমতার প্রকাশ না ঘটিয়ে নিজেকে বরং  তাদের সেবক বলেই মনে করতেন। জামি, বাহযাদ এবং ওয়ায়েজ কাশেফির মত সে যুগের প্রখ্যাত কবি, শিল্পী ও আধ্যাত্মিক বিশেষজ্ঞ বা সাধকদের সঙ্গে আলীশির নাওয়ায়ি'র সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট হবে যে তার সর্বাত্মক সহযোগিতা এই ব্যক্তিত্বদের বিকাশ বা অগ্রগতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল। প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ অ্যাডওয়ার্ড ব্রাউন আলীশির নাওয়ায়িকে তুলনা করেছেন রোমের প্রশাসক ম্যালিনাস সিলিনভের সঙ্গে। সিলিনভের মদদেও গড়ে উঠেছিল অনেক জ্ঞানী-গুণী।

আমির আলীশির নাওয়ায়ির ছিল এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। ওই লাইব্রেরিতে ছিল অনেক দুষ্প্রাপ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বই। বিখ্যাত লিপিকারদের হাতে-লেখা অনেক দুর্লভ বইও ছিল ওই লাইব্রেরিতে। প্রখ্যাত পণ্ডিত ও হস্তলিপিকার মাওলানা হাজ মুহাম্মাদ জুফানুন ওই লাইব্রেরির পরিচালক ছিলেন। হেরাতের নিজামিয়া মাদ্রাসার লাইব্রেরিও গড়ে তুলেছিলেন আলীশির নাওয়ায়ি। তার শাসনামলে সুলেখন শিল্পীরা গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্লভ অনেক বই কপি করতেন হাতে লিখে। এসব বইয়ের বেশ কিছু কপি সুন্দর হস্তলিখন শিল্পের অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে। বয়সোঙ্গরের শাহনামা হচ্ছে এমনই এক বিখ্যাত নিদর্শন। ফেরদৌসির মহাকাব্য শাহনামার পংক্তিগুলো লেখা হয়েছিল এ বইয়ে। হাতে-লেখা সচিত্র এ বইটির সংকলন শুরু হয় খ্রিস্টিয় ১৪৩০ সনে এবং শেষ হয় ১৪৩০ সনে তৈমুরি যুবরাজ বয়সঙ্গোর মির্যার নির্দেশে। ইরানের গোলেস্তান প্রাসাদের জাদুঘরে বইটি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পারসিক মিনিয়েচার আর্টের অনন্য এই নিদর্শনকে ২০০৭ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করা হয়।  

প্রখ্যাত ইরানি মনীষী ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি শিল্পের সব শাখার গুণিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। অনেক কবি-সাহিত্যিক, সঙ্গীতজ্ঞ, চিত্র-শিল্পী, স্থাপত্যবিদ ও সুলেখন-শিল্পী খ্যাতিমান হতে পেরেছিলেন  আলীশির নাওয়ায়ির কারণে। তিনি নিজে ফার্সি ও তুর্কি ভাষায় অনেক বই লিখেছেন। আবার অন্য অনেকের লেখা অনেক বই লেখা ও প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছিল তারই উৎসাহ ও সহযোগিতার সুবাদে। আলেম সমাজের অনেকেই তার সহযোগিতা পেয়েছেন নানাভাবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পের এমন বড় মদদদাতার সংখ্যা বিশ্ব-ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। সুলতান আলী সাব্‌জ্‌ মাশহাদি, মাওলানা সুলতান মুহাম্মাদ খানদান ও সুলতান আলী কয়েনি'র মত প্রখ্যাত সুলেখন-শিল্পী বা ক্যালিগ্রাফার তাদের অপূর্ব শিল্পকর্ম উপহার দিতে পেরেছিলেন আলীশির নাওয়ায়ির সর্বাত্মক সহযোগিতার কারণেই। এভাবে ফার্সি ভাষার ক্যালিগ্রাফি শিল্প ও এর বিখ্যাত শিল্পীদের বিকাশের সঙ্গে অমর হয়ে আছে আমির আলীশির নাওয়ায়ির নাম।

গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিতদের বস্তুগত এবং নৈতিক সহায়তা দেয়া ছিল আমির আলীশির নাওয়ায়ির আরেকটি বড় মৌলিক অবদান। সে যুগের অনেক বড় বড় আলেম ও জ্ঞানী বই লিখেছিলেন এই মহান সুশাসক ও উদার বিদানুরাগীর সহায়তার কারণে। জ্ঞানী-গুণিকে সম্মান জানানো ও তাদের মর্যাদা তুলে ধরার জন্য এভাবেই বাস্তব পদক্ষেপ নিতেন আলীশির নাওয়ায়ি। স্থাপত্য জগতের শিল্পী ও প্রকৌশলীরাও ব্যাপক সহায়তা পেতেন আলীশির নাওয়ায়ির কাছ থেকে। হেরাতের জামে মসজিদের সুদৃশ্য মিম্বরটি বসানো হয়েছিল তারই নির্দেশে। মর্মর বা মার্বেল পাথরের সেই সুদৃশ্য মিম্বরটির কোনো চিহ্নই আজ আর নেই। কিন্তু সূক্ষ্ম কারুকাজ-করা সেই নজিরবিহীন বা অনন্য-সুন্দর মিম্বরটির সৌন্দর্যের বিবরণ জানা যায় বিশিষ্ট লেখক খ'ন্দমিরের লেখা থেকে।

খ'ন্দমির এ প্রসঙ্গে লিখেছেন: জায়ফল গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি পুরনো মিম্বরটি জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়লে আমির আলীশির নাওয়ায়ি মর্মর পাথর দিয়ে নতুন মিম্বর তৈরির নির্দেশ দেন। আমিরের কর্মচারিরা উৎকৃষ্ট মানের এ পাথর সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। তারা খোরাসানের খাফ অঞ্চলে উৎকৃষ্ট মানের এই পাথর খুজে পেলেন। পুরো দাম পরিশোধ করে তারা সেই পাথর কিনে নেন এবং খুব কম সময়ের মধ্যে তা হেরাতের জামে মসজিদে নিয়ে আসেন। এরপর পাথরের ওপর কারুকাজের ওস্তাদ শামস্‌উদ্দিন ওই পাথর দিয়ে মিম্বর তৈরির কাজ শুরু করেন। কারুকাজ ও সৌন্দর্যের দিক থেকে তা নজিরবিহীন। আমির আলীশির নাওয়ায়ির সঙ্গে প্রখ্যাত কবি, চিন্তাবিদ ও মনীষী শেখ আবদুর রহমান জামীর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য এটাই যথেষ্ট যে জামীর বেশিরভাগ রচনা ও শিল্পকর্মের কোথাও না কোথাও আলীশির নাওয়ায়ির ভূয়সী প্রশংসা দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেক পত্র-বিনিময়ও হয়েছিল। এসব চিঠি থেকে সে সময়কার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার চিত্রও ফুটে উঠেছে। জামীর সামাজিক-ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। তিনি এসব চিঠিতে কখনও ব্যক্তিগত কোনো আবেদন জানাননি। বরং দেখা যায় জনগণের কল্যাণ ও তাদেরকে জুলুম আর বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করাই ছিল তার এসব চিঠির প্রধান বিষয়।

আলীশির নাওয়ায়ির ন্যায়বিচারবোধ, জনগণের প্রতি দরদ ও সততার কারণেই জামি সব সময়ই চেষ্টা করেছেন তার প্রিয় এই ব্যক্তিত্বকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে। দুই বন্ধুপ্রতীম সাহিত্যিক হিসেবেও তারা একে-অপরকে চিঠি লিখতেন। জামী ও আলীশির নাওয়ায়ি যখনই নিজের লেখা কোনো বই প্রকাশের উদ্যোগ নিতেন তখন তা চূড়ান্ত করার আগে একে-অপরের কাছে পাঠাতেন পরামর্শ ও সমালোচনার জন্য। জামী অনেক বইই লিখেছিলেন আলীশির নাওয়ায়ির অনুরোধে। আর এসব বই জামী উৎসর্গ করেছিলেন বন্ধুবর আলীশির নাওয়ায়ির নামে। অন্যদিকে জামীর অনুরোধ বা পরামর্শের ভিত্তিতে ও তারই স্বার্থে সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়িও অনেক বই লিখেছেন। তিনি নিজের লেখায় জামীকে তার 'মহান শিক্ষক' বলে উল্লেখ করেছেন।

জামী তার 'লাইলি ও মজনুন' কাব্যে আলীশির নাওয়ায়িকে 'শ্রেষ্ঠ বন্ধু ও মদদদাতা' বলে শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। জামির কাছে লেখা আলীশির নাওয়ায়ির চিঠিগুলো থেকে বোঝা যায় তার প্রধান ভাবনার বিষয় ছিল কিভাবে সাহিত্য-সংস্কৃতির ও তার সেবকদের সেবা করা যায়। জামীর মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হয়েছিলেন আলীশির নাওয়ায়ি। এই মহান কবি-বন্ধুর স্মরণে তিনি লিখেছিলেন মর্মস্পর্শী কবিতা। তিনি জামীর স্মরণে আয়োজন করেছিলেন এক বিশাল গণ-ভোজসভার যেখানে সাধারণ মানুষ ছাড়াও হেরাতের বড় ধরনের সব পণ্ডিত, গুণী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা যোগ দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও আলীশির নাওয়ায়ি জামির কবরের ওপর নির্মাণ করেন সুদৃশ্য খিলান, তোরণ ও গম্বুজযুক্ত মাজার-ভবন বা সমাধি-সৌধ।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।