মে ২৬, ২০২০ ১২:৪২ Asia/Dhaka

আমির আলীশির নাওয়ায়ি ইরানের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে অমূল্য ও চিরস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। তৈমুরি যুগের শিল্প ও সাহিত্যমোদী এই মন্ত্রীর শিল্প ও সাহিত্য-কর্মের সংখ্যা ত্রিশেরও বেশি।

তার কোনো কোনো রচনা বা বই এখনও টিকে আছে এবং কোনো কোনো বই দুর্লভ অথবা এখন আর পাওয়া যায় না।

আমির আলীশির নাওয়ায়ি ছিলেন একাধারে ফার্সি ও চাগতাই তুর্কি ভাষার কবি। তার রয়েছে গজলের চারটি কাব্য। খামসা, 'মাসনাভিয়ে লিসানে আত্তাইর' ও 'তাজকিরাতুল মাজালিসু-ন্নাফায়িস' তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগুলোর অন্যতম। আমির আলীশির নাওয়ায়িকে বলা হয় চাগতাই তুর্কি কবিতার জনক। ফার্সি ভাষায় কবিতা লেখা ছাড়াও তিনি 'খাজায়েনুল মাআনি' নামের চারটি গজল-কাব্য লিখেছেন। তার মাসনাভি বা দ্বিপদী কাব্যের সংখ্যা পাঁচটি। ইরানের মহাকবি নিজামির 'খামসা' বা পাঁচ কাব্যের অনুসরণে তিনি রচনা করেছেন এই পাঁচটি মাসনাভি-কাব্য। এ ছাড়াও আমির আলীশির নাওয়ায়ি প্রখ্যাত সুফি-সাধক ও মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের 'মানত্বিকু-ত্ত্বাইর' কাব্যের অনুসরণে চাগতাই তুর্কি ভাষায় রচনা করেছেন একটি মাসনাভি বা দ্বিপদী কাব্য। এর নাম ছিল লিসান আত্-তাইর। 

আমির আলীশির নাওয়ায়ি ফার্সি ও চাগতাই তুর্কি ভাষার সাহিত্য-কর্মে নিজের ছদ্ম- নাম বা সাহিত্যিক নাম হিসেব 'ফ'নি' তথা 'ধ্বংসশীল' শব্দটি ব্যবহার করতেন। তিনি লিসান আত্-তাইর শীর্ষক কাব্যের ভূমিকায় ছদ্মনামের এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। পরকাল ও সৃষ্টির উৎস নিয়ে আলোচনা করাই এ কাব্যের উদ্দেশ্য ও আত্তারের 'মানত্বিকু-ত্ত্বাইর'-কাব্যে উল্লেখিত পাখির সফরের সপ্তম পর্যায় ফানা বা ধ্বংসের পর্যায় বলে তিনি ওই নাম বেছে নেন।

আমির আলীশির নাওয়ায়ি ফার্সি ও তুর্কি উভয় ভাষাতেই কবিতা লেখায় দক্ষ ছিলেন বলে তাকে বলা হত 'জুল লিসানাইন বা দ্বিভাষী'। কারো কারো মতে তিনি আরবি ভাষায়ও কবিতা লিখেছেন। কিন্তু তার লেখা আরবি কবিতার কোনো কপি এখনও কোথাও দেখা যায়নি। 

আমির আলীশির নাওয়ায়ি তুর্কি ভাষার কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও তার শিল্প ও সাহিত্যের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ফার্সি সাহিত্যের পরিমণ্ডলেই। ফার্সি সাহিত্যই তাকে গড়ে তুলেছে শিল্পী- সাহিত্যিক বা কবি হিসেবে। তিনি মিছরির মত মিষ্টি ফার্সি ভাষাটি আয়ত্ত্ব করেছেন মহাকবি ফেরদৌসি, সাদী, আত্তার, নিজামি ও অন্য অনেক বড় কবিদের ভাষা থেকে। আর এই ফার্সি ভাষাকে নিজ সাহিত্য-কর্মে ব্যবহার করেছেন আমির আলীশির নাওয়ায়ি। সাহিত্যের ইতিহাস-বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন আমির আলীশির নাওয়ায়ি ছিলেন ফার্সি কবিতা সাহিত্যে আব্দুর রহমান জামির অনুসারী। জামি ছিলেন খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ ও হিজরি নবম শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি।

নানা সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখা যায় আমির আলীশির নাওয়ায়ি কিশোর বয়সেই ফার্সি ভাষায় কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন। তার ফার্সি কবিতা-সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে একটি ফার্সি কাব্য। এতে রয়েছে গজল,  চতুষ্পদী, দ্বিপদী ও একপদী কবিতা, ক্ষুদ্র কবিতা ও ধাঁধা। তার এ কাব্যের মোট পঙক্তির সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার।

জহির উদ্দিন বাবরের মতে আমির আলীশির নাওয়ায়ির ফার্সি কবিতার চরণ বা পদগুলো মজবুত নয়। কেউ কেউ মনে করেন তার ফার্সি কবিতার ভাষা ছিল যেমন প্রাঞ্জল ও স্বচ্ছ তেমনি তার তুর্কি কবিতাও ছিল অনুরূপ। গভীর ও সূক্ষ্ম অর্থ বা ভাবধারা ও উচ্চতর মানবীয় চিন্তাধারা ছিল আমির আলীশির নাওয়ায়ির কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার গজলগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: প্রথমত: প্রখ্যাত ইরানি কবিদের অনুকরণে লেখা গজল। যেমন, হাফিজ, সাদি, নিজামি, আত্তার, জামি ও আমির খসরু দেহলাভীর অনুকরণে লেখা গজল। আর তার দ্বিতীয় দ্বিতীয় শ্রেণীর গজল হচ্ছে তার একান্তই নিজস্ব গজল। আলীশির নাওয়ায়ি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন হাফিজের কবিতায়। হাফিজের কবিতার ইরফানি ও শিল্প-রসের দিকগুলোতে পুরোপুরি সিক্ত হয়েছিলেন তিনি।

আমির আলীশির নাওয়ায়ির কবিতায় নিজামি ও আমির খসরুর গভীর প্রভাব দেখা গেলেও তিনি নিজেকে এই কবিদের চেয়েও উঁচু মানের কবি বলে মনে করতেন। তিনি তার সাহিত্য-কর্মে ওমর খৈয়াম ও রুদাকির নাম উল্লেখ না করলেও তাদের কাব্য-শৈলীর প্রভাব এড়াতে পারেননি। নিজের যুগ পর্যন্ত প্রচলিত ফার্সি সব কাব্য তার পড়া ছিল এবং সেসবকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেও দেখেছিলেন আমির আলীশির নাওয়ায়ি। কিন্তু তিনি বড় বড় কবিদের স্টাইল অনুসরণ করাকে নেতিবাচক কাজ বলে মনে করতেন না বরং তাদের অনুসরণকে মোড়ক পরিবর্তন ও মানসিক ভিক্ষাবৃত্তি বা সাহায্য নেয়া বলে অভিহিত করতেন। কবি জামির সঙ্গে গভীর হৃদ্যতা থাকায় আমির আলীশির নাওয়ায়ি তার কাবিতার স্টাইল অনুসরণ করতেন ও নিজের গজলগুলোকে সংশোধনের জন্য জামির কাছে পাঠাতেন। তিনি তার অনেক রচনা উৎসর্গ করেছিলেন জামির নামে। জামির পরামর্শ অনুযায়ী  আলীশির নাওয়ায়ি নকশবন্দিয়া নামক সুফিবাদী তরিকার অনুসারী হয়েছিলেন।

আমির আলীশির নাওয়ায়ির রুবাঈয়াত বা চতুষ্পদী কবিতায় সুফি ও ইরফানি ভাবধারাসহ অনেক সূক্ষ্ম ভাবধারা দেখা যায়। তার কিছু কিছু মিষ্টি বর্ণনা পরবর্তীকালে ফার্সি ভাষার প্রবাদে পরিণত হয়েছে। আমির আলীশির নাওয়ায়ির গদ্যও রচনাও বেশ আকর্ষণীয়। ফার্সি ভাষায় লেখা তার একটি গদ্য বইয়ের নাম 'মুফরাদাত দার ফান্নে মুয়াম্মা'। বইটি তিনি লিখেছিলেন কবি জামির জন্য। এ বইয়ে ধাঁধা রচনা ও এর সমাধানের নানা রীতি বা কৌশল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন আমির আলীশির নাওয়ায়ি। সে যুগে কাব্য ও কবিতা-প্রেমিকদের কাছে ধাঁধাও ছিল বেশ পছন্দের বিষয়। 'তোহফাতুল মুলুক' ও 'সিইরাল মুলুক' শীর্ষক তার দু'টি বই ছিল ইতিহাস বিষয়ক রচনা। আমির আলীশির নাওয়ায়ির লেখা এ দু'টি বইয়ের ভাষা ফার্সি হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। তার লেখা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিঠি এখনও নানা লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।