জুন ০৭, ২০২০ ১৩:১২ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি আলেম, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির অবদান ও চিন্তাধারা সম্পর্কে আলোচনা করব।

গত পর্বের আলোচনায় আমরা মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির সবচেয়ে বিখ্যাত বই 'রওজাতুশ শুহাদা'র পরিচিতি এবং এ বইটি লেখার সমসাময়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আজ আমরা এ প্রসঙ্গে আরও কিছু তথ্য তুলে ধরব।

ধর্ম বিষয়ক বক্তাকে কার্যকর ওয়াজ-নসিহতের স্বার্থে ইতিহাসসহ অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হয়। মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফিও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। নবী-রাসুল, সাহাবি ও ইমামদের ইতিহাসসহ অনেক ধরনের জ্ঞানে তার পাণ্ডিত্য ছিল।  সে যুগে হেরাত ও সাবজাওয়ার অঞ্চলেও মহররমের শোক ও মাতমের অনুষ্ঠান হত। শোকের যেসব কবিতা বা মর্সিয়া পড়া হত মজলিসে সেসব আগেই রেডি করা থাকত। কাশেফি দৃশ্যত মহানবীর (সা) এক বংশধর তথা  সাইয়্যেদ বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের অনুরোধে  'রওজাতুশ শুহাদা' বইটি লিখেছিলেন। এই বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম মুর্শিদ আদদৌলা। তিনি সাইয়্যেদ মির্যা নামে খ্যাত ছিলেন। তারই অনুরোধে কাশেফি মহররম মাসের শোকানুষ্ঠানে ব্যবহারযোগ্য একটি বই লেখার সিদ্ধান্ত নেন।

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি তার লেখা 'রওজাতুশ শুহাদা'  শীর্ষক বইটিতে

হযরত ইমাম হুসাইন (আ)'র জন্য কান্নাকাটির গুরুত্ব তুলে ধরে লিখেছেন, মহানবীর আহলে বাইতের অনুরাগীরা প্রতি বছর মহররম মাসে শহীদদের সেই দুঃখ-মুসিবতের স্মৃতিকে নবায়ন করেন এবং মহানবীর বংশধরদের জন্য কান্নাকাটি করে শোক প্রকাশ করেন। কারবালা ও আশুরার ঘটনা আহলে বাইতের অনুরাগীদের হৃদয়ে দুঃখের আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং চোখে নামায় অশ্রুর বন্যা। কাশেফি লিখেছেন:  মর্সিয়াগুলো সংক্ষিপ্ত হওয়াতেই সাইয়্যেদ মির্যা আমাকে এমন একটি পরিপূর্ণ বই লিখতে বলেছেন যাতে নবী-রাসুল, শহীদ ও আল্লাহ নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দুঃখ-মুসিবত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা যায়।  কাশেফি কারবালার ৭২ জন বীর শহিদদের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তার মতে অতীতে আশুরার শহীদদের সম্পর্কে যেসব বই লেখা হয়েছে সেসবের বেশিরভাগেই এই মহামানবদের সংগ্রাম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি। কেবল কিছু কবিতার মধ্যেই বর্ণনা সীমিত করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির লেখা 'রওজাতুশ শুহাদা'  শীর্ষক বইটি শিয়া মুসলমানরা ছাড়াও আহলে-বাইতের অনুরাগী সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেও বিস্ময়কর সাড়া জাগিয়েছিল। আর এর কারণ ছিল বইটির প্রাঞ্জল, ছন্দময় ও সহজবোধ্য ভাষা। এমনিতেই কারবালা ও মহররমের কাহিনী মুসলমানদের মধ্যে খুবই গুরুত্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু কাহিনীর ভাষা যখন শৈল্পিক সাহিত্যিক সৌন্দর্যে ভাস্বর হয় তখন তার আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়। আসলে কাশেফি ছিলেন হিজরি দশম শতকের শীর্ষস্থানীয় গদ্য-লেখক।

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির লেখা 'রওজাতুশ শুহাদা'  শীর্ষক বইটির খ্যাতি অর্জনের মূল কারণ হল বর্ণনার অভিনবত্ব ও সৌন্দর্য। বৃদ্ধ বয়সে এ বই লিখতে গিয়ে তিনি সুন্দর সুন্দর শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার পাণ্ডিত্য ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার যেন উজাড় করে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক রাসুল জাফারিয়ান এ প্রসঙ্গে লিখেছেন: এ বইটি থেকে সুন্দর সুন্দর বাক্য নির্বাচন করা বেশ কঠিন। আপনি এ বইয়ের কোনো একটি বাক্য দেখে মুগ্ধ হলে দেখবেন যে বইটির অন্যত্রও এর চেয়েও সুন্দর ও বেশি কার্যকর বাক্য রয়েছে। সবচেয়ে কার্যকর ও হৃদয়-পোড়ানো কবিতাগুলো বইটিকে করেছে অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী।  

'রওজাতুশ শুহাদা' বইটি লেখার ক্ষেত্রে মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি শেখ সাদির গোলেস্তান বইটির স্টাইল মাথায় রেখেছেন বলে মনে হয়। সুললিত ও সুরেলা বাক্যগুলো তার এ রচনাকে করেছে সংগীতময়। 'রওজাতুশ শুহাদা' বইটির ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রধান রহস্য মূলত এটাই।  বইটিতে কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রেও অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন কাশেফি। কাহিনীগুলোকে আকর্ষণীয় করতে লেখক কিছু কিংবদন্তীও জুড়ে দিয়েছেন যা বাস্তব নয়। বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও শাহাদতের ঘটনাগুলো তুলে ধরার সময় তিনি শাহাদাতের মাহাত্ম্যকে এমন সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যে সে সময়কাল পর্যন্ত ফার্সি সাহিত্যে তা ছিল বিরল। কিন্তু কিছু কিছু কল্প-কাহিনী স্থান পাওয়ায় কাশেফির এ বইটি একটি নির্ভরযোগ্য ইতিহাস-নির্ভর বই হয়ে ওঠেনি যদিও ইতিহাস তুলে ধরা ছিল তার উদ্দেশ্য। সম্ভবত কাশেফি এ বইটি লেখার সময় নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়াও অনির্ভরযোগ্য উৎসও ব্যবহার করেছেন।

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইয়ে কারবালায় হাশেম বিন উরয়ার শাহাদাতের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। অথচ তিনি সিফফিনের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এসব ভুলের কারণে কাশেফির বইটি ঐতিহাসিক বইয়ের মূল্য না পেয়ে পেয়েছে সাহিত্য-শিল্প-নির্ভর উপন্যাস টাইপের বইয়ের মূল্য। ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে লেখকরা কল্পনা-নির্ভর কোনো কোনো ঘটনা জুড়ে দিয়ে থাকেন। আর এটা একটি প্রচলিত স্টাইল।

গবেষকরা মনে করেন কাশেফি আশুরার ঘটনাবলীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য প্রচারে সহায়তা করেছেন। ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে তিনি একজন সুফিবাদীর চশমাই ব্যবহার করেছেন। কাশেফির ওপর নাক্‌শবান্দি সুফি তরিকার প্রভাব ছিল। অন্যদিকে তিনি ছিলেন মহানবীর আহলে বাইতের অনুরাগী। কারবালা ও আশুরার ঘটনাকে তিনি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেননি।  আর এসব দিকের পাশাপাশি তার শৈল্পিক ও কাব্য-রসিক মন 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটিকে করেছে এক অনন্য সৃষ্টি।

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইয়ের সূচনায় বলেছেন, সুফিদের জন্য দুনিয়া একটি কঠিন স্থান। তারা এ দুনিয়ায় কষ্টকর সাধনা করে উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদা অর্জন করেন। মহান আল্লাহও নবী-রাসুল এবং আওলিয়ায়ে কেরামকে বেশি বিপদে-আপদে ফেলে তাদেরকে বেশি ঘনিষ্ঠ করেন। কাশেফির মতে কারবালার শহীদরা জীবিত অবস্থায় দুনিয়ায় যথাযথ মর্যাদা পাননি, কিন্তু তাঁরা শাহাদতের মাধ্যমে উচ্চতর মর্যাদা পেয়েছেন। কাশেফির মতে মহানবীর আহলেবাইতের অনুরাগীদের জন্য সর্বোত্তম বিষয় হল তাঁদের জন্য কান্নাকাটি করা যা তাদের জন্য মুক্তির তথা বিচার-দিবসে ওই মহামানবদের সুপারিশ পাওয়ার মাধ্যম।#

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।