জুন ২৮, ২০২০ ১১:৩৮ Asia/Dhaka

গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকের তথা খ্রিস্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি সুফি সাধক, মুহাদ্দিস ও কবি শেখ নাজমুদ্দিন কুবরার জীবন, চিন্তাধারা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

গত পর্বে আমরা বলেছিলাম, প্রখ্যাত ইরানি সুফি সাধক শেখ নাজমুদ্দিন কুবরা জন্ম নিয়েছিলেন ৫৪০ হিজরিতে তথা ১১৪৫ খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন ইরানের খাওয়ারেজম অঞ্চলের খিভা রাজ্যে যা বর্তমানে উজবেকিস্তানের অংশ। শেখ নাজমুদ্দিন কুবরা ছিলেন কোবরুইয়া সুফি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা অথবা এই সুফি তরিকার শীর্ষস্থানীয় শেখদের অন্যতম। তিনি ইসলামী ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য মিশর ও হিজাজসহ বহু অঞ্চল সফর করেছিলেন।

রাশিয়ার প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ ও  গবেষক বার্থেলসের মতে শেখ নাজমুদ্দিন কুবরা ছিলেন প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক রহস্যময় জ্ঞান-জগতের এক সূর্য এবং তার আধ্যাত্মিকতার আলো গোটা ইসলামী বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

শেখ নাজমুদ্দীন যাহাবিয়্যাহ্ কুরবানিয়াহ্ ও অপর কয়েকটি সুফী ধারার প্রবর্তন করেন। তিনি তাঁর অনেক শিষ্যকে সুফীতাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে উপযুক্তরূপে গড়ে তোলেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ওয়ালী ও মুরশিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। এদের মধ্যে মাজদুদ্দীন বাগদাদী, শেখ ফরিদউদ্দিন আত্তার, সা’দুদ্দীন হামাভী ও নাজমুদ্দীন রাযী সমধিক বিখ্যাত।

অবশেষে ৭৮ বছর বয়সে নিজ জন্মভূমিতেই মঙ্গলদের হামলায় শাহাদত বরণ করেন শেখ নাজমুদ্দিন কুবরা। শেখ নাজমুদ্দীন কুবরা, তাঁর ছাত্র এবং অনুরাগীরা মোঙ্গল হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে তাঁদের শহরকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এ যুদ্ধেই কুবরা ও তার শিষ্যরা ১২২১ খ্রিস্টাব্দ তথা ৬১৮ হিজরিতে শাহাদাত বরণ করেন।

শেখ নাজমুদ্দীন কুবরা অনেক গ্রন্থ লিখেছেন। এর মধ্যে একটি ছিল কুরআন মজীদের ব্যাখ্যা তথা তাফসীর। বারো খণ্ডে লেখা এ বইয়ের নাম ছিল আইনুল হায়াত। অসম্পূর্ণ এ তাফসির সম্পূর্ণ করেন তার দুই ছাত্র। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর কোন কপি বর্তমানে নেই। তাঁর একটি ক্ষুদ্র রিসালাহ্ গ্রন্থ হচ্ছে ‘ফী আদাবিস সালিকীন’ তথা আধ্যাত্মিক পথের পথিকদের আদব-কায়দা। এশিয়ান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত এ বইটির নাম আরবি ভাষায় হলেও গ্রন্থটি ফার্সি ভাষায় রচিত। আরবি ভাষায় রচিত তার অপর একটি রিসালাহ্ বইয়ের নাম ‘আদাবুস সুলুক ইলা হাযরাতি মালিকিল মূলক’ তথা মহামহিম রাজাধিরাজের দিকে পথপরিক্রমার আদব-কায়দা ও রীতিনীতি। গ্রন্থটির দু’টি অংশ রয়েছে। একটি অংশ হচ্ছে অমনোযোগিতার পর্দা, ব্যবধান ও অন্ধকারের পর্দাগুলো অপসারণের মাধ্যমে মহান আল্লাহর দিকে আধ্যাত্মিক পথ পরিক্রমা বিষয়ক। অপর অংশটি হচ্ছে আল্লাহ্তায়ালার সৃষ্ট এ বিশাল ধরিত্রীর বুকে শারীরিকভাবে পরিক্রমণ বিষয়ক।

অতীত যুগের সুফিবাদীদের অনেকেই বা বেশিরভাগ সুফি ধারার ওস্তাদ ও শিষ্যরা বাহ্যিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে বাধা বলে মনে করতেন। ফলে সাধারণত তারা আধ্যাত্মিক উন্নতির বিষয়ে কোনো বই লেখা বা কোনো রচনা প্রকাশের উদ্যোগ নিতেন না।  কিন্তু শেখ নাজমুদ্দিন কুবরা বা কোবরুইয়া সুফি তরিকার অন্য ওস্তাদ বা মুর্শিদরা ছিলেন এই নীতির ব্যতিক্রম। তারা আধ্যাত্মিক পথ-পরিক্রমার বিষয়ে লেখালেখি করেছেন এবং এর ফলে ইরানের ইসলামী সংস্কৃতি ও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারা হয়েছে সমৃদ্ধ।

শেখ নাজমুদ্দিন কুবরার লেখা বইগুলোর মধ্যে অনেক বইয়ের কেবল নামই জানা যায়। সেসবের কোনো কপি আজ আর দেখা যায় না কোথাও। হাতে-লেখা তার বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। এসব বই দেখা যায় তুরস্কের নানা লাইব্রেরিতে। তিনি বই লিখেছেন আরবি ও ফার্সি ভাষায়।  'ফাওয়াহিল জামাল ও ফাওয়াতিহুল জালাল' আধ্যাত্মিক উন্নয়ন তথা খোদাপ্রেম বিষয়ে কুবরার লেখা একটি বিখ্যাত বই। শেখ কুবরার বেশিরভাগ ইরফানি বা ইসলামী আধ্যাত্মিক চিন্তাধারা ও নির্জনতার দর্শনের সমাবেশ দেখা যায় এ বইয়ে। এ বইয়ে রয়েছে কুবরার আধ্যাত্মিক রং ও নুর। রেসালেহইয়ে ফিল খালউয়াত কুবরার আরেকটি বইয়ের নাম। এটি সংরক্ষণ করা হচ্ছে তুরস্কের শহীদ আলী পাশা ও মুরাদমোল্লা কমপ্লেক্সে। আওয়ারাদ আল আহবাব কুবরার আরো একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম।

রিসালাত ইলা ইলহায়িম আলখায়িফ মিন লুমাতাল আলায়িম শীর্ষক শেখ কুবরার আরেকটি বিখ্যাত বই রয়েছে। বইটির বিষয়বস্তু নির্জন-বাস বা একাকী জীবন যাপন করা। রিসালাহ আসসায়িরুল হায়ির ইলাসসাতির আলওয়াজিদ আল মাযিদ নামে শেখ কুবরার আরেকটি বই রয়েছে। এ বইটি দশটি শর্তের বই নামেও খ্যাত। বইটি আসলে আগের বইটির ফার্সি রূপান্তর। ফার্সিভাষী ব্যক্তিদের অনুরোধে আগের ওই বইটিকে ফার্সিতে রূপান্তর করা হয়। শেখ কুবরার আরেকটি বইয়ের নাম উসুল আল আশারাহ তথা দশ মূলনীতি। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্পর্কিত দশটি মূল নীতির ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে এ বইয়ে। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে তওবা, অল্পে-তুষ্টি, জিক্‌র বা আল্লাহর স্মরণ, ধৈর্য ও সংযমী বা দারিদ্র-ব্যঞ্জক জীবন-যাপন, উত্তম আচরণ, প্রবৃত্তি-দমন, সব অবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি ইত্যাদি।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।