গল্প ও প্রবাদের গল্প (পর্ব:-৫)
আপনারা নিশ্চয়ই জানেন ইরান প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ। সুতরাং এ দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি যে বেশ সমৃদ্ধ তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না।
শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে বিশ্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাহিত্য সংস্কৃতির নেপথ্য প্রেরণা ছিল ইরানের সাহিত্য। অসংখ্য গল্প কিংবা প্রবাদ প্রবচন যেসব আমরা প্রায়ই মুখে মুখে উচ্চারণ করি সেগুলো যে ইরানের অনেকেরই হয়তো তা জানা নেই। সেইসব গল্প রূপকথার মতো মনে হলেও এগুলো আমাদের জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে আছে।
মুখে মুখে উচ্চারিত বহু প্রবাদ প্রবচনের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। এসব গল্পে রয়েছে আমাদের জীবন ঘনিষ্ঠ বহু শিক্ষা ও উপদেশ। আমরা সেইসব গল্প এবং প্রবাদের পেছনের গল্প নিয়ে এ আসরে আপনাদের সঙ্গে থাকবো। আশা করি এ আসরটি আপনাদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি চিন্তার জগতেও নাড়া দেবে। যাই হোক আজ আমরা শুনবো চিরায়ত একটি প্রবাদের গল্প। বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার কথা আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে চালু আছে। কঠিন কোনো কাজের উদ্যোগ নেওয়ার দু:সাধ্য কাজটি করার ক্ষেত্রে আমরা এই প্রবাদটি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই কী করে এই প্রবাদটি আমাদের মাঝে এলো। সেই গল্পটিই আমরা আজকের আসরে শুনবো।
আমাদের এ সময়ের মতোই প্রাচীন কোনো এক কালের কথা। সে সময় বেড়ালরা ছিল ইঁদুরের মারাত্মক শত্রু। আজকালও যে শত্রু নয় তা নয় তবে বেড়ালের প্রতি আমাদের ভালোবাসা বৃদ্ধি পাওয়াতে তারা এখন শিকার ভুলে যেতে বসেছে। অথচ প্রকৃতিগতভাবে বেড়াল হলো শিকারী প্রাণী। বিশেষ করে ইঁদুর শিকার করে তারা মনিবের ঘরবাড়ি ধান-চালের গোলাকে ইঁদুরের অত্যাচার থেকে রক্ষা করতো। ইঁদুর দেখলেই বেড়াল ঝাঁপিয়ে পড়তো এবং মৃত্যুর কবলে পড়ে যেত। ইঁদুর আবার সমাজবদ্ধ প্রাণী। বহু ইঁদুর এক জায়গায় একত্রে বসবাস করে। এরকমই তারা বাসা বেঁধেছিল বড়োসড়ো একটি বাড়ির নীচে। মজার ঘটনা হলো ওই বাড়িটিতেই ছিল বেশ শক্তিশালী এবং হৃষ্টপুষ্ট একটি বেড়াল। মনিবের পছন্দের ওই বেড়ালটি দেখতে যেন বাঘের বাচ্চা। তো যে বাড়িতে এরকম একটি বেড়ালের বাস সে বাড়িতে ইঁদুরদের চলাফেরা কতোটা বিপজ্জনক তা তো বুঝতেই পারা যায়।
মৃত্যুকে হাতে নিয়েই ভয়ে ভয়ে তাদেরকে চলাফেরা করতে হতো। ব্যাপারটা যেন এমন যে বেড়াল হলো এই বাড়ির মালিক আর ইঁদরগুলো চোর। তো চোর কি আর বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করতে পারে? ইঁদুরগুলো তাই তাদের আস্তানা থেকে বের হবার সাহস করতো না। বেরুলে নির্ঘাৎ বেড়ালের শিকার হতো। কিন্তু এভাবে কি জীবন চলে? তাদেরও তো বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপাদান চাই, তাই না! কী করা যায়! হতাশ হয়ে ভাবতে ভাবতে ইঁদুরগুলো এক রাতে একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ করলো। কী করে বেড়ালের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, জীবন বাঁচানো যায়, একটা উপায় তো খুঁজে বের করতেই হবে ইত্যাদি বিষয়ে তারা খোলামেলা আলোচনায় বসলো।
ইঁদুরদের জরুরি পরামর্শ সভা হচ্ছিলো। একজন বললো: বরং এই বাসা ছেড়ে যাওয়াই ভালো। আরেজন বললো: সবাই মিলে বেড়ালের ওপর হামলা করলে কেমন হয়! কেউ আবার বেড়ালের সঙ্গে সংলাপে বসার প্রস্তাব দিলো। মোটকথা এভাবে সবাই নিজ নিজ পরামর্শ দিলো। কিন্তু কারও পরামর্শই সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট ছিল না। একটি স্বল্পবাক ইঁদুর বললো: আমরা তো দ্রুত দৌড়তে জানি। যখনই আমরা বেড়ালের আসার ইঙ্গিত পাবো, দ্রুত পালাবো। অপর একটি ইঁদুর বললো: কী বলতে চাস? বেড়ালের শিকার হওয়ার আগেভাগে কী করে আমরা টের পাবো যে সে আসছে?
ইঁদুরটি একটু ভেবেচিন্তে বললো: একটা ঘন্টি হলো হতো!
অপর ইঁদুর বললো: ঘণ্টি? কী জন্য?
ইঁদুরটি বললো: ঘণ্টি থাকলে সেটা বেড়ালের গলায় ঝুলিয়ে দিলেই ব্যাস ... বুঝে যেতাম বেড়াল কখোন, কোথায়, কোনদিকে যাচ্ছে ... আমরা সতর্ক হয়ে যেতাম। জীবনটাও রক্ষা পেত আমাদের। পরামর্শ সভার অন্যান্য ইঁদুরের পছন্দ হলো প্রস্তাবটি। তারপর থেকেই তারা একটি ঘণ্টি সংগ্রহের পেছনে লেগে গেল। একজন বললো: আমি এ বাড়ির মালিকের একটি ছাগলের গলায় ঘণ্টি দেখেছি। রাতেরবেলা বেড়াল ঘুমালে ওই ঘণ্টিটা নিয়ে আসা যাবে। সবাই সায় দিলো এবং চিন্তামতো কাজটি করলো, দাঁত দিয়ে সূতো কেটে ঘণ্টিটা নিয়ে এলো। ঘণ্টির হুকের ভেতর দিয়ে মোটা লম্বা সূতো ঢুকিয়ে গলায় ঝুলানোর জন্য প্রস্তুত করা হলো। এবা দেখা দিলো আসল সমস্যা। বেড়ালের গলায় কে পরাতে যাবে এই ঘণ্টি! এ নিয়ে ভাববার মাঝেই বৃদ্ধ একটি ইঁদুর বললো: যে ইঁদুরটি এই অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়েছে সে-ই যাবে। চারদিকে নীরবতা নেমে এলো। কারও মুখেই কথা নেই।
ঘণ্টি বাঁধার প্রস্তাব যে দিয়েছে বৃদ্ধের কথায় সে এখন চুপ হয়ে বসে আছে। নিশ্চিত মৃত্যুর এই ঝুঁকি সে নিতে রাজি নয়। কিন্তু বৃদ্ধ ইঁদের কথা শিরোধার্য, যেতেই হবে এবং সেটাই হলো। সবাই কান্নাকাটি করে তাকে ঘণ্টি নিয়ে এগিয়ে যেতে বাধ্য করলো। তারপর যা হবার তাই হলো। বেড়ালের গলায় ঘণ্টি বাঁধার জন্য যে ইঁদরটিকে তাদের আস্তানা থেকে ঘণ্টিসহ বের করে দিয়েছিলো সেই ইঁদুরটিকে কেউ আর কোনোদিন দেখতে পায় নি। এমনকি যে ঘণ্টিটি বেড়ালের গলায় ঝোলানোর কথা ছিল সেই ঘণ্টিটির আওয়াজও কেউ কোনোদিন শোনে নি। এরপর থেকে যখনই কঠিন কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া দুরূহ হতো, মানুষ বলতো: বেড়ালের গলায় ঘণ্টি বাঁধবে কে?#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৫
মূল ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ