সূরা আশ-শূরা: আয়াত ১৫-১৮ (পর্ব-৪)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ১৫ ও ১৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَلِذَلِکَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ کَمَا أُمِرْتَ وَلا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَقُلْ آمَنْتُ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ مِنْ کِتَابٍ وَأُمِرْتُ لأعْدِلَ بَیْنَکُمُ اللَّهُ رَبُّنَا وَرَبُّکُمْ لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَکُمْ أَعْمَالُکُمْ لا حُجَّةَ بَیْنَنَا وَبَیْنَکُمُ اللَّهُ یَجْمَعُ بَیْنَنَا وَإِلَیْهِ الْمَصِیرُ ﴿١٥﴾ وَالَّذِینَ یُحَاجُّونَ فِی اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مَا اسْتُجِیبَ لَهُ حُجَّتُهُمْ دَاحِضَةٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَعَلَیْهِمْ غَضَبٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ شَدِیدٌ ﴿١٦﴾
“সুতরাং আপনি তাদেরকে (সত্যের পথে) আহবান করুন এবং (এই আহ্বানে) অটল থাকুন যেভাবে আপনি আদিষ্ট হয়েছেন। আর আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না; এবং বলুন: আল্লাহ যে কিতাবই নাযিল করেছেন আমি তাতে ঈমান এনেছি এবং আমি আদিষ্ট হয়েছি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে। আল্লাহ্ আমাদের রব এবং তোমাদেরও রব। আমাদের কাজের প্রতিফল আমরা ভোগ করব, আর তোমাদের কাজের প্রতিফল তোমরা ভোগ করবে; আমাদের ও তোমাদের মধ্যে কোন বিবাদ নেই, আল্লাহ আমাদেরকে (ও তোমাদেরকে কিয়ামতের দিন) একত্রিত করবেন এবং সকলের ফিরে যাওয়া তারই কাছে।” (৪২: ১৫)
“যারা আল্লাহর আহ্বানে সাড়া আসার পর তাঁর সম্পর্কে বিতর্ক করে তাদের যুক্তি-তর্ক তাদের রবের দৃষ্টিতে অসার ও ভিত্তিহীন। তারা (আল্লাহর) ক্রোধের পাত্র এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (৪২: ১৬)
এই দুই আয়াতের শুরুতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে উদ্দেশ করে বলেন: মুশরিক ও আহলে কিতাবসহ সব মানুষকে আপনার কাছে ওহী হিসেবে পাঠানো দ্বীনের দিকে আহ্বান করুন; কারণ এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সর্বশেষ বিধিবিধান। আপনি এই পথে অটল-অবিচল থাকুন এবং তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবেন না। তাদের প্রত্যেক দল তাদের ইচ্ছা ও স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে আপনাকে ডাকবে, কিন্তু আপনি তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না বরং সবাইকে আপনার রবের একত্ববাদের ছায়াতলে একত্রিত করার চেষ্টা করুন।
আপনি আহলে কিতাব অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বলুন: আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা প্রতিটি কিতাবের প্রতি আমার ঈমান আছে। আমি তোমাদের কিতাবসমূহ ও নবীদের মেনে নিয়েছি এবং আমার রিসালাত হচ্ছে তাদের রিসালাতেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। পূর্ববর্তী সব নবীর ধর্মের সমষ্টি ও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ রূপই হচ্ছে আমার ধর্ম ইসলাম।
পূর্ববর্তী নবীদের মতো আমিও তোমাদের সঙ্গে ন্যায়পূর্ণ আচরণ করতে ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে আদিষ্ট হয়েছি। তোমাদের এবং আমার রব একই সত্ত্বা। আমি আমার রিসালাতের সত্যতার কারণ তোমাদের সামনে তুলে ধরেছি। আমাকে আমার কর্মের জন্য দায়ী থাকতে হবে এবং তোমাদেরকেও তোমাদের কর্মের জন্য দায়ী করা হবে। তোমাদের সামনে সব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এখন তোমাদের সঙ্গে আমাদের আর কোনো বিবাদ বা ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই। আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে ও আমাদেরকে একত্রিত করবেন এবং সেদিনের বিচারক হবেন সেই একক সত্ত্বা। সেদিন দেখা যাবে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ও আমাদের মধ্যে কি ফয়সালা দান করেন?
পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা বিবাদ শুরু করে এবং ইসলামকে দুর্বল করার চেষ্টা চালায়। তারা যখন দেখে একদল ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং আরেকদল এই এশী ধর্ম গ্রহণে করতে যাচ্ছে তখন তারা তা সহ্য করতে পারে না।
যেসব মুশরিক সত্য উদ্ভাসিত হয়ে যাওয়ার পরও শুধুমাত্র বিদ্বেষ ও গোঁয়ার্তুমির কারণে নিজেদের মিথ্যা বিশ্বাসে অটল থাকে তারা কোনো দলিল বা যুক্তির ধার ধারে না। তারা ইসলাম গ্রহণ না করার জন্য যেসব অজুহাত দাঁড় করায় তা আল্লাহর দরবারে বাতিল ও ভিত্তিহীন বলে প্রতীয়মান হয়। এর পরিণতিতে তাদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে খুশি করতে গিয়ে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা যাবে না।
২- ঐশী ধর্মগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে না থাকলে এই কাজ করা সম্ভব নয়।
৩- আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক সত্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু সত্য সামনে আসার পর তর্ক করার প্রয়োজন নেই। প্রতিপক্ষ যদি তা মেনে না নেয় তাহলে চুপচাপ তাদেরকে তাদের দায়িত্বে ছেড়ে দিতে হবে।
সূরা শুরার ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
اللَّهُ الَّذِی أَنْزَلَ الْکِتَابَ بِالْحَقِّ وَالْمِیزَانَ وَمَا یُدْرِیکَ لَعَلَّ السَّاعَةَ قَرِیبٌ ﴿١٧﴾ یَسْتَعْجِلُ بِهَا الَّذِینَ لا یُؤْمِنُونَ بِهَا وَالَّذِینَ آمَنُوا مُشْفِقُونَ مِنْهَا وَیَعْلَمُونَ أَنَّهَا الْحَقُّ أَلا إِنَّ الَّذِینَ یُمَارُونَ فِی السَّاعَةِ لَفِی ضَلالٍ بَعِیدٍ ﴿١٨﴾
“(তিনিই) আল্লাহ, যিনি সঠিকভাবে কিতাব ও মীযান নাযিল করেছেন। আর আপনি কী জানেন, হয়ত কিয়ামত খুবই নিকটবর্তী!” (৪২: ১৭)
“যারা এটাতে ঈমান রাখে না তারাই তা ত্বরান্বিত করতে চায়। আর যারা ঈমান এনেছে তারা তা থেকে ভীত থাকে এবং তারা জানে যে, কিয়ামত অবশ্যই সত্য। জেনে রাখুন, কিয়ামত সম্পর্কে যারা সংশয় সৃষ্টি করে (এবং তর্কে লিপ্ত হয় ও অস্বীকার করে) তারা অনেক বড় ও দীর্ঘ বিভ্ৰান্তিতে নিপতিত।” (৪২: ১৮)
এই দুই আয়াতের শুরুতে বলা হচ্ছে: আমরা যে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি তিনি মানুষকে সঠিকপথের দিশা দেয়ার জন্য আসমানি কিতাব পাঠিয়েছেন এবং তাতে মিথ্যা থেকে সত্যকে পার্থক্যকারী মিজান নির্ধারণ করেছেন। মানুষ যাতে নিজের ইচ্ছেমতো সত্য ও মিথ্যা নির্ধারণ না করে সেজন্যই এই ব্যবস্থা।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা নিজে সত্য এবং তিনি যা দান করেন তার সবই সত্য। বিশ্বজগতে যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে তার সবই ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তায়ালা। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে ওহী প্রদানের মাধ্যমে মানুষকে শরিয়তের যে বিধান দিয়েছেন তাও সত্য। মানুষের পক্ষে পঞ্চ ইন্দ্রীয় দিয়ে যেসব বিষয় উপলব্ধি করা সম্ভব নয় মহান আল্লাহ সেসব বিষয় ওহীর মাধ্যমে মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন।
মানবজীবনের এরকম একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কিয়ামত। কিয়ামতের দিন সত্য, ন্যায়বিচার ও মিজান সম্পূর্ণরূপ নিয়ে মানুষের সামনে আবির্ভূত হবে।
এ কারণে পবিত্র কুরআনে ওই দিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হচ্ছে: আপনি তো জানেন না; হয়তো কিয়ামত নিকটেই রয়েছে!
কিন্তু দুঃখজনকভাবে যেসব মানুষ কিয়ামতে বিশ্বাস করত না তারা বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। তারা বিদ্রোহী মনোভাব নিয়ে বিশ্বনবীকে বলত: যদি তুমি সত্য বলে থাকো তাহলে এখনই কিয়ামত ঘটিয়ে দাও!
কিন্তু ঈমানদার ব্যক্তিরা কিয়ামতের ভয়াবহ দিবসের ভয়ে নিজেদের প্রতিটি কথা ও কর্ম সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করেন। কারণ তারা জানেন, কিয়ামত দিবসের হিসাব-নিকাশ না থাকলে এই বিশ্বজগত সৃষ্টি অর্থহীন হয়ে যায়। তবে কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে তা আল্লাহ ছাড়া আর কারো জানা নেই। এমনকি তিনি এই মহাদিবসের দিনক্ষণ তাঁর রাসূলকেও জানাননি। প্রতি মুহূর্তে কিয়ামত হয়ে যেতে পারে ভেবে মানুষ যাতে সতর্ক হয়ে চলে সেজন্যই হয়ত আল্লাহ তায়ালা এই ব্যবস্থা রেখেছেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:
১- পবিত্র কুরআন হচ্ছে মিথ্যা থেকে সত্যকে পার্থক্যকারী কিতাব। এই কিতাবে বাতিলের লেশমাত্র নেই।
২- কিয়ামতের দিনক্ষণ কারো জানা নেই। কাজেই যেকোনো মুহূর্তে সে ভয়াল দিবস এসে যেতে পারে ধরে নিয়ে আমাদেরকে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।#
পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।