ঐতিহাসিক ৮ রবিউস সানি
ইমাম মাহদি (আ.)'র বাবার শুভ জন্মবার্ষিকী
২৩২ হিজরির ৮ রবিউস সানি ইসলামের ইতিহাসের এক মহাখুশির দিন। কারণ, এ দিনে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইত বা তাঁর নিষ্পাপ বংশধারার অন্যতম সদস্য, মুসলিম উম্মাহর অন্যতম পথ-প্রদর্শক ইমাম হাসান আসকারি (আ.)। এ উপলক্ষে সবাইকে অজস্র শুভেচ্ছা এবং বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানে অশেষ দরুদ ও সালাম জানাচ্ছি।
ইমাম হাসান আসকারি (আ.)'র বাবা ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য দশম ইমাম হযরত হাদী (আ.)। মা ছিলেন মহীয়সী নারী হুদাইসা।
ইমাম হাসান আসকারি (আ.) জন্ম নিয়েছিলেন পবিত্র মদিনায়। কিন্তু আব্বাসীয় শাসকদের আদেশে ইমাম আসকারি (আ.) বাধ্য হয়েছিলেন পিতা ইমাম হাদীর (আ.) সাথে প্রিয় মাতৃভূমি মদিনা ছেড়ে আব্বাসীয়দের তৎকালীন শাসনকেন্দ্র সামেরায় চলে যেতে। সামেরায় তৎকালীন শাসকদের সশস্ত্র বাহিনীর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র 'আসকার' অঞ্চলে কঠোর নজরদারির মধ্যে এই ইমামকে বসবাস করতে হয়েছিল বলে তিনি আসকারি নামে খ্যাত হন। নানা ধরনের কঠোর বাধা সত্ত্বেও ইমাম হাসান আসকারি (আ.) অশেষ ধৈর্য নিয়ে তাঁর অনুসারীদের জ্ঞানগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকসহ নানা ক্ষেত্রে পথ-নির্দেশনা দিতেন। এর কারণ, আল্লাহ নিজেই বলেছেন যে, তিনি ইসলামের আলোকে ছড়িয়ে দেবেন।
ইমাম হাসান আসকারি (আ.)'র যুগে আব্বাসীয় শাসকরা সব ক্ষেত্রেই ছিল অবিচারে অভ্যস্ত। তারা জনগণের সম্পদ শোষণের পাশাপাশি মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তাধারায়ও বিভ্রান্তি ছড়াত। কিন্তু জনগণ এ খবর পেয়েছিল যে, ইমাম হাসান আসকারির (আ.) সন্তান ইমাম মাহদির (আ.) মাধ্যমে গোটা বিশ্ব জুলুম আর অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্তি পাবে। শাসকগোষ্ঠীও এই খবর জানতো। তাই তারা ইমামকে জন-বিচ্ছিন্ন করতে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে এবং ইমামের যেন কোনো সন্তান জন্ম না নেয় সে লক্ষ্যে সব রকম ব্যবস্থা নেয়। ইমাম হাসান আসকারি (আ.) নিজেও বিশেষ দিনগুলোতে আব্বাসীয় শাসকদের দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য হতেন। কিন্তু এতসব বাধা সত্ত্বেও ইমাম হাসান আসকারির (আ.)'র সন্তান তথা মানবজাতির শেষ ত্রাণকর্তা ইমাম মাহদি (আ.) জন্ম গ্রহণ করেন মহান আল্লাহর কুদরতে, ঠিক যেভাবে ফেরাউনের বাধা সত্ত্বেও মুসা (আ.)'র জন্ম ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
ইমাম মাহদি'র (আ.) জন্মের পর ইমাম হাসান আসকারি (আ.) মুসলিম সমাজকে ভবিষ্যৎ নানা বাধা মোকাবেলার দিক-নির্দেশনা দেন। তিনি নানা প্রেক্ষাপটে নিজের অনুসারী ও সহযোগীদের চিঠি লিখে দিক-নির্দেশনা দিতেন।

এ ছাড়াও ইমাম নানা কুপ্রথা ও ভুল চিন্তাধারা সম্পর্কে মুসলমানদের সন্দেহ দূর করে খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের চিন্তাধারা তুলে ধরেন। জ্ঞানগত বিতর্কে তাঁর যুক্তি ছিল এমন অকাট্য ও মোক্ষম যে ইয়াকুব বিন ইসহাক কিন্দির মত বস্তুবাদী দার্শনিকও এই মহান ইমামের বক্তব্য শুনে ধর্ম-বিরোধী নিজের লেখা বই নিজেই পুড়ে ফেলেন।
আব্বাসীয় মন্ত্রী আহমাদ বিন খাক্বান ইমাম হাসান আসকারি (আ.)'র যোগ্যতা, গুণ ও কারামত সম্পর্কে বলেছেন: 'সামেরায় হাসান বিন আলীর মত কাউকে দেখিনি। বিনম্রতা, চারিত্রিক ও নৈতিক পবিত্রতা এবং মহানুভবতার মত ক্ষেত্রগুলোতে তাঁর মত আর কাউকে দেখিনি। শত্রু ও বন্ধু সবাই তাঁর প্রশংসা করত।'
ইমাম হাসান আসকারি'র (আ.) উচ্চ পর্যায়ের নামাজ অন্যদেরকে আল্লাহর ইবাদতে আকৃষ্ট করত। ইমাম যখন সালেহ ইবনে ওয়াসিফ-এর কারাগারে বন্দি তখন তৎকালীন শাসক কারাপ্রধানকে ইমামের সঙ্গে খুব কর্কশ আচরণ করার ও কঠোর শাস্তি দেয়ার নির্দেশ দেয়। এ লক্ষ্যে কুখ্যাত দুই জল্লাদকে নিয়োগ দেয় কারা-প্রধান। কিন্তু তারা ইমামের পুত-পবিত্র চরিত্রের সংস্পর্শে সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে পাকা নামাজি হয়ে যায়।
ইমাম হাসান আসকারির ইমামতির ছয় বছরে আব্বাসীয় শাসক ছিল মোতায, মোহতাদি এবং মোতামেদ। ইমাম এদের জুলুমতন্ত্রের প্রতিবাদ করায় তারা ইমামের ওপর রুষ্ট হয়। এ কারণে তাঁকে বহুবার বন্দি করা হয়। কিন্তু তারপরও ইমাম আপোষ করেননি। অবশেষে জালিম মোতামেদ বুঝতে পারে, বন্দী রেখেও ইমাম হাসান আসকারির প্রতি জনগণের ভালবাসার জোয়ার ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, বরং তাঁর বন্দীদশা সরকারের গদিকে নড়বড়ে করবে; তাই সে ইমামকে গোপনে বিষ প্রয়োগ করে। ফলে ইমাম ২৬০ হিজরির ৮ রবিউল আউয়াল শাহাদত বরণ করেন মাত্র ২৮ বছর বয়সে। মাত্র ছয় বছরের ইমামতির জীবনে ইসলামের এক গৌরবময় সোনালী অধ্যায় উপহার দিয়ে গেছেন ইমাম হাসান আসকারি (আ)। মোতামেদ এই হত্যাকাণ্ড গোপন রাখতে চেয়েছিল যাতে গণ-বিদ্রোহ দেখা না দেয়।
ইমামের মৃত্যুর সংবাদ শুনে সমগ্র সামেরায় শোকার্ত মানুষের ঢল নামে। সর্বত্র শোনা যাচ্ছিল কান্না। বনি হাশিম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, সেনা ও কমান্ডার, বিচারপতি, কবি-সাহিত্যিকসহ আপামর জনসাধারণ শোক-সমাবেশে যোগ দেয়। সামেরা যেন সেদিন কিয়ামতের মাঠে পরিণত হয়।
ইমামের শাহাদতের পর তাঁর বাড়ির আঙ্গিনায় ইমামের ভাই জাফর জানাজার নামাজ পড়ানোর জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন ইমাম মাহদি (আ.) আবির্ভূত হয়ে জাফরকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই পিতার জানাজার নামাজ পড়ান।
ইমাম হাসান আসকারি (আ.)'র অনেক মুজেজা ও অদৃশ্য কর্মকাণ্ডের কথা জানা যায়। যেমন, তিনি মানুষের মনের অনেক গোপন কথা বা বাসনা জেনে তাদের সেইসব বাসনা পূরণ করেছেন, অদৃশ্যের অনেক খবর দিয়েছেন, নানা ভাষাভাষী ভৃত্যদের সঙ্গে তাদের নিজ নিজ ভাষায় কথা বলেছেন।
ইমাম হাসান আসকারি (আ)-এর মূল্যবান কয়েক'টি বাণী শুনিয়ে শেষ করবো আজকের এই বিশেষ আলোচনা। তিনি বলেছেন :
আল্লাহর অত্যধিক প্রশংসা করবে ও তাঁকে বেশি বেশি স্মরণ করবে। মৃত্যুকেও বেশি বেশি স্মরণ করবে; বেশি বেশি কুরআন পড়বে এবং রাসূল (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের উদ্দেশে বেশি বেশি দরুদ পাঠাবে, কারণ, তাঁদের শানে দরুদ পাঠানোতে রয়েছে দশটি নেকি ও কল্যাণকর প্রভাব।
- যে কাউকে গোপনে উপদেশ দেয় সে তাকে অলংকৃত করলো, আর যে সবার সামনে প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করলো, শুধু তার বদনামই করলো, সংশোধন করতে পারলো না।
অসংখ্য দরুদ ও রহমত বর্ষিত হোক ইমাম হাসান আসকারির ওপর।
সবাইকে আরও একবার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
(উল্লেখ্য, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের অনেক ধর্মীয় নেতা ও চিন্তাবিদ মনে করেন মানবজাতির শেষ ত্রাণকর্তা হযরত ইমাম মাহদি (আ.) প্রায় ১২০০ বছর আগে জন্ম গ্রহণ করেছেন। তিনি বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের বংশ ধারায় হযরত ইমাম ৃ-আ.’র নবম বংশধর তথা ১১ তম ইমাম হযরত ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’র পুত্র। মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি হযরত ঈসা (আ.)’র মত অদৃশ্য হয়ে যান। বিশ্বব্যাপী অন্যায়-অবিচার প্রতিরোধের লক্ষ্যে তিনি আবার ফিরে আসবেন এবং হযরত ঈসা নবী (আ.) তাঁর পেছনে নামাজ পড়বেন। অবশ্য ঠিক কখন আবারও তার আবির্ভাব ঘটবে মহান আল্লাহ ছাড়া কেউ তা জানেন না, যদিও তাঁর পুনরাবির্ভাবের কিছু লক্ষণ বা আলামতের কথা হাদিসে এসেছে। তিনি সারা বিশ্বে ইসলাম ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। মহান আল্লাহ তাঁর পুনরাবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন।) #
পার্সটুডে/এমএএইচ/৪