ইসলামী ‌ইরানে আল্লামা ইকবাল লাহোরির জনপ্রিয়তা ও প্রভাব
https://parstoday.ir/bn/radio/uncategorised-i24712-ইসলামী_ইরানে_আল্লামা_ইকবাল_লাহোরির_জনপ্রিয়তা_ও_প্রভাব
ইকবাল কখনও ইরান সফর করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইরানের সংস্কৃতি, ভাষা ও ইরানি দার্শনিকদের দর্শনের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ।
(last modified 2026-03-01T10:43:34+00:00 )
নভেম্বর ০৩, ২০১৬ ১৮:০১ Asia/Dhaka
  • আল্লামা ইকবাল লাহোরি
    আল্লামা ইকবাল লাহোরি

ইকবাল কখনও ইরান সফর করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইরানের সংস্কৃতি, ভাষা ও ইরানি দার্শনিকদের দর্শনের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ।

ইরানিদের সাংস্কৃতিক অবদান ছাড়া মুসলমানদের সংস্কৃতি একপেশে হয়ে যেত বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। তেহরান যদি প্রাচ্যের জেনেভা হয় তাহলে বিশ্বের সমস্যাগুলোর সমাধান হবে বলে ইকবাল পরামর্শ দিয়ে গেছেন। আল্লামা ইকবাল ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও তার বেশিরভাগ কবিতা লিখে গেছেন ফার্সি ভাষায়। ইকবাল ফার্সি সাহিত্য পড়াশুনা করেছেন নিজ ঘরেই। ফার্সি ভাষার মহান মরমী কবি মাওলানা রুমি ছিলেন কবিতা ও সাহিত্যে ইকবালের অনুপ্রেরণার উৎস এবং আদর্শ। ইরান থেকে এমন এক নেতার আবির্ভাব ঘটবে যিনি মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবেন বলেও তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। মরহুম ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লবকে এই ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিফলন বলে মনে করা যায়। 

ইরান যেমন ইকবালকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে তেমনি ইকবালের প্রতিও আকৃষ্ট হয়েছেন অনেক মহান ইরানি চিন্তাবিদ ও নেতা। অবশ্য ইকবালকে পুরোপুরি জানতে ও চিনতে সর্বস্তরের ইরানিদের অনেক সময় লেগেছে। ইকবালের পরিচিতি ইরানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তার জীবদ্দশার অনেক পরে। ১৯৭০ সালে ইরানে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হন আল্লামা ইকবাল।  

১৯৩২ সালে ইরানের সম্রাট রেজা শাহ নোবেল-জয়ী ভারতীয় বাঙ্গালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ইরান সফরের আমন্ত্রণ জানান। এতে ভারতের আরেক বড় কবি ইকবালের আত্মসম্মানবোধে কিছুটা ধাক্কা লাগে। ত্রিশের দশকের প্রায় শেষের দিক পর্যন্ত ইরানে ইকবালকে চিনতেন কেবল শিক্ষাবিদরা। তার রচিত ফার্সি কাব্যগ্রন্থ হাতে পাওয়ার সুবাদেই তারা তার সম্পর্কে জানতে পারেন। ইকবালের জীবদ্দশায় শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের বাইরে ইরানের অন্যান্য মহলে তার তেমন একটা পরিচিতি ছিল না। 

আল্লামা ইকবাল মারা যান ১৯৩৮ সনে। এ মহাকবির মৃত্যুর পর ইরানের বিপ্লবী কবি ‘মালাকুশ শোয়ারা’ তথা কবিদের সর্দার নামে খ্যাত মুহাম্মাদ তাকি বাহার ইকবালকে ইরানে জনপ্রিয় করে তোলেন। মালাকুশ শোয়ারা ইকবালের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বেশ কয়েকটি পঙক্তিও লিখেছেন। মালাকুশ শোয়ারা সাংবাদিকতাও করতেন। তিনি ইকবাল সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বর্তমান যুগ ইকবালের বিশেষ যুগ।  ইকবাল হচ্ছেন ইসলামের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি।’ গত শতকের ৫০’র দশকের গোড়ার দিকেই ইকবাল ইরানের শিক্ষাবিদদের গণ্ডী ছাড়িয়ে সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবী মহল ও সুশীল সমাজেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন।  
১৯৫২ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী ডক্টর মুহাম্মাদ মোসাদ্দেক ‘ইকবাল দিবস’ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় বেতারে একটি বিশেষ বাণী দিয়েছিলেন। তিনি ওই বাণীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানদের সংগ্রামে ইকবালের ভূমিকার প্রশংসা করেন। ডক্টর মোসাদ্দেক এ সময় ব্রিটিশ শোষণের মোকাবেলায় ইরানের তেল-জাতীয়করণ আন্দোলনের সফল নেতা হিসেবে ইরানিদের জাতীয় বীরে পরিণত হয়েছিলেন। 
ইকবাল সম্পর্কে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের ওই বাণীর পর ইরানের প্রায় সর্বস্তরে ইকবালের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ১৯৫০’র দশকের শেষের দিকে ইকবালের সমস্ত ফার্সি রচনা ও তার উর্দু কবিতাগুলোর অনুবাদও ফার্সি ভাষায় ইরানে প্রকাশিত হয়। ‘ইসলামের ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন’ শীর্ষক  ইকবালের বইটিও এ সময় ইরানে প্রকাশিত হয় ফার্সি ভাষায়। ১৯৬০’র দশকে পারস্যের দর্শন সম্পর্কিত ইকবালের পিএইচডি’র থিসিসটিও ইংরেজি থেকে ফার্সিতে অনুদিত হয়। আর এ বইটি পারস্যের দর্শন সম্পর্কে একটি উন্নত গবেষণা-কর্ম হিসেবে খুব অল্প সময়েই ইরানিদের কাছে স্বীকৃতি অর্জন করে।  

ইরান কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের মত পশ্চিমা উপনিবেশে পরিণত হয়নি। কিন্তু ব্রিটিশ, রুশ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের সংগ্রামের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ধর্মীয় আধুনিকতাবাদেও ইরানের রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। যেমন, ইরানে জন্ম নেয়া ও শিক্ষা গ্রহণকারী জামালউদ্দিন আফগানি ইরানের ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবেলায় ইকবালের বক্তব্য ও জাগরণী কবিতাগুলো ইরানি বুদ্ধিজীবীদের কাছেও তাদের মনের আকুতির প্রতিফলন হিসেবেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইকবাল পশ্চিমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নতির প্রশংসা করলেও তাদের বস্তুবাদ, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের কঠোর নিন্দা করতেন। 

১৯৭০’র দশকে ইকবাল ইরানিদের পুরোপুরি আপনজনের মতই পরিচিত হন। তার কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো দেখা যেত ব্যানারে এবং তার কবিতা আবৃত্তি করা হত বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশে। এভাবে ইকবাল হয়ে পড়েন ১৯৭৯ সালে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবের প্রেরণার অন্যতম সহায়ক উৎস।  

ইকবাল গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন ইরানের অনেক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদকে।  এক্ষেত্রে বিশেষভাবে ডক্টর আলী শরিয়তি, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী ও  আয়াতুল্লাহ মুতাহহারি (র)-এর  কথা সর্বাগ্রে উল্লেখ করা যায়। 
ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ইকবাল সম্পর্কে অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ কয়েকটি বই লিখেছেন। ইরানের প্রখ্যাত সংগ্রামী আলেম শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মুতাহহারি ‘ চলতি শতকের ইসলামী আন্দোলন’ শীর্ষক বইয়ে ইকবালকে হিজরি গত শতকের অন্যতম প্রধান সুন্নি ইসলামী সংস্কারক ও চিন্তাবিদ হিসেবে শ্রদ্ধাভরে উল্লেখ করেছেন। ইরানের আধুনিক যুগের আরও অনেক চিন্তাবিদ ইকবালের কাছে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেনার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। 

১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী পাকিস্তান সফর করেছিলেন। সেসময় তিনি ইকবালের 'জাবুরে আজম' কাব্যের একটি জাগরণী কবিতার দু’টি পঙ্‌ক্তি উচ্চারণ করেছিলেন: 

خواجه از خون رگ مزدور سازد لعل ناب
از جفای دهخدایان کشت دهقانان خراب
                                   ! انقلاب! 

                         !انقلاب! ای انقلاب

খ’জে আজ খুনে রাগে মাজদুর স’জাদ ল’লে ন’ব
আজ জাফায়ে দেহ খোদায়ীয়ান কাশত দেহকানান শোদ খারাব 
ইনকিলাব এই ইনকিলাব এই ইনকিলাব!
অর্থাৎ,
 শ্রমিকের রক্ত থেকে বানায় খাঁটি লাল রুবি পাথর পুঁজিবাদী শোষক
আর অত্যাচারী জমিদারের জুলুমে ফসল হারায় দরিদ্র কৃষক
বিপ্লব! বিপ্লব! হে বিপ্লব! 

সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করা ইরানি সমাজবিজ্ঞানী ডক্টর আলী শরিয়তির কাছে ইকবাল ছিলেন এমন এক বরণীয় ব্যক্তিত্ব বা মডেল ঠিক যেভাবে জালালউদ্দিন রুমি ছিলেন ইকবালের আধ্যাত্মিক প্রেরণার মডেল।  ১৯৭৯ সনের ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম সূতিকাগার হিসেবে বিবেচিত তেহরানের হুসাইনিয়ায়ি এরশাদ হলে বক্তৃতা দেয়ার সময় ইকবালকে তুলে ধরে তাকে ইরানিদের কাছে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন ডক্টর আলী শরিয়তি। তিনি এইসব বক্তৃতা দিয়েছেন ১৯৭০’র দশকে। গণজাগরণের ভয়ে  ভীত-সন্ত্রস্ত স্বৈরাচারী শাহ এই হলটি বন্ধ করে দিয়েছিল কিছুদিনের জন্য। 

ইমাম হুসাইন (আ) সম্পর্কে ইকবালের ফার্সি কবিতার পঙক্তি এই হলের দেয়ালে ও স্তম্ভে  শোভা পেত। বিশ্বনবীর (সা) আহলে বাইতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল শত শত ফার্সি-ভাষী সাহিত্যিক বা কবির মধ্যে স্থান করে নেয়া ইকবালের জন্য এক অসাধারণ সম্মানের বিষয় যা তাকে অমর করে রাখবে ফার্সি ধর্মীয় সাহিত্যের জগতেও। 

নবী-নন্দিনী হযরত ফাতিমা (সা)’ সম্পর্কে ইকবালের একটি চমৎকার আরবি কাসিদা মাঝে মধ্যে প্রচার করা হয় ইসলামী ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মিশরের এক শিল্পীর সুললিত কণ্ঠে। 
আত্মচেতনা ও উপলব্ধি বিষয়ক ইকবালের একটি ফার্সি কবিতা ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বার বার সম্প্রচারিত হয়েছে। তার লেখা ‘জাবুরে আজম’ কাব্যের জনপ্রিয় এই কবিতার প্রথম লাইনটি হল এমন: 
بینی جهان را خود را نبینی
تا چند نادان غافل نشینی
দেখছো বিশ্ব জগতকে কিন্তু দেখছো না নিজেকে
আর কতকাল বসে থাকবে অজ্ঞদের মত গাফেল হয়ে? #

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/৩