দায়েশ সন্ত্রাসীদের স্থানান্তর করা হচ্ছে পূর্ব এশিয়ায়
সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দায়েশ সন্ত্রাসীদের স্থানান্তর এবং ওই অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাস বিরোধী কমিটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিটি এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করবে বলে জানিয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাস বিরোধী এ কমিটি এক প্রতিবেদনে ইরাক ও সিরিয়া থেকে দায়েশ সন্ত্রাসীদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তরের বিপজ্জনক পরিণতির ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। জাতিসংঘের এ কমিটির প্রধান রাশিয়ার ক্র্যাশনোদার শহরে বলেছেন, ইরাক ও সিরিয়ায় অবস্থিত বিদেশি সন্ত্রাসীরা এ অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার চেষ্টা করছে যা কিনা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য খুবই বিপজ্জনক। তিনি দায়েশ সন্ত্রাসীদের ইরাক ও সিরিয়া থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, "এ থেকে বোঝা যায় ওই দুই দেশে সামরিক ব্যর্থতার পর সন্ত্রাসীরা এখন বিশ্বের অন্যখানে তৎপরতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে।"
প্রায় দুই বছর আগে বিদেশি মদদপুষ্ট দায়েশ সন্ত্রাসীরা ইরাক ও সিরিয়ায় ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এর পর থেকে তারা ওই এলাকা ছেড়ে অন্য দেশে চলে চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে তারা তিনটি স্থানকে বেঁছে নিয়েছে। প্রথমত, উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া, দ্বিতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ার আফগানিস্তান এবং তৃতীয়ত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে তারা বেছে নিয়েছে। সন্ত্রাসীরা এখন আফগানিস্তান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব অভিমুখে কথিত খেলাফত গঠনের জন্য ফের সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে এবং তারা বৃহত্তর ওই অঞ্চলে খেলাফত ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রোওহান গুনারাথনা বলেছেন, দায়েশ সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ফিলিপাইন হচ্ছে উত্তম জায়গা। ফিলিপাইনের মারাভি শহর দখলের ঘটনা থেকে প্রাচ্যে খেলাফত ঘোষণার জন্য তাদের প্রস্তুতির বিষয়টি আঁচ করা যায়।
প্রায় এক বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব রাজনৈতিক মহল ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ওই অঞ্চলে দায়েশের প্রভাব বিস্তারের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। এরই মধ্যে তারা দায়েশ সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। ওই অঞ্চলের দেশগুলোর রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দায়েশকে মোকাবেলা করতে হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কেননা সন্ত্রাসবাদের হুমকি কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং সারা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য বিরাট হুমকি। এ কারণে সন্ত্রাসীদের মোকাবেলায় সামরিক কর্মসূচি বা বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি তাদের সমস্ত গতিবিধির ওপর কঠোর নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে ব্যাংকিং লেনদেন, অর্থ স্থানান্তর, তেল ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাশ্চাত্য সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে তারাই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আসল মদদদাতা। বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আর্থ-রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে নিজেদের অশুভ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পাশ্চাত্য এসব সন্ত্রাসীদেরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো সম্প্রতি পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সফর করে সন্ত্রাসীদের মোকাবেলার জন্য এই তিন মুসলিম দেশের আলেমদের নিয়ে একটি ওলামা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এ প্রস্তাব দেয়া থেকে সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের পরিণতির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের গভীর উদ্বেগের প্রমাণ পাওয়া যায়। ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেনারেল হামিদিয়ান বলেছেন, "দায়েশ সন্ত্রাসীরা তথ্য প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে খুব সহজেই জনবল সংগ্রহ করছে এবং এটা ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তার জন্য বড় ধরণের সংকট তৈরি করেছে।"
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকা ও ন্যাটো জোটের দখলদারিত্ব ও তাদের সহযোগিতা ছাড়া আফগানিস্তানে মাদক উৎপাদন ও চোরাচালান সম্ভব নয়। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সহযোগিতা ছাড়া দায়েশ সন্ত্রাসীরা ইরাক ও সিরিয়ার তেল চোরাইপথে বিক্রি করতে পারতো না। বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। সুতরাং এ সংস্থাগুলো চাইলে সন্ত্রাসীদের লুট করা তেল বিক্রি বন্ধ করতে পারত। কিন্তু আন্তর্জাতিক এ সব সংস্থার ওপর আমেরিকার প্রভাব থাকায় দায়েশ সন্ত্রাসীরা অবাধে ইরাক ও সিরিয়া থেকে তেল লুট কোরে তা বাজারে বিক্রি করতে পেরেছে। বর্তমানে দায়েশ সন্ত্রাসীরা ইরাক ও সিরিয়া যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার এখন হঠাত করে তাদেরকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তরের ঘটনা থেকে বোঝা যায় আমেরিকার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। সারা বিশ্বে উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিস্তার ঘটিয়ে আমেরিকা আসলে তার অস্ত্র ব্যবসা জমজমাট করে তোলার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলো আমেরিকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে ওই দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে এবং এর সঙ্গে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিও জড়িত। কিন্তু ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সন্ত্রাসীদের মোকাবেলার ক্ষেত্রে এ দেশগুলোর প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে এবং এ অঞ্চলের বাইরের কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীলতার প্রয়োজন পড়ে না। এ ছাড়া, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত ও গণতান্ত্রিক দেশ ইন্দোনেশিয়ায় উগ্র সন্ত্রাসীদের প্রভাব বিস্তারের খুব একটা সুযোগ নেই।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দায়েশ সন্ত্রাসীদের স্থানান্তরের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রকাশিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবিরোধী কমিটির প্রতিবেদন কয়েকটি দিক থেকে মূল্যায়ন করা যায়। প্রথমত, এ ধরণের প্রতিবেদন প্রকাশের একটি খারাপ দিক হচ্ছে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করবে এবং এ অজুহাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা বিস্তারের সুযোগ এনে দেবে। দ্বিতীয়ত, পাশ্চাত্যের সংবাদ ও রাজনৈতিক মহল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দায়েশের বিপদকে অনেক বড় করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অথচ ইরাক ও সিরিয়ায় দায়েশ সন্ত্রাসীরা পরাজিত হওয়ার পর বিশ্বের অন্যান্য স্থানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর মতো ক্ষমতা তাদের এখন আর নেই। এ অবস্থায় সন্ত্রাসীরা যাতে কোথাও সংঘবদ্ধ হতে না পারে সেজন্য সব দেশের উচিত একে অপরকে সহযোগিতা করা। এতে করে পাশ্চাত্যের সুযোগসন্ধানী মহল সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে তেমন কিছু অর্জন করতে পারবে না। তৃতীয়ত, পাশ্চাত্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সন্ত্রাসীদের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি বড় করে তুলে ধরে প্রমাণ করতে চায় সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ওই অঞ্চল সন্ত্রাসবাদের কবলে পড়তে যাচ্ছে। আর এ অজুহাতে ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে আমেরিকার।
যাইহোক, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের সুযোগ আমেরিকা নেবে। তবে ওই অঞ্চলে দায়েশ সন্ত্রাসীদের স্থানান্তরের ব্যাপারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাস বিরোধী কমিটির হুঁশিয়ারি ও উদ্বেগ ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে আরো সতর্ক হতে সহায়তা করবে। এ অবস্থায় জাতিসংঘসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সংস্থা সন্ত্রাসীদের স্থানান্তররোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আন্তর্জাতিক সমাজ আশা করছে।#