‘হরিপুরে বাস করতে হলে ভোট নৌকাতেই দিতে হবে’
ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হত্যা, সংঘর্ষ, ভাংচুর ও হাঙ্গামা অব্যাহত
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তর ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) চলমান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হত্যা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ভাংচুর ও হাঙ্গামা অব্যাহত রয়েছে।
চলতি নির্বাচনে বিরোধীদল বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় মাঠে রয়ে গেছে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া বিদ্রোহীপ্রার্থীরা। আর এ নিয়ে মূলত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ এখন তুঙ্গে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও হাঙ্গামা, ভাংচুর, রক্তাক্ত সংঘাত এমনকি খুনোখুনির মত ঘটনা ঘটছে।
পর্যবেক্ষকগণ বলছেন, টানা দীর্ঘদিন সরকার থাকার কারণে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সরকারি সুযোগ সুবিধাভোগের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিরোধী রাজনৈতিক দল অনুপস্থিত থাকায় আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী এবং দলীয় মার্কাবঞ্চিত স্বতন্ত্র ('বিদ্রোহী' আওয়ামী লীগ) প্রার্থীদের মধ্যেই মূলত ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতও নিজেদের দলের মধ্যে ঘটছে। বিদ্রোহে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরিস্থিতির তেমন কিছু উন্নতি হচ্ছে না।
ভোলায় নির্বাচনী হাঙ্গামা: আহত ৫০
গতকাল (বুধবার) রাতে ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুই ইউপি সদস্য প্রার্থী সিরাজ গোলদার ও নুরুল ইসলামের সমর্থকদের মধ্যে তিন ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় স্থানীয় বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও দোকানপাটে ভাঙচুর চালানো হয়।
খবর পেয়ে প্রথমে ভেলুমিয়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ এলেও তারা পরিস্থিতি সামলাতে পারেনি। পরে ভোলা পুলিশ লাইন ও ভোলা সদর থানা থেকে দুই দফায় পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহত ব্যক্তিদের ভোলা সদর হাসপাতাল ও স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনার পর ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আজ সকাল ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন ছিল।
মঠবাড়িয়া যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে জখম
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গতরাতে আলগী বাজারে বিপ্লব ব্যাপারী (৪০) নামের এক যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। গুরুতর জখম বিপ্লবকে রাতেই বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বিপ্লব ধানীসাফা ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হারুন অর রশিদের সমর্থক। অভিযোগ উঠেছে, স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী রফিকুল ইসলামের লোকজন বিপ্লবকে কুপিয়ে জখম করে বাঁ হাতের কবজির অনেকাংশ কেটে দিয়েছেন। তাঁর মাথা, পিঠ ও দুই হাতে ধারালো অস্ত্রের জখম রয়েছে।
আগামী ৫ জানুয়ারি মঠবাড়িয়া উপজেলার ধানীসাফাসহ চারটি ইউপিতে ভোট হবে।
নোয়াখালী আন্ডারচর ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা
নোয়াখালী সদর উপজেলার আন্ডারচর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আলী হায়দার বকশির কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বুধবার রাত আটটার দিকে ইউনিয়নের শান্তিরহাট বাজারে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলা ঘটনায় আলী হায়দার বকশির ছেলে ইব্রাহিম বকশিসহ তাঁর ১০ সমর্থক আহত হয়েছেন। আলী হায়দার বকশির দাবি, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আবদুর রবের নেতৃত্বে তাঁর কর্মী-সমর্থকেরা এ হামলা চালিয়েছেন। এদিকে হামলার সময় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করেছে।
‘হরিপুরে বাস করতে হলে ভোট নৌকাতেই দিতে হবে’
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মিলন মণ্ডল নির্বাচনী প্রচারনায় ঘোষণা দিয়েছেন, “ভোট নৌকা বাদে কোথাও যাবে না, হরিপুরে বাস করতে হলে ভোট নৌকাতেই দিতে হবে।’
মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে এক পথসভায় আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী এম সম্পা মাহমুদের পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে এসব কথা বলেন মিলন মণ্ডল। মিলন মণ্ডল বলেন, ‘হরিপুরবাসীকে বলতে চাই, ৫ তারিখে ভোট শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার শেষ হবে না। আমরা কিন্তু প্রত্যেকটি মানুষকে চিহ্নিত করব, কারা কারা নৌকার বিপক্ষে ভোট করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারা নৌকার বাইরে আগ বাড়িয়ে কোনোরকম রং কিংবা সিঁদুর নিতে যাবেন না। আপনাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না। আপনাদের বিপদে কেউ পাশে দাঁড়াতে পারবে না। তাই হরিপুরে বাস করতে হলে নৌকায় ভোট দিতে হবে।’
মিলন মণ্ডলের এমন বক্তব্যে ভোটারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তার এ বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে মিলন মণ্ডল বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের নেতা। নৌকা প্রার্থীর পক্ষে বক্তব্য রেখেছি। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের উদ্দেশে এমন কথা বলেছি।’
আগামী ৫ জানুয়ারি হরিপুরসহ সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ হবে।
কুড়িগ্রামে আওয়ামী লীগের ১০ নেতাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে চতুর্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে কাজ করায় উপজেলা আওয়ামী লীগের ১০ নেতাকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।
বহিষ্কৃতরা হলেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শাহজাহান আলী বাদশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেলওয়ার হোসেন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সরকার মনোয়ার পাশা, মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা মনোয়ারা সরকার, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বকসি, সহ-দপ্তর সম্পাদক হরিপদ সরকার, শিক্ষা ও মানবসম্পদ সম্পাদক মিজানুর রহমান, বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মাসুদ পারভেজ সরকার রানা, সদস্য কার্তিক চন্দ্র সরকার ও কানাই চন্দ্র সেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নুরুল হুদা দুলাল জানান, কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশনা ও গঠনতন্ত্রের ৪৭ ধারা মোতাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল বুধবার বিকেলে ওই নেতাদের অব্যাহতিপত্র পাঠানো হয়েছে।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।