রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে মিয়ানমারকে চাপ দিন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শেখ হাসিনা
https://parstoday.ir/bn/news/bangladesh-i45101-রোহিঙ্গা_অনুপ্রবেশ_বন্ধে_মিয়ানমারকে_চাপ_দিন_যুক্তরাষ্ট্রের_প্রতি_শেখ_হাসিনা
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ বন্ধে মিয়ানমারকে চাপ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
(last modified 2026-04-22T13:03:13+00:00 )
আগস্ট ৩০, ২০১৭ ১৬:৩০ Asia/Dhaka

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ বন্ধে মিয়ানমারকে চাপ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিস ওয়েলস বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেখা করতে এলে তিনি এ আহ্বান জানান। পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাক্ষাতের বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

ইহসানুল করিম বলেন, “এই সঙ্কট নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে কিনা- সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে’।”

বৈঠকে সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করেছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কোনো দেশেই সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বান্দরবানে একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির

গত ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইনে একসঙ্গে ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার পর রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ওই রাতের পর থেকে এ পর্যন্ত শতাধিক নিহতের খবর পাওয়া গেছে; যাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন।

আরও সহিংসতার আশঙ্কায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদী ও স্থল সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ অংশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীদের গুলি করার ঘটনাও ঘটেছে।

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়ে কয়েক দশকে ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে। দীর্ঘদিন সেনা শাসিত মিয়ানমারের বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিক মানতে নারাজ।

গত বছর রাখাইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর  রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ পানে ছুটে। তখনও সীমান্ত বন্ধ রাখলেও মানবিক কারণে অর্ধ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ঢুকতে দেওয়া হয়।

এর আগে  মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গণভবনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও রিয়াল অ্যাডমিরাল খোরশেদ আলমের সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।

এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ দেখাতে নির্দেশ দিয়েছেন।

মিয়ানমার সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবেতর জীবনের নানান তথ্য ও ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে, যা মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করেছে।

বিষয়টি মুসলিম সম্প্রদায়কে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে এবং এ নিয়ে মুসলমানদের ভেতরে সেন্টিমেন্ট গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারক শেখ হাসিনা।

এছাড়া বিষয়টি নিয়ে বিএনপিও রাজনীতি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তাই কাউকে এসব সুযোগ দিতে চান না প্রধানমন্ত্রী।

বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করতে সীমান্ত এলাকার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরার ব্যাপারে উদ্যোগী হতেও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের প্রতি বিধি-নিষেধ শিথিল করার নির্দেশ

এদিকে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বিধি-নিষেধ শিথিল করতে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সতর্ক থাকারও কথা বলা হয়েছে বিজিবিকে। বিশেষ করে, টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়িতে রোহিঙ্গাদের আপাতত জায়গা করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

গণভবনের ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের ব্যাপারেও জোর দেওয়া হয়েছে। দেশটির সঙ্গে সহযোগিতামুলক  আলোচনা চালাতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।

এখন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত- এ প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড: আকমল হোসেন রেডিও তেহরানকে বলেন, নিজ দেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে যারা বাংলাদেশে আশ্রয়লাভের জন্য ছুটে আসছে তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করা দরকার। আর এ বিষয়ে কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট দেবার পর যেহেতু একটি বিশ্ব জনমত তৈরি হয়েছে তাই এ রিপোর্টের সুপারিশ নিয়ে সংকট সমাধানের পথে বাংলাদেশকে জোর কুটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

মিয়ানমার দূতাবাসে এইচআরপিবি'র স্মারকলিপি 

এদিকে, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে এবং বাংলাদেশ থেকে তাদের ফেরত নেওয়ার দাবিতে ঢাকায় মিয়ানমার দূতাবাসে স্মারকলিপি দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। বুধবার সংগঠনটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের নেতৃত্বে মিয়ানমার দূতাবাসে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

রোহিঙ্গা শিশুর সঙ্গে কথা বলছেন ইউএনএইচসিআর'র কর্মী

রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে জাতিসংঘের আহ্বান

ওদিকে, রাখাইনের বিপর্যস্ত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সব ধরনের সহযোগিতায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।

বিবৃতিতে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যে ত্রানকর্মীদের প্রবেশ কড়াকাড়িভাবে বন্ধ রেখেছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এ মুহূর্তে সেখানকানে গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জন্য জরুরি চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এজন্য জাতিসংঘের ত্রাণকর্মীদের সেখানে প্রবেশ ও নিরাপদে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে ইউএনএইচসিআর। একইসঙ্গে রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

মঙ্গলবার জেনেভায় প্রকাশিক এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান ইউএনএইচসিআর এর মুখপাত্র আদ্রিয়ান এডওয়ার্ডস।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট ভোররাতে রাখাইনের তিনটি জনপদে সীমান্তরক্ষী পুলিশের দুই ডজন চেকপোস্টে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কথিত হামলাকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান তীব্রতর করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ওই হামলার পর এ পর্যন্ত কয়েকশ মানুষ নিহত হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করেছে।

জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে দেশটির উত্তর-পূর্ব রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিগতভাবে নির্মূল করতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের গ্রামে আগুন দিয়ে বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়াসহ গণহত্যা ও গণধর্ষণ চালায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা। 

সহিংসতার শিকার হয়ে গত বছরের অক্টোবর থেকে এক পর্যন্ত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। #

পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/৩০