'রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারকে দ্বৈতনীতি পরিহার করতে হবে'
https://parstoday.ir/bn/news/bangladesh-i45277-'রোহিঙ্গা_ইস্যুতে_বাংলাদেশ_সরকারকে_দ্বৈতনীতি_পরিহার_করতে_হবে'
সামরিক বাহিনীর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের দিকে ছুটছেন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিমরা। সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কোস্টগার্ডের নজর এড়িয়ে ঢুকে পড়ছেন তারা। আবার কেউ ঢোকার অপেক্ষায় সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছেন।
(last modified 2026-04-22T13:03:13+00:00 )
সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৭ ১৬:০৬ Asia/Dhaka

সামরিক বাহিনীর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের দিকে ছুটছেন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিমরা। সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কোস্টগার্ডের নজর এড়িয়ে ঢুকে পড়ছেন তারা। আবার কেউ ঢোকার অপেক্ষায় সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছেন।

আর যারা বাংলাদেশে ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়ছেন, তাদের চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে আবারও মিয়ানমারে ফেরত পাঠাচ্ছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড। এতে আবারও ঝুকিতে পড়েছেন রোহিঙ্গারা।

সবশেষ কক্সবাজারে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে আরও তিন হাজার ২৩১ জন রোহিঙ্গা মুসলিমকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি ও কোস্টগার্ড। এরমধ্যে আজ (মঙ্গলবার) সকালে টেকনাফ পয়েন্ট দিয়ে দুই হাজার ৬৭৮ জনকে ফেরত পাঠায় বিজিবি। আর সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপ থেকে ৫৫৩ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠায় কোস্টগার্ড। এ সময় রোহিঙ্গা পরিবহনে ব্যবহৃত দুটি নৌকাও জব্দ করা হয়।

ঢাকায় নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার নতুন রাষ্ট্রদূত রিনা প্রীতিশমিরসি সোমরেনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন

'মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ'  

এদিকে, মিয়ানমারে সহিংসতা ও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধে মিয়ানমার চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ (সকালে) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ইন্দোনেশিয়ার নতুন রাষ্ট্রদূত রিনা প্রীতিশমিরসি সোমরেনো’র সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এ আহবান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দেশের জন্য বড় বোঝা। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক

'রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ করা উচিত'

আর রোহিঙ্গাদের ওপর যে অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতন হচ্ছে, তা বন্ধে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ করা উচিত বলে মনে করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর ও নৃশংস নির্যাতন হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এর প্রতিবাদে আমরা আন্তর্জাতিক মহলকে এগিয়ে আসার আহবান জানাই।

'সরকারের নমনীয় নীতির কারণ মিয়ানমারের সাহস বেড়েছে'

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সিআর আবরার বলেন, সরকারকে দ্বৈত নীতি পরিহার করতে হবে। ঠিক করতে হবে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমার সরকারের ভূমিকাকে আন্তর্জাতিক মহলে নিয়ে যাবে; নাকি উদ্বেগ জানানোর নমনীয় নীতিতে বহাল থাকবে। সরকারের নমনীয় নীতির কারণ মিয়ানমারের সাহস বেড়েছে। ফলে তারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার নীতি নিয়েছে। এ অবস্থায়, কঠিন হলেও মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক মহলের বিচারের কাঠগড়ায় নিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে আশ্রয় প্রার্থী রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিতে হবে।

৩০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আটকা পড়েছে

এদিকে, বাংলাদেশে ঢুকতে না পেরে পালিয়ে আসা প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আটকা পড়েছে। খাদ্য, পানি, বাসস্থান ও চিকিৎসার অভাবে এসব মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ তথ্য জানিয়েছে আমেরিকার গণমাধ্যম সিএনএন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উগ্র বৌদ্ধদের দমন-পীড়ন ও ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে চলতি মাসের প্রথম চার দিনে (১-৪ সেপ্টেম্বর) এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। চার দিনে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ৩৩টির বেশি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে তারা পালিয়ে আসে। এর আগের ৮ দিনে এসেছে আরও ৬০ হাজার।

ভূমধ্যসাগরে ভাসমান ৪০ হাজার অভিবাসী

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশ থেকে পালিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার অভিবাসীর জীবন রক্ষাকারী সংগঠন দ্য মাইগ্রেন্ট অফশোর এইড স্টেশন (মোয়াস) এবার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের বাঁচাতে এগিয়ে আসছে। দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টা থেকে মোয়াসের জলযান ফিনিক্স মিয়ানমারের জলসীমার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে জাহাজটির বঙ্গোপসাগরে নোঙর করার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকায় ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী

এদিকে, রোহিঙ্গা সমস্যাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা করতে ঢাকায় এসেছেন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো এলপি মারসুদি। আর রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে আসছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসগলু। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিপীড়নের প্রতিবাদে মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে মালদ্বীপ। সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংসতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া পর্যন্ত এ অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে দেশটি। গতকাল (সোমবার) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মালদ্বীপ ইনডিপেনডেন্ট এ কথা জানায়।

গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায়, দমন অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। অভিযান নিরস্ত্র রোহিঙ্গা মুসলিম নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে তারা। প্রাণভয়ে পালিয়ে আসার রোহিঙ্গাদের দাবি, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গ্রামের পর গ্রামে হামলা নির্যাতন চালাচ্ছে। গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করছে। এ পর্যন্ত ৪শ বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে।

এর আগে, জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে দেশটির রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। আর ২০১২ সালের জুনেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আক্রান্ত মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।#

পার্সটুডে/শামস মণ্ডল/আশরাফুর রহমান/৫