রোহিঙ্গা পরিস্থিতি বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয় হয়ে উঠবে: জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকালে টেকনাফ সীমান্ত থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শিশুসহ চার রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছেন স্থানীয়রা।
গুলিবিদ্ধরা হলেন- আব্দুল করিম, ইমান শরিফ, আমেনা খাতুন, মো. সোহেল (৫)। গুলিবিদ্ধরা মিয়ানমারের তুবাপাড়া এলাকার বাসিন্দা বলে জানান তারা।
শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তাদের উদ্ধারের পর টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।শনিবার সকালে টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শুভন দাস সাংবাদিকদের বলেছেন, চারজনেরই হাত, পা ও বুকে গুলির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
গুলিবিদ্ধ ইমান শরিফ সাংবাদিকদের বলেছেন ১০ দিন আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি দল তাদের গ্রামে হামলা চালায় এবং ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। জীবন বাঁচাতে ঘর থেকে বের হয়ে পালানোর চেষ্টাকালে তাদের লক্ষ্য করে সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করে। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা ১০-১২ জন গুলিবিদ্ধ হন। তারপর থেকে তারা পাহাড়ে, বনে-জঙ্গলে থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে আসছিলেন। অবশেষে শুক্রবার রাতে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেন।
ওদিকে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন যতো বাড়ছে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ততোই দীর্ঘ হচ্ছে পালিয়ে আসা গুলিবিদ্ধ ও আগুনে ঝলসানো রোহিঙ্গাদের সংখ্যা। এ পর্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি হয়েছে শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ ৭০ জনের বেশি আহত রোহিঙ্গা।
হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন করে অগ্নিদগ্ধ ও গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গাদের ভিড় বাড়ছে। হাসপাতালের বেডে ঠাই না হওয়ায় গুরুতর আহতদের অনেককে মেঝে, সিঁড়ি কিংবা বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
ওদিকে মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ইয়াংহি লি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সহিংসতায় রাখাইনে সম্ভবত এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংখ্যাই বেশি। রাখাইন প্রদেশে যা ঘটছে, তা সাম্প্রতিক বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয় হয়ে উঠবে বলে তিনি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।
চলতি বছর আগস্ট মাসে আরাকান রাজ্যে একাধিক থানায় রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা হামলার পর পরিচালিত সেনা অভিযানে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক।
মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তাদের দেশের নাগরিক বলে মনে করে না। তাদের দাবি রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক; অবৈধভাবে মিয়ানমারে প্রবেশ করেছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া তথ্য মতে, রোহিঙ্গারা বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে পালিয়ে আসছেন বাংলাদেশের দিকে। অনেকে দিনের পর দিন অভুক্ত অবস্থায় দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে নদী ও সমুদ্র পথ নৌকাযোগে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে অহরহই ঘটছে নৌকাডুবির ঘটনা। দুর্ঘটনার পর ভেসে উঠা লাশের সংখ্যা পাওয়া গেলেও নিখোঁজের সংখ্যা অজানাই থেকে যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে এমন দুর্ঘটনায় কক্সবাজারে অন্তত ৯৩ জন রোহিঙ্গার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে, সেনাবাহিনীর হামলা-নির্যাতন-ধর্ষণের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের তালিকা তৈরি করবে বাংলাদেশ। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যারা এসেছে সবাইকে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত করা হবে। তাদের ছবি, আঙ্গুলের ছাপ নেওয়া হবে।
জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে গতকাল সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র দুনিয়া আসলাম খান জানিয়েছেন, কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে আগে থেকে ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাস করছিল। দুই সপ্তাহে সেখানে আশ্রিতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে শিবিরগুলোয় তিল ধারণের ঠাঁই নেই।#
পার্সটুডে/আব্দুর রহমান খান/মো. রেজওয়ান হোসেন/৯