রোহিঙ্গা সংকট: ভারতের ভূমিকা ও বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণ ও মিয়ানমারের সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির উসকানি রোধে সামরিক পদক্ষেপ নয়, কূটনৈতিক তৎপরতায় বিশ্বাসী বাংলাদেশ সরকার।
আজ (সোমবার) তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের সমস্যাটি জাতিগত। কোনো ধর্মীয় সমস্যা নয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে ফেরত পাঠানো এবং মর্যাদার সঙ্গে তাদের দেশে পুনর্বাসনেই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান।
মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তিন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো নিয়ে সরকার কাজ করছে। এগুলোর মধ্যে কিছু তাৎক্ষণিক, কিছু স্বল্প ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে জনমত তৈরিতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে তখন বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত প্রতিবেশী দেশ ভারতের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা বিরোধী মিয়ানমার সরকারের প্রতি সমর্থনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল তার সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন, বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমারকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তিনি ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, মিয়ানমারের নিন্দা জানানোর মাধ্যমে ভণ্ডদের দলে যেন যোগ না দেয় ভারত।
এক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দেখা উচিত নয় বলেও তিনি মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ যদি ভারতের কাছ থেকে এ ব্যাপারে বেশি কিছু আশা করে, তাহলে ভুল করবে। ঢাকাকে বুঝতে হবে, দিল্লির পক্ষে এর বেশি কিছু করা সম্ভব নয়।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শহিদুজ্জামান রেডিও তেহরানকে বলেন, মিয়ানমারের সাথে ভারতের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা এবং বাংলাদেশের সাথে চীনের সামরিক সম্পর্কের বিষয় বিবেচনা করে ভারত এমনটি করবে- এটাই স্বাভাবিক।
অপরদিকে, মিয়ানমার থেকে প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নেয়া ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে বহিষ্কারের বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া একটি আবেদনের শুনানি শুরু হয়েছে।
সোমবারে এ শুনানিতে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে একটি হলফনামা জমা দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভারতের নিরাপত্তার জন্য 'বিপজ্জনক' আখ্যা দিয়ে তাদের প্রত্যর্পণের পক্ষে সরকারে বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে হলফনামায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করে, "রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সম্পৃক্ততা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। ওই তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনগুলো ও আইএসের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যোগাযোগ রয়েছে।"
হলফনামায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, "রোহিঙ্গারা শুধু দেশের নিরাপত্তা নয়, এই বহিষ্কারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতিও জড়িত। তাই সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।"

ওদিকে, মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপের পাশাপাশি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
এইচআরডব্লিউর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে চলমান সেনা অভিযান বন্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের ওপর অবরোধ আরোপ করা এবং তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা দেওয়া।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বিশ্ব নেতারা নিউইয়র্কে সমবেত হচ্ছেন— উল্লেখ করে বিবৃতিতে মিয়ানমারের সংকটকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেখানে চলমান সহিংসতা ও মানবিক সহায়তা ঢুকতে না দেওয়ার নিন্দা জানাতে বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১৮