বাংলাদেশে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন না করার চিন্তা-ভাবনা শুরু
বাংলাদেশে নির্বাচন একটি একদলীয় কর্মকাণ্ডে পর্যবসিত হওয়ার কারণে নির্বাচনের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে গণ অনাগ্রহ সৃষ্টি এবং স্থানীয়পর্যায়ে দলীয় কোন্দল খুন-খারাবিতে পরিণত হবার ফলে এবার খোদ ক্ষমতাসীনরাই দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন না করে আগের মতে উন্মুক্ত প্রার্থীতা বহাল করার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে।
সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন উন্মুক্তভাবে হওয়ার বিধান বাতিল করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য ২০১৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন-সংক্রান্ত পাঁচটি আইন সংশোধন করা হয়।
দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের শুরুটা হয়েছে সিটি, পৌর করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়রদের নির্বাচন দিয়ে। সর্বশেষ এটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রয়োগ করা হয়।
তবে এবার উপজেলা পর্যায়ে এ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে গিয়ে ক্ষমতাসীনরা দু’ধরনের সমস্যার মূখে পড়ে। একটি হচ্ছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন পুরোপুরি বয়কট করার কারণে ভেটাররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। অপরদিকে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ করে একজনকে মনোয়ন দেবার ফলে আওয়ামী লীগের মধ্যেই একাধিক প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে যায়। এ নিয়ে দলের নেতা, এমপি এবং মন্ত্রীরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় প্রার্থী সমর্থনের ক্ষেত্র ঐক্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে অনেক স্থানেই দলীয় প্রতীক নিয়ে সরকারী প্রর্থী পরাজিত হয়।
এদিকে, গত মাসে গণভবনে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে উপজেলায় দলীয় প্রার্থীদের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী ও দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ক্ষোভের সাথেই বলেছেন, “যাদের নৌকার প্রার্থী পছন্দ হয়নি এবং যারা বিরোধিতা করেছেন তারা নিজেরা আর ভবিষ্যতে নৌকার প্রার্থী হতে পারবেন না।“
তিনি বারবার নেতাদের মনে করিয়ে দেন, তৃণমূলই আওয়ামী লীগের মূল শক্তি, তাই তৃণমূলকে শক্তিশালী রাখতে হবে, তৃণমূলে কোনও বিভেদ সহ্য করা হবে না, যারা বিভেদ সৃষ্টি করবেন, তাদের কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রতীক রাখা হবে কিনা, এ নিয়ে ২৯ মার্চ দলের সভাপতিমন্ডলীর সভায়ও আলোচনা ওঠে। বৈঠকে প্রাথমিক আলোচনায় দলীয় প্রতীক থাকা না থাকার বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নেতারা তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন। তবে, ৫ এপ্রিল দলের পরবর্তী কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক রেডিও তেহরানকে বলেন, এ ব্যাপারে দলের নেতাদের মধ্যে অলোচনা আছে, তবে কার্যনির্বাহী কমিটির গত সভায় এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয় নি।
যারা দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার পক্ষে দলের নেতাদের যুক্তি হচ্ছে, যদি প্রতীক বাদ দেওয়া যায় তবে তৃণমূলে কোন্দল কমবে। পাশাপাশি এ নির্বাচনে মনোনয়ন ইস্যুতে আর্থিক লেনদেন হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে আসবে।
আর যারা দলীয় প্রতীক থাকার পক্ষে তাদের যুক্তি হচ্ছে, দলীয় প্রতীক থাকার ইস্যুটা গত টার্মে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পাস করছে। এখন তা বাদ দিলে স্ববিরোধী হয়ে যাবে এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
এ প্রসঙ্গে বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন রেডিও তেহরানকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার যখন দলীয় প্রথীকে স্থানীয় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয় তখনো এটা করা হয়েছিল স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কর্তত্ব দৃঢ়মূল করা। সেদিনও যেমন জনগণের কথা ভেবে বা গণতন্ত্রের স্বার্থে এটা করা হয়নি এবারও তেমনি জনগণ বা গণতন্ত্রের জন্য নয়; দলের আভ্যন্তরীণ কোন্দল ধামাচাপা দিতে পূর্বের ন্যায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার কথা বলা হচ্ছে।
তবে, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন উন্মুক্ত রাখার ব্যাপারে সরকারের চিন্তা-ভাবনাকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার রেডিও তেহরানকে বলেন, স্থানীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে, তাদের মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং স্থানীয় সরকারের ওপর সংসদ সদস্যদের খবরদারির বন্ধ করতে হবে।
জানা গেছে, এর আগে গত উপজেলা নির্বাচনেও দলীয় প্রতীক না দেওয়ার পক্ষে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ বেশ কজন প্রেসিডিয়াম সদস্য অবস্থান নেন। কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় শেষ পর্যন্ত তা করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর নিজ জেলা গোপালগঞ্জে উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক রাখা হয় নি।
এ পর্যায়ে আইনগুলো পুনরায় সংশোধন করে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে সংশোধনের পর দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি কার্যকর করা যাবে।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/৮