বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি সম্পাদক ও বিশ্লেষক আবদুল বারি আতওয়ানের বিশ্লেষণ:
'ইরানের শহীদ নেতার শোক অনুষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় পরাজয়'
-
ইরানের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনেয়ী (র)
পার্সটুডে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইহুদিবাদী ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী ইসলামী উম্মাহর নেতাকে শহীদ করে এই ধারণা করেছিল যে, এর মাধ্যমে তারা ইরানের ইসলামী সমাজকে বিভক্ত করে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের ফল হয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো।
আরব বিশ্বের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল বারি আতওয়ান এক নিবন্ধে লিখেছেন, শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী (র)-এর শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড়, দীর্ঘতম ও সবচেয়ে সুশৃঙ্খল শোকযাত্রার সবচেয়ে হতাশ, ক্ষুব্ধ, অসহায় এবং পরাজিত দর্শক ছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
আতওয়ান লিখেছেন, নেতানিয়াহুর ব্যর্থতার মূল কারণ হলো, যে হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি গর্ব করেছিলেন, সেটির ফলাফল সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হচ্ছে—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী যুদ্ধের পর ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও সুসংহত হয়ে বেরিয়ে এসেছে এবং দেশটি তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, পারমাণবিক কর্মসূচি ও পারমাণবিক মজুদ অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি মনে করেন, শোকযাত্রায় শতাধিক বিদেশি প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ এবং কয়েক কোটি ইরানির উপস্থিতিও নেতানিয়াহুর আরেকটি বড় পরাজয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধারণা করেছিল, এদের বড় একটি অংশ ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সরকার উৎখাতের প্রচেষ্টায় তাদের পক্ষে থাকবে।
শহীদ নেতার বিদায় অনুষ্ঠানে জেনারেল আহমাদ ভাহিদির উপস্থিতির বার্তা
আতওয়ান প্রথম দিনের বিদায় অনুষ্ঠানে ইরানের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের খোলা আকাশের নিচে, যুদ্ধ-বিমানশূন্য পরিবেশে উপস্থিত থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এসবই প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর বিভিন্ন দাবি ছিল মিথ্যা। তিনি উল্লেখ করেন, ওই অনুষ্ঠানে আহমাদ ভাহিদি, যিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একজন শীর্ষ কমান্ডার, শোকযাত্রার অগ্রভাগে উপস্থিত ছিলেন।
আতওয়ান বলেন, আহমাদ ভাহিদির এই প্রকাশ্য উপস্থিতি ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্রের একটি সচেতন ও পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বহুবার বলেছেন যে তারা কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করেন না এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের এই অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করেছে। এ বিষয়ে ইরানের হাতে দীর্ঘ বাস্তব প্রমাণ রয়েছে।
তিনি আরও লিখেছেন, যদি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র এই শোকযাত্রায় হামলা চালাত, তবে তার রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য তাদের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ হতো। এমন পদক্ষেপ বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারত, যার শেষ কোথায় গিয়ে থামবে তা কেউই বলতে পারত না।
কেন ইসরায়েল এখন সংযত?
আতওয়ান লিখেছেন, যে ইসরায়েলি সন্ত্রাসী সরকার আরব ও মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হত্যা করাকে দীর্ঘদিন ধরে নীতি হিসেবে অনুসরণ করেছে—শহীদ আয়াতুল্লাহ ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী, তাঁর জ্ঞাতী-গোষ্ঠীগত আত্মীয় সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ, ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসি এবং বহু ইরানি, লেবাননি ও ফিলিস্তিনি সামরিক কমান্ডারকে হত্যার মতো কর্মকাণ্ডে যার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে—সেই সরকার রাতারাতি শান্ত ও অনুগত সত্তায় পরিণত হতে পারে না।
তবে তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো আজকের ইসরায়েল আর আগের ইসরায়েল নয়। আজকের ইসরায়েল ভীত ও পরাজিত। ইরানের দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে তাদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। তাদের শেষ পদক্ষেপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাশক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনা, যাতে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি।
আতওয়ান বলেন, যে ইসরায়েল একসময় সহজেই লেবাননে অনুপ্রবেশ করত এবং শত শত যুদ্ধবিমান নিয়ে সরাসরি ইরানে হামলা চালাত, আজ তারা বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সাহস পায় না। কারণ তারা জানে, এর জবাবে তেল আবিব, হাইফা ও দিমোনাকে লক্ষ্য করে শত শত নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ও অত্যাধুনিক ড্রোন নিক্ষেপ করা হবে।
শহীদ ইমাম পশ্চিম এশিয়ার শক্তির সমীকরণ বদলে দিয়েছেন
আতওয়ান বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় যে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং যার ফলে শক্তির ভারসাম্যে বড় রদবদল এসেছে, তার পেছনে দুজন শহীদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রথমজন হলেন শহীদ ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী। ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি ও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বকে একত্রিত করেছিল। তাঁর নেতৃত্বে ইরান পারমাণবিক প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে এবং ৪৬০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদসহ একটি পারমাণবিক সক্ষম রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
আতওয়ানের মতে, শহীদ নেতা ইরানকে শত শত আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে সজ্জিত একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র-শক্তিতে পরিণত করেন। তিনি ফিলিস্তিনের মুক্তির প্রশ্নে সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থকদের একজন ছিলেন, প্রতিরোধ আন্দোলন ও তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছেন এবং প্রতিরোধের বিভিন্ন ফ্রন্টের ঐক্যে বিশ্বাস করতেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই ইসলামী বিশ্বের সবচেয়ে বড় হুমকি এবং তাদের পরাজিত করতেই হবে।
দ্বিতীয় শহীদ হলেন ইয়াহইয়া সিনওয়ার, যিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ‘আল-আকসা তুফান’ অভিযানের পরিকল্পনা, নকশা ও বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দেন। আতওয়ান লিখেছেন, সিনওয়ার ও তাঁর সঙ্গীরা ইসরায়েলি বসতি ও শহরগুলোর নিরাপত্তার ভাবমূর্তি ভেঙে দেন এবং অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ঘটান।
আতওয়ান বলেন, এই দুই ব্যক্তির মধ্যে তুলনা করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বরং তিনি বলতে চান, তাঁরা একই আদর্শিক ও প্রতিরোধমুখী ধারার সন্তান—যে ধারা মর্যাদা, স্বাধীনতা ও বিজয়ের পথকে ধারণ করে।
নিবন্ধের শেষে তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছে, যা প্রথম অধ্যায়ের তুলনায় আরও গভীর ও ব্যাপক। এর মধ্য দিয়েই পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার ভূরাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের একটি মৌলিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি উপসংহারে লেখেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি কয়েক মাস আগে তথাকথিত ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, এই পরিবর্তনের প্রথম শিকার হবেন। বর্তমানে তিনি সম্মানজনকভাবে পিছু হটার পথ খুঁজছেন। তবে আতওয়ানের মতে, শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিণতি হবে কারাগার—যদি তিনি ততদিন বেঁচে থাকেন। #
পার্স টুডে/এমএএইচ/০৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।