ইরানের বিরুদ্ধে বয়ানের যুদ্ধ: একটি সংগঠিত মিডিয়া অপারেশনের নেপথ্য কাহিনি
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i156506-ইরানের_বিরুদ্ধে_বয়ানের_যুদ্ধ_একটি_সংগঠিত_মিডিয়া_অপারেশনের_নেপথ্য_কাহিনি
পার্সটুডে: ইরানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বয়ান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর ওপর ইসরায়েলি লবিগুলোর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করে এই চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো।
(last modified 2026-01-29T10:39:51+00:00 )
জানুয়ারি ২৮, ২০২৬ ১১:১০ Asia/Dhaka
  •  ইরানের বিরুদ্ধে বয়ানের যুদ্ধ: একটি সংগঠিত মিডিয়া অপারেশনের নেপথ্য কাহিনি

পার্সটুডে: ইরানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক বয়ান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর ওপর ইসরায়েলি লবিগুলোর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করে এই চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো।

মিডিয়া মনিটরিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পশ্চিমা মিডিয়ার ওপর “নজিরবিহীন ও সংগঠিত চাপ” সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে তারা ইরান সংক্রান্ত দুটি নির্দিষ্ট সংবাদ-ধারা অনুসরণ করে। প্রথমত, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ চলাকালে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অনুপ্রবেশকারী উপাদানের বিরুদ্ধে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপকে সাধারণ জনগণের ওপর দমন-পীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করা। দ্বিতীয়ত, ওই ঘটনাগুলোর হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় বহুগুণ বাড়িয়ে, ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী আকারে প্রচার করা।

পর্যবেক্ষকদের দাবি, কিছু পশ্চিমা ও হিব্রু ভাষার মিডিয়া প্রতিষ্ঠান সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় ১০ থেকে ১৩ গুণ পর্যন্ত বেশি হতাহতের সংখ্যা প্রচার করেছে। এসব সংখ্যা এমন সময় প্রকাশ করা হয়েছে, যখন সংশ্লিষ্ট অনেক গণমাধ্যমই স্বীকার করেছে যে, ইরানের ভেতরে ইন্টারনেট সীমিত বা বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের সরাসরি মাঠপর্যায়ের তথ্যপ্রাপ্তি সম্ভব ছিল না।

মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে, এই বয়ান নির্মাণ কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চালানো সামরিক অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকা ইসরায়েল, ইরানকে কেন্দ্র করে নেতিবাচক বয়ান জোরদার করে সেই চাপ লাঘবের চেষ্টা করছে। উদ্দেশ্য একটাই- আন্তর্জাতিক জনমতের দৃষ্টি গাজা থেকে সরিয়ে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া।

এদিকে ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ভেতরে একটি "বিস্তৃত নগর যুদ্ধ” পরিস্থিতি তৈরির জটিল পরিকল্পনা করেছিল। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ঢুকিয়ে দেওয়া এই পরিকল্পনারই অংশ ছিল, যার লক্ষ্য ছিল পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়া।

ইরানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় মোট ৩,১১৭ জন নিহত হয়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছেন ২,৪২৭ জন সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৬৯০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি, যাদের ইরান “সন্ত্রাসী” হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, নিহতের সংখ্যা নিয়ে পশ্চিমা ও ইসরায়েলি মিডিয়াগুলো যখন প্রতিদিন নতুন ও বাড়তি পরিসংখ্যান প্রচার করছিল, তখন একই সঙ্গে তারা স্বীকার করছিল যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের সরাসরি ও নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র নেই। এই বৈপরীত্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে- মাঠপর্যায়ের তথ্য না থাকলে এত নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক সংখ্যা কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছিল?

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানায়, “সত্য ও দায়িত্বশীলতার প্রতি প্রতিশ্রুতি”র কারণে তারা বেসামরিক নাগরিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাকারীদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ থেকে বিরত ছিল।

পশ্চিমা মিডিয়ায় হতাহতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যে। তিনি ইরান প্রসঙ্গে দাবি করেন, “ইরানে দশ হাজার মানুষের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বহু ইউরোপীয় দেশের নীরবতা লজ্জাজনক।” একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা ইসরায়েলকে ‘গণহত্যা’র অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল, তারা এখন কোথায়?

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যই স্পষ্ট করে দেয় যে, গাজায় গণহত্যার অভিযোগ ও ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানি ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পরিসরে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতেই ইরানকে ঘিরে বিকৃত ও অতিরঞ্জিত বয়ান প্রচারের চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের মিডিয়া অভিযানের মাধ্যমে গাজার ঘটনাবলি আড়াল করা সম্ভব হবে না। তাদের মতে, ইসরায়েলি নেতৃত্ব ভালোভাবেই জানে যে, কোনো বয়ান-পরিবর্তনের কৌশলই হোক না কেন, গাজায় সংঘটিত মানবিক বিপর্যয়ের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যাবে না।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৮