এবার যুদ্ধ হলে তা অবশ্যই আঞ্চলিক যুদ্ধ হবে: আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i156634-এবার_যুদ্ধ_হলে_তা_অবশ্যই_আঞ্চলিক_যুদ্ধ_হবে_আয়াতুল্লাহ_খামেনেয়ী
পার্সটুডে- ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী আজ সকালে বলেছেন, "স্পষ্টভাবে বলছি, যদি কোনো যুদ্ধ হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে তা একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ হবে।"
(last modified 2026-02-01T11:59:01+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ০১, ২০২৬ ১৫:২৬ Asia/Dhaka
  • আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী
    আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী

পার্সটুডে- ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী আজ সকালে বলেছেন, "স্পষ্টভাবে বলছি, যদি কোনো যুদ্ধ হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে তা একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ হবে।"

ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের ৪৭তম বার্ষিকী উদ্‌যাপনের সূচনা উপলক্ষে সমাজের বিভিন্ন স্তরের হাজারো মানুষ আজ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন। তেহরানের ইমাম খোমেনী (রহ.) হুসাইনিয়ায় এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, আপনারা মাঝে মাঝে দেখেন, তারা যুদ্ধের কথা বলে—তারা বলে যে, আমরা বিমান নিয়ে আসব, এটা করব, ওটা করব—এগুলো নতুন কিছু নয়। অতীতেও আমেরিকা বহুবার তাদের কথাবার্তায় হুমকি দিয়েছে যে ‘সব বিকল্প টেবিলে আছে’। সব বিকল্প মানে যুদ্ধের অপশনও অন্তর্ভুক্ত। তারা সবসময়ই এ কথা বলত। এখন এই লোকটিও একইভাবে বারবার দাবি করছে—হ্যাঁ, আমরা জাহাজ এনেছি, এটা করেছি, ওটা করেছি ইত্যাদি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন- আমার মতে, এসব কথা বলে ইরানের জনগণকে ভয় দেখানো যাবে না। ইরানের জনগণ এসব কথায় প্রভাবিত হয় না। তারা ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধ থেকে ভয় পায় না। আমরা সূচনাকারী নই। আমরা কারও ওপর জুলুম করতে চাই না। কোনো দেশে হামলা করতে চাই না। কিন্তু যে কেউ লোভ করবে, হামলা করতে চাইবে এবং ক্ষতি করতে চাইবে—তার জবাবে ইরানের জনগণ তাকে শক্ত মুষ্টাঘাত করবে।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী আরও বলেন, ইরানে সাম্প্রতিক নৈরাজ্য ক্যু-এর মতো ছিল। অবশ্য ক্যু দমন করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল ও প্রভাবশালী কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে ফেলা এবং এ কারণেই তারা সামরিক কেন্দ্র, সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও মসজিদে হামলা করেছে।

এই সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের শত্রুতার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আমেরিকা ইরানকে গ্রাস করতে চায়, কিন্তু ইরানের জনগণ ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র তা হতে দিচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে ইরানের জনগণের অপরাধ এটুকুই যে, তারা আমেরিকাকে বলেছে, “আমাদের দেশকে গ্রাস করতে চেয়ে তুমি তুমি মারাত্মক অন্যায় করছো।”

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন- আকৃষ্ট করার মতো নানা বিষয় রয়েছে ইরানে; যেমন তেল ও গ্যাসসহ নানা খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার এবং কৌশলগত ও ভৌগোলিক অবস্থান- আমেরিকার মতো আগ্রাসী ও লোভী শক্তির লালসার কারণ হয়েছে। তিনি বলেন, তারা পাহলভি যুগের মতো আবার ইরানের সম্পদ, তেল, রাজনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে চায়। এটাই তাদের শত্রুতার মূল কারণ; মানবাধিকারের মতো অন্য যেসব কথা তারা বলে সেগুলো ফাঁকা বুলি মাত্র।

ইসলামী বিপ্লবের নেতা জোর দিয়ে বলেন, ইরানের জনগণ আমেরিকার লোভ-লালসার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে, এখনও মোকাবেলা করছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। ইরানিরা আমেরিকাকে নিরাশ করে দেবে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাম্প্রতিক নৈরাজ্যের মার্কিন ও ইসরায়েলি চরিত্র সম্পর্কে বলেন, দাঙ্গাবাজরা মূলত দুই ধরণের “নেতৃত্বদানকারী” ও “পদাতিক শক্তি”। যেসব নেতৃত্বদানকারী ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা স্বীকার করেছে যে, তারা অর্থ নিয়েছিল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো ও তরুণদের সংগঠিত ও উসকে দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। তবে অন্য একটি অংশ ছিল আবেগপ্রবণ তরুণ—যাদের সঙ্গে আমাদের বড় কোনো সমস্যা নেই।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্রের মার্কিন ও ইহুদিবাদী প্রকৃতির স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তিনি (ট্রাম্প) প্রকাশ্যেই সেই দাঙ্গাবাজদের—যাদের তারা ইরানের জনগণ বলে উল্লেখ করছে—বলেছিলেন, “এগিয়ে যাও, আমিও আসছি!” তাদের দৃষ্টিতে কয়েক হাজার দাঙ্গাবাজই ছিল ইরানের জনগণ; কিন্তু ফার্সি ২২ দে (১২ জানুয়ারি) সারাদেশে যে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল, তারা নাকি জনগণ নয়।

ইসলামী বিপ্লবের নেতা বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নতুন চিন্তা ও পথ বিশ্বমোড়লদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়াই তাদের শত্রুতা অব্যাহত রয়েছে। তাই সাম্প্রতিক এই ষড়যন্ত্র যেমন তেহরানে প্রথম ছিল না, তেমনি এটাই শেষ নয়; ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এই শত্রুতা ততদিন চলবে, যতদিন না ইরানের জনগণ স্থিতিশীলতা, দৃঢ়তা ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শত্রুকে হতাশ করব। আর আমরা সেই পর্যায়ে পৌঁছাব।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, দেশের দায়িত্বশীলদের উচিৎ এই দেশের জনগণের গুরুত্ব উপলব্ধি করা। তিনি বলেন, এবারের নৈরাজ্য এমন এক সময়ে ঘটানো হয়েছিল, যখন সরকার ও কর্মকর্তারা দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও প্যাকেজ তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন।

সাম্প্রতিক নৈরাজ্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি দায়েশ বা আইএসের সহিংসতার সঙ্গে সাদৃশ্যের কথা বলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টের প্রথম নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া স্বীকারোক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেন- যেখানে তিনি আইএস সৃষ্টিতে আমেরিকার ভূমিকার কথা বলেছিলেন। খামেনেয়ী বলেন, সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্রেও আমেরিকা এমন এক আইএস সৃষ্টি করেছে, যার কর্মকাণ্ড আগের আইএস'র মতোই। আইএস ধর্মহীনতার অভিযোগে মানুষ হত্যা করত, আর এরা ধর্মপরায়ণতার কারণে মানুষ হত্যা করেছে; তারা নির্মমভাবে মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়েছে ও শিরচ্ছেদ করেছে।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ফার্সি ১২ বাহমানকে এক ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক দিন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ফার্সি ১৩৫৭ সালের (১৯৭৯) ১২ বাহমানে ইমাম খোমেনী (রহ.)-কে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও অভূতপূর্ব অভ্যর্থনার কথা স্মরণ করে বলেন, সব হুমকির মাঝেও ইমাম খোমেনী সাহস ও শক্তি নিয়ে তেহরানে প্রবেশ করেন এবং সেই বিশাল জনসমর্থনকে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে রূপান্তরিত করেন; এমনকি সেদিনই রাজতন্ত্রের পতনের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, একনায়কতান্ত্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থাকে এমন শাসন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা, যেখানে জনগণই মূল চালিকাশক্তি এবং পাহলভি আমলের ধর্মবিরোধী ধারাকে ইসলামী ধারায় রূপ দেওয়াই হলো ইমাম খোমেনী ও জনগণের সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া ব্যবস্থার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি বলেন, সব দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতেন, তবে সরকার পুরোপুরি ধর্মভিত্তিক হতো। তবে সামগ্রিকভাবে আমরা ইসলামী ও ধর্মীয় পথে অগ্রগতি করেছি।

তিনি দেশকে প্রকৃত মালিকদের—অর্থাৎ জনগণের—কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ইরান থেকে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও প্রভাব ছেঁটে ফেলার বিষয়টিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই বৈশিষ্ট্যই আমেরিকাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে এবং সেদিন থেকেই তারা ইরানি জাতি ও ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শত্রুতা শুরু করেছে।

জনগণভিত্তিক শাসনের ব্যাখ্যায় তিনি জাতির মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির কথা তুলে ধরে বলেন, প্রজ্ঞাবান ইমাম খোমেনী জনগণকে তাদের বিশাল সক্ষমতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করেন এবং “আমরা পারি না”- এই মানসিকতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস “আমরা পারি”-তে রূপান্তর করেন।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন, কাজার ও পাহলভি যুগে আত্মসমর্পণ ও নির্ভরশীলতার  নীতি অনুসরণ করার কারণে “মহান ও সমৃদ্ধ সভ্যতা ও উজ্জ্বল সংস্কৃতির অধিকারী' একটি জাতি “অপমানিত ও পশ্চাৎপদ” জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল। সে সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, রাজনীতি, জীবনধারা, আন্তর্জাতিক মর্যাদা, আঞ্চলিক সমীকরণসহ সব ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ইমাম খোমেনী জাতির মধ্যে আত্মবিশ্বাসের চেতনা সঞ্চার করেন এবং পথকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেন।

আরও আসছে...

পার্সটুডে/এসএ/১