রেজা পাহলভি: একজন রাজপুত্রের গল্প যে তার স্বদেশকে পছন্দ করেন না
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i156624-রেজা_পাহলভি_একজন_রাজপুত্রের_গল্প_যে_তার_স্বদেশকে_পছন্দ_করেন_না
পার্সটুডে: ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র রেজা পাহলভি যেকোনো মূল্যে এমনকি দেশের মাটিতে বিদেশি আগ্রাসনে সহযোগিতা করা বা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ড সমর্থন করেও নিজের ব্যর্থ রাজতান্ত্রিক স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তিনি নিজেই জানেন যে, তার বাবা এবং দাদাও বিদেশি শক্তির মদদে ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন; কিন্তু কেউই ইরানের মাটিতে মারা যাননি বা সমাহিত হননি।
(last modified 2026-01-31T14:32:03+00:00 )
জানুয়ারি ৩১, ২০২৬ ২০:১৪ Asia/Dhaka
  • রেজা পাহলভি
    রেজা পাহলভি

পার্সটুডে: ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র রেজা পাহলভি যেকোনো মূল্যে এমনকি দেশের মাটিতে বিদেশি আগ্রাসনে সহযোগিতা করা বা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ড সমর্থন করেও নিজের ব্যর্থ রাজতান্ত্রিক স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তিনি নিজেই জানেন যে, তার বাবা এবং দাদাও বিদেশি শক্তির মদদে ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন; কিন্তু কেউই ইরানের মাটিতে মারা যাননি বা সমাহিত হননি।

সন্ত্রাস ও বিদেশি হস্তক্ষেপের পেছনের হাত
ইরানের সাম্প্রতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক ও পশ্চিমা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল তেহরানের বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ীর একটি পেশাগত দাবির মধ্য দিয়ে, কিন্তু খুব দ্রুতই কিছু গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রবাহ এই ঘটনাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার ও দখল করে নেয়।

সম্প্রতি, দখলদার ইসরায়েলি শাসনের জাতিসংঘে সাবেক প্রতিনিধি গিলাদ এরদান, দেশটির টিভি চ্যানেল ১২–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানে বিক্ষোভ পরিচালনায় মোসাদ ও মার্কিন সিআইএ পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। তিনি আরও একধাপ এগিয়ে 'বিদ্রোহীদের অস্ত্র দেওয়ার' কথাও প্রকাশ করেন।

মার্কিন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল লরেন্স উইলকারসন-ও সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ইসরায়েলি ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকার কথা স্বীকার করেন।
উইলকারসন বলেন: ইরানের বিক্ষোভ ট্রাম্পের মাধ্যমে অর্থায়িত হলেও তা মোসাদ, সিআইএ ও এমআই৬ দ্বারা ছিনতাই করা হয়েছে। পরিকল্পিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ২,৪০০-এর বেশি সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তারক্ষী শহীদ হন।

ইরানের সাম্প্রতিক দাঙ্গায় সবচেয়ে কম বয়সী ৩ শহীদ বাহার, (২) মেলিনা (৩) এবং আনিলা (৮):

এই সন্ত্রাসী ঘটনার বহু দিক বিশ্লেষণযোগ্য হলেও, এই প্রতিবেদনে পার্সটুডে বিশেষভাবে নজর দিয়েছে এই অপরাধের অন্যতম প্রধান নেতা ও পরিকল্পনাকারীর দিকে—

একজন ব্যক্তি, যিনি পশ্চিমা মিডিয়ার প্রাচ্যবাদী চিত্রে দেখানো ইরাক বা সিরিয়ার সালাফি সন্ত্রাসীদের মতো নন। বরং তিনি নিজেকে সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক বলেই তুলে ধরেন, বহু বছর আমেরিকা ও ইউরোপে বসবাস করেছেন।

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, তিনি হয়তো কোনো শত্রু রাষ্ট্রের গুপ্তচর, কিংবা মানসিক বিকারগ্রস্ত কেউ, যে মানুষ হত্যা করে আনন্দ পায়।
কিন্তু বাস্তবে তিনি আর কেউ নন— ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র, তথাকথিত “শাহজাদা রেজা পাহলভি”।

লুটেরা রাজবংশের উত্তরাধিকার
ইরানের সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি, তার ৩৭ বছরের শাসনামলে এবং বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত ধাপে ধাপে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার করেন।

এই অর্থের বড় অংশই ছিল ইরানের জাতীয় তেল বিক্রির আয়, যা শাহের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজা পাহলভির উত্তরাধিকার হয়ে যায়।
নিউইয়র্ক টাইমস ৫ ডিসেম্বর ১৯৭৯ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরানের বিপ্লবী সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা এমন নথি উদ্ধার করেছেন, যাতে দেখা যায়—

“১ বিলিয়ন ডলারের বেশি শনাক্তযোগ্য অর্থ শাহ ও তার পরিবার ইরানের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আত্মসাৎ করেছে।”

ওয়াশিংটন পোস্ট, ৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৯

এই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব আর্থিক অনিয়মের একটি বড় অংশ পাহলভি ফাউন্ডেশন–এর সঙ্গে যুক্ত ছিল, যা বাহ্যিকভাবে একটি দাতব্য সংস্থা হলেও বাস্তবে শাহের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল।
কমপক্ষে ১৮০ মিলিয়ন ডলার অনাদায়ী ঋণ ছিল ব্যাংক-এ-এমরান ইরানের কাছে, যা শতভাগ পাহলভি ফাউন্ডেশনের মালিকানাধীন ছিল।
গবেষকরা আরও বলেন, শাহের অপসারণের আগের এক বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ গোপন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের প্রমাণ নথিভুক্ত হয়েছে।

ওয়েবসাইট CelebrityNetWorth–এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে মৃত্যুকালে মোহাম্মদ রেজা শাহের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা আজকের মূল্যে প্রায় ৭.২ বিলিয়ন ডলার।

টেলিগ্রাফ পত্রিকা ২৬ জানুয়ারি ২০২৬–এর প্রতিবেদনে জানায়, ৬৫ বছর বয়সী রেজা পাহলভি ওয়াশিংটনের ধনী উপশহরে, পোটোম্যাক নদীর কাছে একটি ৭ বেডরুমের বিলাসবহুল বাড়িতে বসবাস করেন।

২০২৩ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, যদি ইরানের সিংহাসনও তাকে দেওয়া হয়, তবুও পরিবার ও বন্ধুদের কারণে তিনি ইরানে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন না— বরং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যাতায়াত করবেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪৭ বছরে বিদেশে বসবাসরত রেজা পাহলভির আয়ের প্রধান উৎস সেই অর্থই, যা তার বাবা ইরান থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই বিপুল উত্তরাধিকার তাকে কখনোই “শাহজাদা হওয়া” ছাড়া অন্য কোনো পেশার কথা ভাবতে দেয়নি।
কিছু সাংবাদিক দাবি করেন, তিনি নাকি রাতে নিজের কল্পিত সেনাবাহিনীর প্যারেড পরিদর্শন করেন।

১৯৬৭ সালে তেহরানে তার বাবার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে রেজা পাহলভি (ডানদিকে উপবিষ্ট)।

চরম বিদ্রূপ হলো— এই অস্বচ্ছ আর্থিক অতীত থাকা সত্ত্বেও, রেজা পাহলভি নিজেকে ইরানের দরিদ্র শ্রেণির সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেন এবং জনগণকে বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও নাশকতায় উৎসাহ দেন। অথচ বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে (পাহলভি শাসনের পতনের এক বছর আগে) ৪৬% ইরানি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত।

অভ্যুত্থান থেকে সামরিক হামলা: পাহলভি ধারার 'গণতন্ত্র'ফেয়ার অবজারভার–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজা পাহলভির দাদা রেজাখান মিরপঞ্জ ১৯২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সহায়তায় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরান আক্রমণ করলে তাকে সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

পোলিশ লেখক রিশার্ড কাপুশিনস্কি তার বই Shah of Shahs–এ লেখেন: ব্রিটিশ সরকার তাকে ক্ষমতা ছাড়তে নির্দেশ দেয় এবং তার ছেলেকে সিংহাসনে বসায়। অর্থাৎ, পাহলভি রাজবংশ শুরু ও শেষ—উভয়ই হয়েছে বিদেশি শক্তির হাত ধরে। মোহাম্মদ রেজা শাহের ক্ষেত্রেও একই চিত্র।
১৯৫৩ সালে সিআইএ ও ব্রিটেনের সহায়তায় মোসাদ্দেক সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান (অপারেশন অ্যাজাক্স) চালানো হয়।
২০১৩ সালে সিআইএ আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভ্যুত্থানে নিজেদের ভূমিকা স্বীকার করে। বারাক ওবামাও ২০০৯ সালে বিষয়টি স্বীকার করেন।

১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের পর সামরিক আদালতে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক

গার্ডিয়ান লিখেছে: “১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান ছিল অগণতান্ত্রিক।” তবুও রেজা পাহলভি কখনোই এই ঘটনার স্পষ্ট নিন্দা করেননি। আজ ৭২ বছর পর, তিনি বুঝেছেন জনগণের সমর্থন নেই। তাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে না গিয়ে আবারও বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরতার পথ বেছে নিয়েছেন।

১৯৭০-এর দশকে পাহলভি রাজবংশের শেষের দিকের একটি বস্তির ছবি।

বিদেশি মদদ ও ভণ্ডামি
রেজা পাহলভির রাজনৈতিক অভিযাত্রায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা স্পষ্ট:
১. তিনি ইসরায়েল সফর করেছেন এবং ইসরায়েলি নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
২. আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক অপারেশনের নাম "লায়ন্স ডন" পাহলভি পতাকাকে ইঙ্গিত করে।
৩. টেলিগ্রাফের তথ্যমতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু রেজা পাহলভির সবচেয়ে বড় সমর্থক। অথচ ইরানি বিরোধী নেতা আলী আফশারীর ভাষায়: "রেজা পাহলভি শুধু নিজের ও তার সমর্থকদের বন্ধুত্বের বার্তা ইসরায়েলে পৌঁছাতে পারেন। তিনি ইরানের জনগণের প্রতিনিধি নন।"

রেজা পাহলভি এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

জনবিচ্ছিন্নতা ও বাস্তবতা
রেজা পাহলভির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তার জনবিচ্ছিন্নতা:
•    তুরস্কের মিডিয়া বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তার ইরানে "কোনো উল্লেখযোগ্য সামাজিক ভিত্তি নেই"।
•    মার্কিন প্রাক্তন কংগ্রেসম্যান ম্যাট গেটস বলেছেন, "তিনি শুধু একজন দুর্নীতিবাজের পুত্র।"
•    টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন বলছে, পশ্চিমা নেতারা তাকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন না।

তুরস্ক সরকারের ঘনিষ্ঠ সংবাদপত্র রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে ইসরায়েল এবং পশ্চিমাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তুলেছে।

দ্বিচারিতা ও নিষ্ঠুরতা
রেজা পাহলভির দ্বিচারিতা উদঘাটনকারী কিছু উদাহরণ:
•    তিনি ইরানের মানুষের "ভালো চান" বলে দাবি করেন, কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করেন যা সাধারণ ইরানিদের ক্ষতিগ্রস্ত করে।
•    বিক্ষোভে নিহতদের ব্যাপারে তার মন্তব্য: "এটি যুদ্ধ এবং যুদ্ধে হতাহত হয়"।
•    তিনি ২০২৫ সালের জুনে ইরানে ইসরায়েলি-মার্কিন হামলা সমর্থন করেছিলেন, যাতে ১,০০০-এর বেশি ইরানি শহীদ হন।

রেজা পাহলভির সমালোচকরা তাকে জনআকাঙ্ক্ষা ও নাগরিক আন্দোলনের দাবিকে সুযোগসন্ধানীভাবে কাজে লাগানো এবং গণআন্দোলন ও প্রতিবাদকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।

উপসংহার: অতীতের ভূত
রেজা পাহলভি তার পূর্বপুরুষদের ভুল পথই অনুসরণ করছেন। বিদেশি শক্তির উপর নির্ভরশীল এই রাজবংশ ইরানের ইতিহাসে একটি কলঙ্কময় অধ্যায়। কিন্তু আজকের ইরানের জনগণ সেই শিক্ষা থেকে বহু দূর এগিয়েছে। তারা জানে যে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র বিদেশি মদদে আসে না, বরং জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীন চেতনার মধ্যেই নিহিত।

পাহলভি রাজবংশ দুইবার বিদেশি সাহায্যে ক্ষমতায় এসে দুইবারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। রেজা পাহলভি যদি তৃতীয়বারের চেষ্টা করেন, তবে তার পরিণতি পূর্বপুরুষদের চেয়েও করুণ হবে—কারণ ইরানের জনগণ আর কখনোই ঔপনিবেশিক মানসিকতার শাসক মেনে নেবে না। একজন মার্কিন কংগ্রেসম্যান মন্তব্য করেন: “সে শুধু এক দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকের ছেলে। ইরান তাকে কখনো গ্রহণ করবে না।”#