কেন ঠিক এখনই এপস্টেইনকে সামনে আনল পশ্চিমা গণমাধ্যম?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i156610-কেন_ঠিক_এখনই_এপস্টেইনকে_সামনে_আনল_পশ্চিমা_গণমাধ্যম
পার্সটুডে: যখন পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ডামাডোল বাজতে শুরু করেছে, তখন হঠাৎ করেই পশ্চিমা গণমাধ্যম জেফ্রি এপস্টেইনকে আবার শিরোনামে ফিরিয়ে এনেছে। এই দিক পরিবর্তন কি কাকতালীয়, নাকি এটি জনমত ভিন্নখাতে নেওয়ার কৌশল?
(last modified 2026-01-31T11:39:52+00:00 )
জানুয়ারি ৩১, ২০২৬ ১৭:৩৫ Asia/Dhaka
  • যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই এপস্টেইন ইস্যু চাঙ্গা
    যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই এপস্টেইন ইস্যু চাঙ্গা

পার্সটুডে: যখন পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ডামাডোল বাজতে শুরু করেছে, তখন হঠাৎ করেই পশ্চিমা গণমাধ্যম জেফ্রি এপস্টেইনকে আবার শিরোনামে ফিরিয়ে এনেছে। এই দিক পরিবর্তন কি কাকতালীয়, নাকি এটি জনমত ভিন্নখাতে নেওয়ার কৌশল?

যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝেই পশ্চিমা মিডিয়ার অর্থপূর্ণ মোড়

গত কয়েক ঘন্টায়, পশ্চিমা মিডিয়ার প্রথম পাতাগুলো হঠাৎ করেই জেফ্রি এপস্টাইন সম্পর্কিত সংবাদে ভরে উঠেছে; অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রকাশ, নথি, ইমেল এবং বর্ণনা যা যেন আর্কাইভ থেকে বের করে আনা হয়েছে।

পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংবাদমুখী মোড় এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন মাত্র কয়েক দিন আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর ভাষায় কার্যত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছিলেন এবং পশ্চিমা মিডিয়া পুরোপুরি 'পশ্চিম এশিয়ায় আসন্ন যুদ্ধ'-এর দৃশ্যপট নিয়ে ব্যস্ত ছিল।

এই পরিবর্তনের আগে, মূলধারার গণমাধ্যমের প্রায় পুরো মনোযোগ ছিল সামরিক হুমকি, আঞ্চলিক তৎপরতা, জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য সংঘাতের ভূরাজনৈতিক প্রভাবের ওপর। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রধান বর্ণনা বদলে যায়: যুদ্ধ চলে যায় পেছনে, আর বছরের পর বছর খোলা-বন্ধ হওয়া একটি পুরোনো মামলা আবার শিরোনামে আসে। মূল প্রশ্ন হলো: ঠিক এখনই কেন?

কাকতালীয় সমাপতন, না কি সংবাদ এজেন্ডার নিয়ন্ত্রণ?

এপস্টেইন মামলার ৩০ লাখেরও বেশি পৃষ্ঠা নথি প্রকাশ- আকারের দিক থেকে নজিরবিহীন। কিন্তু সময়ের দিক থেকে অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। এই নথিগুলো কয়েক সপ্তাহ আগেও বা পরেও প্রকাশ করা যেত। এমন এক মুহূর্ত বেছে নেওয়া, যখন পশ্চিমা জনমত যুদ্ধ-আতঙ্কে চূড়ায়- এটা কেবল কাকতালীয় বলা কঠিন।

মিডিয়া লজিকে, এ ধরনের ফাঁস সাধারণত দুইটি কাজ করে:

১. চমকপ্রদ ও সংবেদনশীল কনটেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগ আকর্ষণ

২. এক সংকট থেকে আরেক সংকটে জনমতের ফোকাস সরিয়ে নেওয়া

এপস্টাইন মামলার উভয় বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। যৌন সহিংসতা, ক্ষমতা, রাজনীতি এবং পরিচিত মুখগুলোর সংমিশ্রণ এটিকে সংবাদচক্রকে গ্রাস করার জন্য একটি আদর্শ বিষয়ে পরিণত করেছে; যে চক্রের একসাথে কয়েকটি বড় সংকট অনুসরণ করার সীমিত ক্ষমতা রয়েছে।

 ট্রাম্প, এপস্টেইন এবং খেলার মাঠ বদল

নতুন মিডিয়া কাভারেজের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ট্রাম্পের নামকে এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত করছে। যদিও বারবার বলা হচ্ছে যে, এসব দাবি প্রমাণিত নয় এবং ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোনো আইনি অভিযোগ নেই।

তবুও মিডিয়া দৃষ্টিকোণ থেকে, এই 'নামগুলোর পাশাপাশি উপস্থিতি' যুদ্ধের বর্ণনাকে কেলেঙ্কারির বর্ণনায় রূপান্তর করার জন্য যথেষ্ট।

এই পরিবেশে ট্রাম্প আর 'যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নেতা' হিসেবে নয়, বরং 'নৈতিক ও আইনি বিতর্কে জড়ানো এক চরিত্র' হিসেবে উপস্থাপিত হন। এই ইমেজ পরিবর্তনের বড় রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে।

মিডিয়া কী সামনে আনে, আর কী আড়ালে রাখে?

এই সাম্প্রতিক মোড় আবারও দেখিয়েছে, পশ্চিমা বড় মিডিয়াগুলো শুধু বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, তারা অগ্রাধিকারের তালিকাও তৈরি করে।

পশ্চিম এশিয়ার সম্ভাব্য যুদ্ধ একটি জটিল, ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। বিপরীতে, এপস্টাইন মামলা এমনকি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই- শিরোনাম, ক্লিক এবং উত্তেজনার জন্য তৈরি খাবার। এর অর্থ অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রকাশের গুরুত্বকে অস্বীকার করা নয়; বরং এই প্রশ্ন তোলা যে কেন জনমতকে হঠাৎ করে এক ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে অন্য এক নৈতিক-অপরাধমূলক সংকটে সরিয়ে নেওয়া উচিত, বিশেষত যখন প্রথম সংকটের কোনো স্পষ্ট উত্তর ছাড়াই। এই প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকটি অনুমান কল্পনা করা যায়:

প্রথম অনুমান: আমেরিকার যুদ্ধবিরোধীরা কি খেলায় নেমেছে?
প্রথম অনুমানগুলোর মধ্যে একটি হলো- আমেরিকার অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধীরা- রাজনৈতিক, গণমাধ্যম বা এমনকি ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ থেকে- ইচ্ছাকৃতভাবে আবার এপস্টাইন মামলাকে প্রাধান্য দিতে সাহায্য করেছে যাতে ট্রাম্পের যুদ্ধের পথে বাধা দেওয়া যায়। এই ধারার জন্য, পশ্চিম এশিয়ায় একটি নতুন যুদ্ধে আমেরিকার প্রবেশ শুধু ব্যয়বহুল এবং ফলহীনই নয়, বরং একটি ব্যর্থ প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি: দীর্ঘস্থায়ী, ক্লান্তিকর এবং পরিষ্কার ফলাফলহীন যুদ্ধ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে, একটি পুরনো নৈতিক কেলেঙ্কারী ফিরিয়ে এনে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ফোকাস ও বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করা যুদ্ধযাত্রাকে ধীর বা থামানোর কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।

প্রশ্ন হলো: এপস্টাইন কি আবার জীবিত করা হয়েছে যাতে ট্রাম্প একটি সামরিক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ এবং ফোকাস হারায়?

দ্বিতীয় অনুমান: যে ফাঁদে ট্রাম্প আটকে গেছেন
দ্বিতীয় অনুমানটি আরও জটিল: ট্রাম্প নিজেই কি অনুভব করছেন যে, তিনি এমন একটি ফাঁদে পড়েছেন যার না পেছনে পথ আছে না সামনে?

একদিকে, যুদ্ধের হুমকি থেকে পশ্চাদপসরণ দুর্বলতা, সন্দেহ বা রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে; বিশেষ করে এমন ব্যক্তির জন্য যার রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষমতার প্রদর্শনের উপর নির্মিত। অন্যদিকে, যুদ্ধের পথ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ একটি ব্যয়বহুল এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি; এমন যুদ্ধ যা তার প্রেসিডেন্সি গ্রাস করতে পারে।

এই অবস্থায়, একটি নৈতিক কেলেঙ্কারী যদি অপ্রমাণিতও হয় তাহলে হুমকি এবং সুযোগ উভয়ই হতে পারে। হুমকি, কারণ এটি রাজনৈতিক মূলধন পুড়িয়ে দেয়; সুযোগ, কারণ এটি খেলার মাঠ বদলে দেয়। ট্রাম্প কি নিজেকে এমন অবস্থায় দেখছেন যেখানে তাকে "নৈতিক কেলেঙ্কারী" এবং "যুদ্ধ-উসকানিদাতা হিসেবে কেলেঙ্কারী" এর মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে?

তৃতীয় অনুমান: সামনে এগোনোর পথ হিসেবে যুদ্ধ?
তৃতীয় অনুমানটি পূর্ববর্তী অনুমানের বিপরীত এবং দুটি বাস্তবতা বিবেচনা করে প্রস্তাবিত; একদিকে এপস্টাইন মামলায় ইসরায়েলি লবির প্রভাব এবং অন্যদিকে অধিকৃত ভূখণ্ডে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ও দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের পরিণতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনা করে, এই অনুমানটি মাথাচাড়া দেয় যে ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং আমেরিকার তার সমর্থকরা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করতে এবং এই আগ্রাসনে ইসরায়েলি দাবি পূরণে ট্রাম্পের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। এই দৃশ্যকল্পে, একটি সম্ভাব্য নৈতিক কেলেঙ্কারির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া ট্রাম্পের গতির পরিধি সীমিত করে এবং তাকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ফেলে দেয় যাতে তিনি সামনে এগোনোর পথ হিসেবে যুদ্ধ শুরু করতে ব্যবহার করেন।

দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পনা?
এই অনুমানগুলোর কোনোটিই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ বা খণ্ডন করা যায় না। কিন্তু সেগুলো প্রস্তাব করার সম্ভাবনাই দেখায় যে, সাম্প্রতিক সংবাদ পরিবর্তন কেবল একটি সাধারণ গণমাধ্যমের ঘটনা নয়। এপস্টাইন মামলা আবার প্রমাণ করেছে যে, আমেরিকার রাজনীতিতে, সংবাদ প্রকাশের সময় কখনও কখনও সংবাদ নিজের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

আগামীকাল যদি আবার যুদ্ধের ঢাক আরও জোরে বাজানো শুরু হয়, তাহলে হয়ত এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হবে যে, এপস্টাইন মামলাটি সত্যিই অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রকাশ ছিল, নাকি একটি বড় সংকট পার হওয়ার জন্য শুধু একটি গণমাধ্যমের মিশন।

আগামীকাল যদি আবার যুদ্ধের ঢাক আরও জোরে বাজানো শুরু হয়, তাহলে কি এপস্টাইন মামলা আবার শীর্ষে থাকবে, নাকি তার সংবাদ মিশন শেষ হয়ে গেছে?#

পার্সটুডে/এমএআর/৩১