মুগ্ধতার গলিতে এক চিরন্তন ভ্রমণ: প্রাচীন আস্তারাবাদ, আজকের গোরগান
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i157362-মুগ্ধতার_গলিতে_এক_চিরন্তন_ভ্রমণ_প্রাচীন_আস্তারাবাদ_আজকের_গোরগান
পার্সটুডে: ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় গোলেস্তান প্রদেশের আধুনিক শহর গোরগানের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে আজও টিকে আছে এক প্রাচীন শহর। ব্যস্ত এই শহরের উন্নয়নের নিচে চাপা পড়ে থাকা এই পুরাতন এলাকাটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে 'আস্তারাবাদ' নামে পরিচিত ছিল। এটি ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নগরকেন্দ্র, যা এখনও তার পুরনো রূপ অনেকটাই ধরে রেখেছে।
(last modified 2026-02-26T12:45:10+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬ ১৭:২৬ Asia/Dhaka
  • মুগ্ধতার গলিতে এক চিরন্তন ভ্রমণ: প্রাচীন আস্তারাবাদ, আজকের গোরগান

পার্সটুডে: ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় গোলেস্তান প্রদেশের আধুনিক শহর গোরগানের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে আজও টিকে আছে এক প্রাচীন শহর। ব্যস্ত এই শহরের উন্নয়নের নিচে চাপা পড়ে থাকা এই পুরাতন এলাকাটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে 'আস্তারাবাদ' নামে পরিচিত ছিল। এটি ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নগরকেন্দ্র, যা এখনও তার পুরনো রূপ অনেকটাই ধরে রেখেছে।

আস্তারাবাদ, যার আধুনিক নাম গোরগান, কোনো স্থবির বা মৃত শহর নয়। এটি কেবল অতীতের জমাটবাঁধা স্মারক নয়; বরং এক ধারাবাহিক বিবর্তনের সাক্ষ্য। এই শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীর, স্তরভিত্তিক সরু গলি, ভেতরমুখী বাড়ি এবং স্বতন্ত্র বায়ু চলাচল ব্যবস্থা (বা'দগীর)— এসব স্থাপত্যরীতি দক্ষিণ-পূর্ব কাস্পিয়ান অঞ্চলে ইসলামী শাসনামলের নগরজীবনের এক চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে সাফাভি ও কাজার রাজাদের শাসনামলে কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষ কীভাবে নিজেদের জীবনযাপনের সাথে শহরকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল, তার প্রমাণ মেলে এখানে। প্রেস টিভির তথ্য অনুযায়ী, আস্তারাবাদের এই স্থাপত্যশৈলী তার ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অবস্থানের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই শহরের অবস্থান ছিল এক বিশেষ ক্রান্তিকালীন অঞ্চলে। একদিকে পশ্চিমের মাজান্দারান প্রদেশের আর্দ্র আবহাওয়া, অন্যদিকে উত্তর-পূর্বের তুর্কমেনিস্তানের শুষ্ক মাঠ। দক্ষিণে ছিল সুউচ্চ আলবুর্জ পর্বতমালা, উত্তরে গোরগান নদী। এই ভৌগোলিক অবস্থান শহরটিকে যেমন নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া দিয়েছিল, তেমনি আক্রমণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছিল। বিভিন্ন শক্তির লোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এই শহর।

আস্তারাবাদ কিন্তু সবসময় এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এর আগে প্রাচীন নগরী গোরগান (জোরজান) ছিল এই অঞ্চলের প্রধান শহর। বর্তমান গোনবাদ-ই-কাবুস শহরের কাছে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরটি মোঙ্গল আক্রমণ এবং দ্বাদশ শতাব্দীর এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। তখনই জনগণ সরে আসে আস্তারাবাদের দিকে। এই শহরের প্রকৃত সমৃদ্ধি শুরু হয় কাজার গোত্রের হাত ধরে। তারা এটিকে নিজেদের পারিবারিক দুর্গ ও ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত করে। পরবর্তীতে কাজার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আগা মোহাম্মদ খান কাজার (১৭৮৯-১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইরান শাসন করেন) এখানেই জন্মগ্রহণ করেন, যা শহরটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

ইতিহাসের নানা অধ্যায়—আরব বিজয়, আল-এ বোয়েহ ও জিয়ারিদের দ্বন্দ্ব, মোঙ্গল তান্ডব, তিমুরীয় চক্রান্ত, সাফাভি-উজবেক যুদ্ধ—সবকিছুর প্রভাব পড়েছে আস্তারাবাদের গায়ে। ধ্বংস আর পুনর্গঠনের প্রতিটি ঘটনা এই শহরের গল্পে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।

শহরটির মূল কাঠামো ছিল খুবই সুপরিকল্পিত। চারপাশে ছিল উঁচু প্রতিরক্ষা দেওয়াল। প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার লম্বা এই দেওয়াল ছিল কাঁচা মাটির ইটের তৈরি, শক্তিশালী করা হয়েছিল বুরুজ দিয়ে। আরও নিরাপত্তার জন্য দেওয়ালের চারধারে ছিল গভীর পরিখা।

আস্তারাবাদের ঘরবাড়ি স্থানীয় জলবায়ুর সঙ্গে চমৎকারভাবে মানিয়ে নেওয়ার উদাহরণ। বাড়িগুলো সাধারণত ভেতরমুখী এবং কেন্দ্রীয় আঙিনাকে ঘিরে নির্মিত— যা আলো, বায়ু চলাচল এবং ব্যক্তিগত খোলা জায়গা নিশ্চিত করত।

বাড়ির মূল অংশগুলো সাধারণত পূর্ব-পশ্চিম বরাবর তৈরি করা হতো। প্রধান ঘরগুলো (যেমন সে দারি, পাঞ্জ দারি) থাকত উত্তর ও দক্ষিণ দিকে মুখ করে, যাতে সকাল-বিকালের রোদ আর শীতল বাতাস সহজেই প্রবেশ করতে পারে।

আস্তারাবাদের ধনী বাড়িগুলোর ছাদে দেখা মিলত আরেকটি চমৎকার বৈশিষ্ট্যের—বাদগির বা বাতাস গ্রহণকারী মিনার। এই টাওয়ারের মতো কাঠামো উঁচু থেকে শীতল বাতাস ধরে এনে ঘরের ভেতরে প্রবাহিত করত। ছাদ ছিল মৃদু ঢালু, মাটি দিয়ে ঢাকা। শক্ত কাঠের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ছাদ দেয়ালের অনেকটাই বাইরে পর্যন্ত প্রসারিত হত, যাতে বৃষ্টির পানি দেওয়াল গায়ে না লাগে। নির্মাণে ব্যবহার করা হত সম্পূর্ণ স্থানীয় উপকরণ—পোড়া ইট, মাটির ইট, আলবুর্জ পর্বতের বন থেকে আনা কাঠ এবং চুন-মাটি।

বাড়ির বাইরের অংশ সাধারণত সরল ও অলংকরণহীন হলেও কোনো কোনোটিতে দেখা যেত আলংকারিক ইটের কাজ বা কোরআনের আয়াত ও কবিতা খোদাই করা প্লাস্টারের ফলক। ভেতরের অংশ ছিল আরও জমকালো। উঁচু ও প্রশস্ত কক্ষ, সূক্ষ্ম কাঠের কাজ করা বারান্দা, দেয়ালে খোপ এবং ধনী বাড়ির গায়ে দেখা যেত চমৎকার প্লাস্টারের কাজ।

আস্তারাবাদের এই পুরাতন অংশ এখন গোরগান শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এটি ইরানের ইতিহাসের এক বিরল নিদর্শন, যেখানে মানুষ আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে বাস করে চলেছে, শহরটি বেঁচে আছে। ইরানের অনেক ঐতিহাসিক নগরকেন্দ্র যেখানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, সেখানে আস্তারাবাদ আজও এক প্রাণবন্ত শহর। তবে এই সজীবতাই আবার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন উন্নয়নের নামে বেপরোয়া নির্মাণ ও সংস্কারের ফলে এই ইতিহাস ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই মূল্যবান ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখে ১৯৩১ সালে খুব প্রথম দিকেই এটিকে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ (নম্বর ৪১) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।