ইরান যুদ্ধ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করল?
পার্সটুডে: যুদ্ধগুলো সবসময় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নির্ধারিত হয় না; অনেক সময় তা নীতিনির্ধারণী চিন্তাকেন্দ্র ও কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণেও প্রকৃত বিজয়ী ও পরাজিতকে স্পষ্ট করে তোলে।
মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি-এর এক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক হল ব্র্যান্ডস সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যা দেখিয়েছে—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিও সীমিত সম্পদ, যুদ্ধ সক্ষমতার অবক্ষয় এবং একাধিক সংকট একসঙ্গে ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই মূল্যায়ন দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোতে আলোচিত উদ্বেগেরই প্রতিফলন। র্যান্ড কর্পোরেশনের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যুগের মতো করে যুক্তরাষ্ট্র আর একসঙ্গে একাধিক প্রধান সামরিক ফ্রন্টে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশ নিতে পারে না। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, পূর্ব এশিয়ায় চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে সমর্থন—এই তিনটি ক্ষেত্র একত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বহুমুখী সম্পৃক্ততা মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনেছে। স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সেন্টার (CSIS)-এর গবেষকদের পূর্ববর্তী সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, সম্ভাব্য তাইওয়ান সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর এবং নির্ভুল গোলাবারুদের ঘাটতির মুখে পড়তে পারে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ সেই উদ্বেগকে তাত্ত্বিক পর্যায় থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় নিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, SM-3 ইন্টারসেপ্টর, THAAD ও প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহার দেখিয়েছে যে সীমিত সামরিক অভিযানও যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রতিরোধ সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় এসেছে “অতিরিক্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্য” বা overextended empire-এর ধারণা, যা ইতিহাসবিদ পল কেনেডি তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Rise and Fall of the Great Powers-এ উল্লেখ করেছিলেন। তার মতে, যে শক্তির বৈদেশিক অঙ্গীকার তার অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, সেই শক্তি ধীরে ধীরে কৌশলগত অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসর হয়। বর্তমান বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের চাপে পড়তে পারে।
সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এলি র্যাটনার বহুবার সতর্ক করেছেন যে একবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে মোকাবিলা করা। তবে বাস্তবতা হলো, পশ্চিম এশিয়ার সংকটগুলো—ইরাক, আফগানিস্তান, গাজা, লোহিত সাগর এবং ইরান ইস্যু—ওয়াশিংটনকে বারবার একই অঞ্চলে ফিরিয়ে আনছে, ফলে “এশিয়ার দিকে কৌশলগত মনোযোগ স্থানান্তর” বা pivot to Asia পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
এদিকে পূর্ব এশিয়ায়ও এই পরিস্থিতি উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু কর্মকর্তা পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থানান্তর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাইওয়ানে প্রশ্ন উঠেছে—একই সময়ে একাধিক সংকট সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কতটা বজায় রাখতে পারবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এর অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ পতন নয়। দেশটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক বাজেট, বিস্তৃত জোট ব্যবস্থা এবং উন্নত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ধরে রেখেছে। কিন্তু আগের মতো একক আধিপত্য আর নেই।
যুদ্ধটি একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের প্রকৃতিও স্পষ্ট করেছে—ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং স্মার্ট অস্ত্র ব্যবহারের ফলে ছোট বা মাঝারি শক্তিও বড় শক্তিগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির একটি প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছে, যেখানে শক্তির পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। এখন ওয়াশিংটনের সামনে মূল প্রশ্ন হলো—একাধিক বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে কোন সংঘাত সত্যিই তাদের জন্য অগ্রাধিকারযোগ্য এবং বিশ্ব নেতৃত্বের খরচ তারা কতটা বহন করতে সক্ষম।
পার্সটুডে/এমবিএ/১৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকু