হরমুজগানের ম্যানগ্রোভ বন: সাগর আর ডাঙার মাঝে এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i157198-হরমুজগানের_ম্যানগ্রোভ_বন_সাগর_আর_ডাঙার_মাঝে_এক_অনন্য_প্রাকৃতিক_সম্পদ
পার্সটুডে: 'হারা বন' নামে পরিচিতি ইরানের হরমুজগান প্রদেশের ম্যানগ্রোভ বন, দেশটির অন্যতম মূল্যবান ও অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। স্থলভাগ ও সমুদ্রের মিলনস্থলে গড়ে ওঠা এই বাস্তুসংস্থান শুধু ইরানেই নয়, গোটা অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(last modified 2026-02-19T14:59:18+00:00 )
ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬ ২০:৩৩ Asia/Dhaka
  • হরমুজগানের ম্যানগ্রোভ বন: সাগর আর ডাঙার মাঝে এক অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ

পার্সটুডে: 'হারা বন' নামে পরিচিতি ইরানের হরমুজগান প্রদেশের ম্যানগ্রোভ বন, দেশটির অন্যতম মূল্যবান ও অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। স্থলভাগ ও সমুদ্রের মিলনস্থলে গড়ে ওঠা এই বাস্তুসংস্থান শুধু ইরানেই নয়, গোটা অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোথায় অবস্থিত এই বন?

এই ম্যানগ্রোভ বনের সবচেয়ে বড় ও ঘন অংশটি কেশম দ্বীপ এবং মূল ভূখণ্ডের মাঝখানে অবস্থিত। এছাড়াও বন্দর-এ-খামির, তিয়াব মোহনা, লাফট এবং মিনাব বদ্বীপের কিছু অংশেও ছোট ছোট ম্যানগ্রোভ বন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মোটামুটি ২০ থেকে ২৫ হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই বন হরমুজগানকে ইরানের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে পরিণত করেছে।

এই বনগুলো টিকে থাকার জন্য কিছু বিশেষ শর্তের প্রয়োজন, যেমন শান্ত পানি, কম ঢেউ, সূক্ষ্ম পলি এবং নিয়মিত জোয়ার-ভাটা। হরমুজগানের উপকূল এই শর্তগুলো পুরোপুরি পূরণ করে বলেই এখানে ম্যানগ্রোভ এত ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পেরেছে।

অ্যাভিসেনিয়া মেরিনা: এক অদ্ভুত গাছের গল্প

এই বনের প্রায় পুরোটাই গঠিত 'অ্যাভিসেনিয়া মেরিনা' নামের একটি বিশেষ প্রজাতির গাছ নিয়ে, যাকে ধূসর ম্যানগ্রোভও বলা হয়। ইরানে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো একমাত্র ম্যানগ্রোভ প্রজাতি এটি। এই গাছের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এটি প্রচণ্ড লবণাক্ততা, ভয়ানক গরম আর অক্সিজেন-স্বল্প কাদামাটিতেও বেঁচে থাকতে পারে, যা পারস্য উপসাগরের পরিবেশের সাথে পুরোপুরি মানানসই।

এই গাছগুলো সাধারণত ৩ থেকে ৬ মিটার উঁচু হয়, তবে সংরক্ষিত কোনো এলাকায় পুরোনো গাছগুলো আরও লম্বা হতে পারে। এদের শিকড় খুবই অদ্ভুত। কাদার ভেতর ছড়িয়ে থাকা সাধারণ শিকড় ছাড়াও এদের আছে বাতাসে শ্বাস নেওয়ার জন্য কিছু উঁচু উঁচু শিকড়, যাকে নিউমাটোফোর বলে। জোয়ার-ভাটার সময় কাদা ডুবে গেলে এই শিকড়গুলো বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে সাহায্য করে। জোয়ার-ভাটা আর লবণাক্ততার কারণে বনের নিচ তলায় আর তেমন গাছপালা জন্মাতে পারে না, কিন্তু সেই জায়গাটা নানা রকম অণুজীব, শৈবাল ও জৈব পদার্থে ভরপুর, যা পুরো বাস্তুসংস্থানের খাদ্যের মূল ভিত্তি।

বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য

'হারা বন' নানা রকম প্রাণীর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। গাছের ডুবো শিকড়গুলো মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকের মতো অসংখ্য জলজ প্রাণীর ডিম পাড়ার জায়গা ও শাবকদের বড় হওয়ার নিরাপদ ক্ষেত্র। অনেক বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছ তাদের জীবনের শুরুর সময়টা এই বনে কাটায়, তাই স্থানীয় মৎস্য শিল্পের জন্যও এই বন অপরিহার্য।

পাখিদের জন্যও এই বন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারা বছর এখানে দেখা মেলে দেশীয় নানা পাখি। আর শীতের সময় যখন পরিযায়ী পাখিরা দলে দলে আসে, তখন তো বন ভরে ওঠে পাখির কলকাকলিতে। ফ্লেমিংগো, বক, সাদা বক, চামচ ঠোঁট, পেলিক্যান, পানকৌড়ি - কত নাম না জানা পাখির সমাগম ঘটে এখানে। আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পরিযাণ পথে এটি তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্রামস্থল ও খাবারের জায়গা।

এছাড়া ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, সাপ-টিকটিকি, পোকামাকড়ও এখানে প্রচুর। ফলে চারপাশের শুকনো মরু এলাকার তুলনায় এই বনের ভেতরে জীববৈচিত্র্য অনেক বেশি।

পরিবেশের বন্ধু ম্যানগ্রোভ

ম্যানগ্রোভ বন পরিবেশের জন্য কতটা উপকারী, তার শেষ নেই।

  • উপকূল রক্ষা: গাছের শিকড়ের জাল ঢেউয়ের ধাক্কা কমিয়ে দেয়। ফলে ভাঙন থেকে উপকূল রক্ষা পায়। ঘূর্ণিঝড়ের সময়ও এই বন প্রাকৃতিক ঢালের মতো কাজ করে বসতিকে রক্ষা করে।
  • পানি পরিশোধন: জোয়ারের পানির সাথে আসা পলি, দূষিত পদার্থ ও অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানগুলো এই শিকড়ের ফাঁদে আটকে যায়। ফলে সমুদ্রের পানি পরিষ্কার থাকে।
  • জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: ম্যানগ্রোভ বন প্রচুর পরিমাণে কার্বন শুষে নেয় এবং নিজের দেহে ও মাটির ভেতরে জমা রাখে। ফলে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শুষ্ক আবহাওয়া আর ভঙ্গুর উপকূল নিয়ে হরমুজগানের মতো জায়গায় এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাটি অমূল্য।

স্থানীয় মানুষের জীবনে ম্যানগ্রোভ

শুধু পরিবেশ নয়, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সাথেও ম্যানগ্রোভ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

  • মাছ ধরা: স্থানীয় জেলেরা তাদের রুজিরুটির জন্য এই বনের ওপর নির্ভরশীল মাছ ও কাঁকড়ার ওপর নির্ভর করে। ম্যানগ্রোভ সুস্থ থাকলেই সমুদ্রে মাছের পরিমাণ বাড়ে, যা জেলেদের জন্য ভালো।
  • পর্যটন: এখন এই বন ঘিরে গড়ে উঠছে প্রাকৃতিক পর্যটন। কেশম দ্বীপের মতো জায়গায় পর্যটকেরা নৌকায় করে বন ভ্রমণ করেন, পাখি দেখেন, ছবি তোলেন। সঠিকভাবে গুছিয়ে নিলে এই পর্যটন যেমন কর্মসংস্থান তৈরি করে, তেমনি বন বাঁচাতেও উৎসাহ জোগায়।

বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি

হারা বনের গুরুত্ব এতটাই যে, ইউনেস্কো এর একটি অংশকে 'জীবমণ্ডল সংরক্ষিত এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বোঝায়, শুধু ইরানের জন্য নয়, গোটা পৃথিবীর জন্যই এটি মূল্যবান একটি সম্পদ। এই মর্যাদা বন সংরক্ষণ, এর ওপর গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।

শেষ কথা

হরমুজগানের ম্যানগ্রোভ বন শুধু সবুজের একটি টুকরো নয়; এটি এক জীবন্ত, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া এক অনন্য বাস্তুভূমি। এটি জীববৈচিত্র্যের ধারক, মাছের ভান্ডার, উপকূলের প্রহরী এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় এক শক্তিশালী মিত্র। এই বনকে বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করা নয়, বরং দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করা।#