‘অসাধারণ ধ্বংসক্ষমতা’সম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন ইরানের প্রতিরক্ষা ত্যাগে অস্বীকৃতির ইঙ্গিত: আইআরজিসি
খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইরানের আক্রমণাত্মক অবস্থান জোরদার
-
ইরানের খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র
পার্স-টুডে: ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর রাজনৈতিক বিষয়ক উপ-প্রধান কমান্ডার বলেছেন, “অসাধারণ ধ্বংসক্ষমতা”সম্পন্ন একটি অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাম্প্রতিক প্রদর্শন ইরানের প্রতিরক্ষামূলক শক্তি ত্যাগ না করার দৃঢ় অবস্থানকে আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি বৃহস্পতিবার লেবাননের আল-মায়াদিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব মন্তব্য করেছেন। তিনি আইআরজিসির নতুন একটি “মিসাইল সিটি” উন্মোচনের সময় প্রদর্শিত খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা উল্লেখ করেন।
আইআরজিসির তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ২,০০০ কিলোমিটার (১,২৪২ মাইল), আঘাতের নির্ভুলতা প্রায় ৩০ মিটার এবং এর হাইপারসনিক গতি ও কৌশলগত গতিশীলতার কারণে এটির লক্ষ্য-ভেদক্ষমতা তথা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। এটি বায়ুমণ্ডলের বাইরে মাক ১৬ তথা শব্দের চেয়ে ১৬ গুণ বেশি গতিতে এবং ভেতরে মাক ৮ তথা শব্দের গতির চেয়ে ৮ গুণ গতিতে চলতে সক্ষম।
জাভানি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিপক্ষদের এই অগ্রগতির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত এবং তিনি উল্লেখ করেন যে খোররামশাহর-৪ ইরানের বৃহত্তর সামরিক সক্ষমতার কেবল একটি অংশমাত্র।“ইরান আলোচনার টেবিলে এসেছে ঠিকই, কিন্তু তার সামরিক শক্তি ত্যাগ করার কোনো ইচ্ছা নেই,” তিনি বলেন। এই মন্তব্য আসল এমন এক সময়ে, যখন ইরানি প্রতিনিধিরা ওমানের রাজধানী মাস্কাটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
‘শক্ত অবস্থান থেকেই ইরানের আলোচনা; অপমানিত অবস্থায় লজ্জার সঙ্গে আলোচনায় ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্র’
জাভানি এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন যে আলোচনায় অংশ নেয়া ইরানের দুর্বলতার পরিচয়। তিনি বলেছেন “আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু অন্য পক্ষ যদি ভুল করে তাহলে আমরা কঠোর জবাব দেব”। তিনি আরও বলেছেন, তেহরানের আলোচক দল শক্ত অবস্থান থেকেই আলোচনায় প্রবেশ করবে। এরি মধ্যে ওমানে ইরানি ও মার্কিন প্রতিনিধির মধ্যে আলোচনা কিছুটা অগ্রগতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র কখনোই “অন্য পক্ষকে বিশ্বাস করেনি” এবং দেশটি তার নেতা ও শীর্ষ কর্তৃপক্ষের চারপাশে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।“আমরা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা অন্য কোনো শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে প্রভাবিত হই না। অপমানিত অবস্থায় আলোচনায় ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্র, অথচ ইরান তার নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনেনি।”
যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করতে এতটা আগ্রহী—যা ইসলামী প্রজাতন্ত্র স্পষ্টভাবে নাকচ করেছে—সে বিষয়ে জাভানি বলেন, ইরানের উচ্চমাত্রার প্রতিরোধক্ষমতাই প্রতিপক্ষদের আলোচনার মাধ্যমে এই প্রতিরক্ষাশক্তি খর্ব করার চেষ্টা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন,“ইরানের প্রতিরক্ষামূলক শক্তি সংরক্ষণ ও আরও জোরদার করতেই হবে,”এবং উল্লেখ করেন, দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়ে সব রাজনৈতিক ধারা একমত।
তিনি আরও বলেন, ইরানি সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো আগ্রাসন প্রতিহত করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।“কোনো বিস্ময়ের সুযোগ থাকবে না। আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করব না। তিনি জোর দেন যে, ইরানি জনগণ আজও ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়।
শত্রুদের প্রতি সতর্কবার্তা: যেকোনো ভুলই হতে পারে শেষ ভুল
তিনি ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার সাম্প্রতিক ঘোষণার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে প্রতিরক্ষামূলক নীতি থেকে আক্রমণাত্মক নীতিতে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। জাভানি সতর্ক করে বলেন,“শত্রু যদি ভুল করে, সেটিই হয়তো এই অঞ্চলে তাদের শেষ ভুল হবে।”
সোমবার এই নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দেন ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দোররহিম মুসাভি। তিনি বলেন, গত জুনে ইসরায়েলি ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া ১২ দিনের যুদ্ধ এবং চলমান মার্কিন-জায়নবাদী ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষিতেই এই রূপান্তর ঘটেছে।
এই কাঠামোর আওতায়, মুসাভি বলেন, ইরানের পদক্ষেপ হবে “দ্রুত, সিদ্ধান্তমূলক এবং যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে।”
আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা সম্পর্কে হুঁশিয়ারি
এই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনী পারস্য উপসাগর ও এর অন্তর্গত হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জাভানি বহিরাগত শক্তিগুলোকে ভুল হিসাব থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। “যদি আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হয়, তার আগুন সবাইকেই গ্রাস করবে।”
তিনি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায় এবং নিজেদের ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পুরোপুরি সক্ষম।
মার্কিন নৌযানের কাছে ইরানি ড্রোন উড়ানোর খবর সম্পর্কে জাভানি বলেন, এসব পদক্ষেপ দেশের নজরদারি কৌশলের অংশ, যার উদ্দেশ্য হলো স্পষ্ট বার্তা দেয়া যে শত্রুর সব গতিবিধিই পর্যবেক্ষণের আওতায় রয়েছে।
নতুন ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহর উদ্বোধন
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ বাহিনী একটি বিশাল নতুন ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহর উদ্বোধন করেছে, যার মাধ্যমে খোররামশাহর-৪ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইরানি বিশেষজ্ঞদের মতে খোররামশাহর-৪, উচ্চমাত্রার যুদ্ধক্ষেত্রে আধিপত্যের জন্য ইরানের নিজস্ব প্রকৌশল দক্ষতার এক উজ্জ্বল প্রদর্শন। ২,০০০ কিলোমিটার পাল্লা এবং ১,৫০০ কিলোগ্রাম ওয়ারহেড বহনক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্র বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ভেদ করার জন্য নকশা করা হয়েছে।
বায়ুমণ্ডলের বাইরে মাক ১৬ এবং পুনঃপ্রবেশের সময় মাক ৮ হাইপারসনিক গতিতে পৌঁছানোর ফলে শত্রুপক্ষের প্রতিক্রিয়ার সময় প্রায় শূন্যে নেমে আসে। এর ম্যানুভারেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল (MaRV) ও মধ্যপথ নির্দেশনা ব্যবস্থা প্রায় ৩০ মিটারের মধ্যে অত্যন্ত নিখুঁত আঘাত নিশ্চিত করে। এর সঙ্গে রয়েছে কম রাডার প্রতিফলন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে উচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা।
দশকের পর দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশীয়ভাবে গড়ে ওঠা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এখন জাতীয় প্রতিরক্ষার একটি মূল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালে উন্মোচিত প্রথম খোররামশাহর থেকে শুরু করে এই চতুর্থ প্রজন্মের সংস্করণ পর্যন্ত—এই অগ্রগতি ধারাবাহিক উদ্ভাবন ও আত্মনির্ভরতার ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
এই অন্তর্ভুক্তির সময়কাল কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন ইরানি আলোচকরা ওমানে পারমাণবিক আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
আইআরজিসির রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি বলেন, খোররামশাহর-৪ ওয়াশিংটনের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে সামরিক শক্তি জাতীয় পরিচয়ের একটি অ-আলোচনাযোগ্য স্তম্ভ।“যুক্তরাষ্ট্র অপমানিত অবস্থায় আলোচনায় ফিরেছে,” বৃহস্পতিবার আল-মায়াদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন আলোচনায় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার পশ্চিমা আগ্রহই এর প্রতিরোধ-ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ।
তিনি সতর্ক করেন, শত্রুর যেকোনো “ভুল” এমন কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়বে, যা এই অঞ্চলে তাদের শেষ পদক্ষেপে পরিণত হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুন মাসের ১২ দিনের যুদ্ধ—যা ইরানের স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবৈধ হামলার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল—চলাকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী পশ্চিমা আকাশ আধিপত্যের মিথ ভেঙে দেয়। এক হাজারের বেশি শহীদের জন্য শোক পালন করলেও, আইআরজিসি হিসেবি পাল্টা আঘাতে ইসরায়েলজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক, গোয়েন্দা ও অবকাঠামোগত স্থাপনায় এবং কাতারের দোহায় অবস্থিত মার্কিন আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়।
ঘন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাঝেও এসব হামলায় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও সরবরাহ কেন্দ্র অচল হয়ে পড়ে, যা বর্তমান সামরিক দর্শন পরিবর্তনের বাস্তব ভিত্তি গড়ে দেয়।
শুক্রবার নিউইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে দাবি করা হয়, ১২ দিনের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বলে উল্লেখ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো ইরান দ্রুত মেরামত করেছে।
নতুন স্থাপনাটি পরিদর্শনের সময় মেজর জেনারেল মুসাভি বলেন, কেবল প্রতিরক্ষার যুগ শেষ হয়ে এখন “সক্রিয় প্রতিরোধ” নীতির যুগ শুরু হয়েছে, যা সব পশ্চিমা সামরিক হিসাবকে অতিক্রম করে।
শত শত মিটার গভীরে কংক্রিট ও শিলার স্তরের নিচে নির্মিত এসব “ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শহর” আগাম হামলার হাত থেকে ইরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখবে। এসব স্থাপনার মাধ্যমে আইআরজিসি স্থায়ী ও অদৃশ্য প্রস্তুতি বজায় রাখতে পারে—যার উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর ওপর নিখুঁত ড্রোন নজরদারির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। #
পার্স টুডে/এমএএইচ/০৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।