মার্কিন আকাশ অভিযান শনাক্ত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে ইরান
শত্রুর ভুল হিসাবের অপেক্ষায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষার বিস্ময়
-
ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
পার্সটুডে: সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পশ্চিমা সূত্র থেকে প্রকাশিত ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা শক্তি সম্পর্কিত দুটি প্রতিবেদন ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচিও মার্কিন কংগ্রেস প্রকাশিত এমন একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, ভবিষ্যতে যেকোনো আগ্রাসীর জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছে।
মার্কিন কংগ্রেসের ওয়েবসাইট সম্প্রতি এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা করেছে এবং প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী ৪২টি আকাশযান (বিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন) ধ্বংস বা ভূপাতিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।
এই প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন স্টেলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ ভূপাতিত হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে। এই যুদ্ধবিমানটি, পাশাপাশি অ্যাওয়াক্স ও কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংস হয়েছে।
কংগ্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলার হুমকি থেকে সরে যাওয়ার পর নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল: “ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিই ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।”
বিলিয়ন ডলারের আকাশযান
আরাকচি তার এক্স অ্যাকাউন্টে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে লিখেছেন:
“ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস পর মার্কিন কংগ্রেস বিলিয়ন ডলার মূল্যের ডজন ডজন বিমান ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে।” পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন: “এখন আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে যে আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীই বিশ্বের প্রথম বাহিনী, যারা অত্যাধুনিক ও বহুল আলোচিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।”
মার্কিন কংগ্রেসের যে প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি আরাকচি দিয়েছেন, সেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর ধ্বংস বা ভূপাতিত আকাশযানের বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যা “সংবাদ প্রতিবেদন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সেন্টকমের বক্তব্যের ভিত্তিতে” প্রস্তুত করা হয়েছে, “এপিক র্যাথ” অভিযানে ৪২টি স্থির-পাখা বা ঘূর্ণন-পাখা আকাশযান (ড্রোনসহ) ভূপাতিত, ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে যে গোপনীয়তা, চলমান সামরিক কার্যক্রম এবং দায় নির্ধারণের মতো নানা কারণে ধ্বংস হওয়া আকাশযানের তালিকা “পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে।”
মার্কিন কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার এক সপ্তাহ আগে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান এড কেস একটি সামরিক সাময়িকীর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বীকার করেছিলেন যে মার্কিন সেনাবাহিনী সম্ভবত ৩৯টি বিমান হারিয়েছে। এছাড়া তিনি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর আরও ১০টি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৭টি KC-135 স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার ধ্বংস
মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানি বাহিনীর গুলিতে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: “ইরানের ভূপৃষ্ঠ থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা ইরানের আকাশসীমায় অভিযানের সময় একটি F-35A বিমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”
কংগ্রেসের প্রতিবেদন আরও কিছু চাঞ্চল্যকর বিষয় তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাতটি কৌশলগত KC-135 জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের ধ্বংস, যা তাদের উৎপাদন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ভূপাতিত বা ধ্বংস হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে:
“চারটি F-15E স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান, একটি F-35A লাইটনিং, একটি A-10 থান্ডারবোল্ট আক্রমণাত্মক বিমান, সাতটি KC-135 জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, একটি E-3 সেন্ট্রি অ্যাওয়াক্স বিমান, দুটি MC-130J Commando II বিশেষ অভিযান বিমান, একটি HH-60W Jolly Green II যুদ্ধকালীন উদ্ধার হেলিকপ্টার, ২৪টি MQ-9 Reaper মাঝারি উচ্চতা ও দীর্ঘ-পাল্লার ড্রোন এবং MQ-4C Triton উচ্চ-উচ্চতায় উড়তে সক্ষম দীর্ঘ-পাল্লার ড্রোন প্যাক—এসবই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন আকাশপথের ক্ষয়ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত।”
মার্কিন আকাশ অভিযান শনাক্ত করার সক্ষমতা
চাঞ্চল্যকর কংগ্রেস রিপোর্টের পাশাপাশি মার্কিন সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমসও সম্প্রতি, ইরানের ওপর ট্রাম্পের হামলার হুমকি থেকে সরে যাওয়ার পর দাবি করেছে যে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা পুনর্গঠন এবং “মার্কিন আকাশ অভিযান শনাক্ত করার সক্ষমতা” অর্জনের বিষয়ে পেন্টাগনের সতর্কতাই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার ঢেউ থামাতে বাধ্য করেছে।
৪০ দিনের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে ইরান মার্কিন কৌশলগত অস্ত্র—যেমন যুদ্ধবিমান ও বিমানবাহী রণতরীর—অপরাজেয়তার মিথ ভেঙে দেয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বহু নতুন নজির স্থাপন করে।
এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতাগুলোই ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পের আশঙ্কার বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও জোরালো করেছে।
ইরানের জাতীয় সংসদ তথা ইসলামী পরামর্শ পরিষদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির সময় ইরানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলেছেন: “জনগণ আশ্বস্ত থাকুন, আমাদের সামরিক বাহিনী যুদ্ধবিরতির সুযোগকে নিজেদের সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করেছে।” #
পার্স টুডে/এমএএইচ/২১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।