চাপ নয়, ভারসাম্যের ভাষায় কথা বলতে চায় ইরান
পার্সটুডে: ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তেহরান শুধু সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলাই করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সমীকরণেও একটি নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তিত বাস্তবতা এখন বিশ্বশক্তিগুলোর ইরান-নীতিকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে।
আধুনিক যুদ্ধের ফলাফল কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না; বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তি ও মানসিক সমীকরণও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু একটি কঠিন সামরিক সংঘাত অতিক্রম করা নয়, বরং নিজেকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা—যে রাষ্ট্র চাপের মুখে ভেঙে পড়ে না, পিছু হটে না এবং নিজের কৌশলগত সক্ষমতার সঙ্গে আপসও করে না।
এ কারণেই পারমাণবিক ইস্যুতে যেকোনো আলোচনার আগে যুদ্ধের একটি আনুষ্ঠানিক ও সুস্পষ্ট সমাপ্তির ওপর তেহরানের জোর দেওয়াকে শুধু কৌশলগত অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারণের বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তেহরান আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তাই প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে, সামরিক চাপ বা হুমকি দিয়ে ইরানের ওপর রাজনৈতিক ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
মাঠের বাস্তবতাও অনেকাংশে সেই দাবিকে শক্তিশালী করেছে। যে সংঘাতের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কাঠামো দুর্বল করা, অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা কিংবা দেশটিকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দেওয়া—তা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। বরং যুদ্ধকালীন সময়ে অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কার্যক্রম সচল রাখা এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে Iran বিশ্বের সামনে ভিন্ন এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “দুর্বল ও বিধ্বস্ত ইরান” সম্পর্কিত যে আখ্যান গড়ে তোলা হয়েছিল,বর্তমান পরিস্থিতি তা অনেকাংশেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এখন তেহরানের মূল চ্যালেঞ্জ কেবল কঠোর সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং সেই শক্তির কার্যকর ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করা।
কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যখনই প্রতিপক্ষ ইরানকে দুর্বল বা ভঙ্গুর মনে করেছে, তখনই চাপ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সংঘাতের সম্ভাবনা বেড়েছে। বিপরীতে, জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের প্রদর্শন সম্ভাব্য সংঘাতের ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেয়। এখানেই কূটনীতি ও বাস্তব ক্ষমতার সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তেহরানের দৃষ্টিতে, আলোচনা তখনই অর্থবহ যখন তা হুমকির অবস্থান থেকে নয়, বরং ভারসাম্য ও পারস্পরিক স্বীকৃতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালীককে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ইরানের অবস্থান ও সিদ্ধান্তের প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সংবেদনশীলতা প্রমাণ করে যে, আঞ্চলিক সমীকরণে তেহরানের ভূমিকাকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়; বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ইরানের গুরুত্বের একটি সুস্পষ্ট স্বীকৃতি।
সবশেষে, আজকের সবচেয়ে বড় লড়াই সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানসিকতা ও কৌশলগত ধারণার ভেতরেই। আর সেই লড়াইয়ে ইরান এমন একটি বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে-যে দেশকে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা হুমকির মাধ্যমে তার কৌশলগত স্বার্থ ও স্বাধীন অবস্থান থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।#
পার্সটুডে/এমবিএ/২১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।