বোরাক: ইরানি সামরিক শক্তির এক বহুমুখী ও দক্ষ সাঁজোয়া যান
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i160366-বোরাক_ইরানি_সামরিক_শক্তির_এক_বহুমুখী_ও_দক্ষ_সাঁজোয়া_যান
পার্সটুডে: সাঁজোয়া যুদ্ধযান বা পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) হলো এক ধরনের কৌশলগত যান, যা যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের নিরাপদ ও দ্রুত স্থানান্তরের জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়।
(last modified 2026-06-15T14:19:47+00:00 )
জুন ১৫, ২০২৬ ২০:১৪ Asia/Dhaka
  • বোরাক সাঁজোয়া যান
    বোরাক সাঁজোয়া যান

পার্সটুডে: সাঁজোয়া যুদ্ধযান বা পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) হলো এক ধরনের কৌশলগত যান, যা যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের নিরাপদ ও দ্রুত স্থানান্তরের জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়।

ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প ৮ বছরের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের (ইরান-ইরাক যুদ্ধ) শেষ দিক থেকে সাঁজোয়া যান তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং বিভিন্ন মডেলের যান ডিজাইন ও উৎপাদন করেছে। ইরানি প্রযুক্তিতে তৈরি এই সাঁজোয়া যানগুলো বিভিন্ন ওজন ও মিশনের উপযোগী। এগুলোতে মাঝারি মানের অস্ত্র যেমন—মেশিনগান, মর্টার এবং অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল যুক্ত করার সুবিধা রয়েছে। ফলে এগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করার মতো সক্ষমতাও রাখে।

এই সাঁজোয়া যানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটির নাম "বোরাক" (Boraq) । এই যানটির নাম রাখা হয়েছে ইসলামের প্রিয় নবী (সা.)-এর পবিত্র বাহনের নামানুসারে; শবে মেরাজের হাদিস অনুযায়ী, মহানবী (সা.) মক্কায় এই "বোরাক" বাহনে আরোহণ করেই মেরাজে গমন করেন এবং মসজিদুল আকসায় পৌঁছান।

সামগ্রিক পর্যালোচনা

"বোরাক" হলো ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের তৈরি একটি উভচর (Amphibious) সাঁজোয়া যান, যা সমপর্যায়ের অন্যান্য সাঁজোয়া যানের তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত। চেইন বা ট্র্যাক-যুক্ত (Tracked) এই যানটির গতিশীলতা অত্যন্ত চমৎকার। এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অসমতল পথ বা যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারে এবং উচ্চ গতিতেও নিখুঁতভাবে দিক পরিবর্তন (Maneuver) করতে সক্ষম।

প্রকৃতপক্ষে, "বোরাক" হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি বিখ্যাত "BMP-1" সাঁজোয়া যানের ইরানি সংস্করণ। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থা এটি চীনের তৈরি "Type 86" ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকেলের (IFV) লাইসেন্সের অধীনে তৈরি করেছে। এটি পার্সোনেল ক্যারিয়ার, ইনফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকল এবং মর্টার ক্যারিয়ারসহ বেশ কয়েকটি মডেলে উৎপাদিত হয়েছে।

চীনের তৈরি "Type 86" (যার রপ্তানি নাম YW-501) হলো মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের "BMP-1" এর একটি হুবহু কপি, যা ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে প্রথম যুক্ত হয়েছিল। ১৯৮৬ সাল থেকে চীন এই যানের উৎপাদন শুরু করে। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালের অর্ডারের ভিত্তিতে ১৯৯৭ সাল থেকে ইরান এর উৎপাদন শুরু করে এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৫০টি বোরাক যান তৈরি করা হয়।

"BMP-1" এর সাথে চীনের "Type 86" এর মূল পার্থক্য হলো—চীনের তৈরি যানটির ওজন কিছুটা কম এবং রাস্তায় এর সর্বোচ্চ গতি বেশি। আর এই "Type 86"-কে ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে ইরানি বোরাক, যার উচ্চতা মূল যানের চেয়ে কিছুটা বেশি এবং এটি মূলত বুরুজ বা টার্রেট (Turret) বিহীন।

"BMP-1" বা "Type 86"-এর সাথে বোরাকের প্রধান পার্থক্য হলো, এর মূল অস্ত্র হিসেবে কামানের পরিবর্তে ভারী 'দুশকা' (DShK) মেশিনগান ব্যবহার করা হয়েছে। এটি এর সরাসরি যুদ্ধক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে দিলেও এটিকে একটি পারফেক্ট সাঁজোয়া যানে (APC) রূপান্তরিত করেছে।

যেখানে BMP-1 এবং Type 86 যানগুলোতে মূল অস্ত্র হিসেবে ৭৩ মিলিমিটারের কামান এবং অ্যান্টি-ট্যাংক অস্ত্র হিসেবে মালিউতকা মিসাইল (Type 86-এ রেড অ্যারো মিসাইল) ব্যবহার করা হয়, সেখানে বোরাকের মূল মডেলে ১২.৭ মিলিমিটারের ভারী দুশকা মেশিনগান যুক্ত থাকে। অবশ্য, বোরাকের একটি বিশেষ মডেলে "BMP-2" এর বুরুজ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ৩০ মিলিমিটার কামানে সজ্জিত। ১৩ টন ওজনের বোরাক যানের বডি ৫ থেকে ১৯ মিলিমিটার পুরু ইস্পাত সংকর (Steel Alloy) দিয়ে তৈরি, যা ১২.৭ মিলিমিটারের বুলেট অনায়াসে প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়া এর ট্র্যাক বা শনিতে থাকা রাবার প্যাডগুলো যানটিকে চমৎকার ট্র্যাকশন বা গ্রিপ প্রদান করে।

বোরাক সাঁজোয়া যানটিতে অন্তত ৪০ কিলোমিটার রেঞ্জের যোগাযোগ ও নেভিগেশন সিস্টেম রয়েছে। এতে জার্মানির তৈরি "BF8L" ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে (যা সম্ভবত চীনের প্রোডাকশন লাইন থেকে সংগৃহীত)। এই ৮-সিলিন্ডারবিশিষ্ট V-শেপ ইঞ্জিনটি এয়ার-কুলড এবং টার্বোচার্জড, যা ৩৩০ হর্সপাওয়ার শক্তি উৎপাদন করতে পারে। এর ফলে বোরাক মসৃণ রাস্তায় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬৫.৫ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। ফুল ট্যাংক জ্বালানি নিয়ে এই যানটি সর্বোচ্চ ৬২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে সক্ষম।

এই সাঁজোয়া যানটিতে মোট ১২ জন আরোহী বসতে পারেন। যার মধ্যে একজন চালক, একজন মেশিনগান অপারেটর (দুশকা পরিচালনাকারী) এবং ১০ জন সৈন্য। বোরাক ০.৭ মিটার উঁচু বাধা এবং ৩০ ডিগ্রি চড়াই ও ২৫ ডিগ্রি পার্শ্ববর্তী ঢালু রাস্তা অনায়াসে অতিক্রম করতে পারে।

এর মূল অস্ত্র দুশকা মেশিনগানের ফায়ারিং রেট প্রতি মিনিটে ৬০০ রাউন্ড। এর বুুরুজটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এবং এটি অনুভূমিকভাবে (Horizontal) পুরো ৩৬০ ডিগ্রি এবং উল্লম্বভাবে (Vertical) ৭৮ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর চোখ ফাঁকি দিতে এই যানে ঘন ধোঁয়া তৈরির সিস্টেমও (Smoke Screening System) রয়েছে।

বোরাক যানের বিভিন্ন মডেল

বোরাক সাঁজোয়া যানটি মূলত পার্সোনেল ক্যারিয়ার, কমান্ড ভেহিকল, অ্যাম্বুলেন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং যান, গোলাবারুদ বাহক, অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল ক্যারিয়ার, মর্টার ক্যারিয়ার এবং গান-কার হিসেবে বিভিন্ন মডেলে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ মিমি কামানযুক্ত মডেল, ২৩ মিমি বিমান-বিধ্বংসী কামান বা অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল যুক্ত করার উপযোগী সাপোর্ট মডেল, ১২০ মিমি মর্টার ক্যারিয়ার, কমান্ড মডেল এবং অ্যাম্বুলেন্স উল্লেখযোগ্য।

কমান্ড বোরাক: এটি যুদ্ধক্ষেত্রে একটি মোবাইল কমান্ড স্টেশন বা চলন্ত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। অন্যান্য মডেলের চেয়ে এর বর্ম বা আর্মার সুরক্ষা বেশি হওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে এবং কমান্ডারদের সুরক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মর্টার বোরাক: এটি ১২০ মিলিমিটারের মর্টার বহন এবং ফায়ার করতে সক্ষম। এটি সব দিকে মোট ৫০টি মর্টার শেল ছুড়তে পারে। এর উচ্চ গতিশীলতা এবং দ্রুত মর্টার ফায়ারিং ক্ষমতা একে অসম যুদ্ধ বা গেরিলা যুদ্ধে (Asymmetric warfare) এক অনন্য কার্যকারিতা দিয়েছে।

তোফান অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইলবাহী বোরাক: এই মডেলটিতে ইরানের তৈরি 'তোফান' অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল যুক্ত করা হয়েছে। উভচর ক্ষমতা ও উচ্চ গতিশীলতার কারণে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী মোবাইল অ্যান্টি-ট্যাংক সাইট হিসেবে কাজ করে।

বিমান-বিধ্বংসী বোরাক (কোবরা): এই মডেলটি 'কোবরা' নামে পরিচিত। এটি একটি ২৩ মিলিমিটারের বিমান-বিধ্বংসী গান দিয়ে সজ্জিত। এটি শত্রুপক্ষের কম উচ্চতায় উড়ন্ত বিমান বা ড্রোনের আক্রমণ থেকে নিজস্ব বাহিনীকে চমৎকার সুরক্ষা দেয়।

অ্যাম্বুলেন্স বোরাক: যুদ্ধক্ষেত্রের ঠিক পেছন থেকে দ্রুত আহত সৈন্যদের উদ্ধার ও স্থানান্তরের জন্য এই সাঁজোয়া অ্যাম্বুলেন্সটি ডিজাইন করা হয়েছে। এটি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র (Ventilator), ইকোকার্ডিওগ্রাম (ECG), অর্থোপেডিক সরঞ্জাম, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং এয়ার কন্ডিশনারের মতো আধুনিক চিকিৎসা সুবিধায় সজ্জিত। এতে আহতদের পরিবহনের জন্য ৪টি বেডের (Stretcher) ব্যবস্থাও রয়েছে।#

পার্সটুডে/এমএআর/১৫