ক্যারাকাল: সীমান্ত সুরক্ষায় ইরানের নতুন প্রজন্মের সাঁজোয়া যান
-
ক্যারাকাল: গতি, সুরক্ষা ও অভিযানে বহুমুখী সাঁজোয়া যান
পার্সটুডে: সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপারেশনে নিয়োজিত সদস্যদের জীবন রক্ষা করা অত্যন্ত প্রাথমিক এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। এই নীতি বাস্তবায়নে প্রতিনিয়ত নানা উদ্ভাবন করা হচ্ছে।
পার্সটুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপারেশনাল বাহিনীর জীবন রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে কোভলারের মতো যৌগিক উপাদানে তৈরি উন্নত হেলমেট, আধুনিক বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং সেনাদের বহনের জন্য ব্যবহৃত সাঁজোয়া যান।
এই ক্ষেত্রে যানগুলোকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) বা সাঁজোয়া যান এবং মাইন ও অ্যামবুশ প্রতিরোধী যান (এমআরএপি)।
সাঁজোয়া যানের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সুরক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই সাঁজোয়া যানগুলো সাধারণত ট্র্যাকড (চেইনযুক্ত) এবং হুইলড (চাকাযুক্ত) এই দুই ভাগে বিভক্ত। সাধারণত এগুলো শুধু মেশিনগানে সজ্জিত থাকে; তবে ক্ষেত্রবিশেষে গাইডেড অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল বা মর্টারও এতে যুক্ত করা হতে পারে।
অন্যদিকে, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের যুদ্ধে ল্যান্ডমাইন এবং রাস্তার ধারের বোমার (আইএডি) ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ' এমআরএপি' নামক এক নতুন ধরনের সাঁজোয়া যান তৈরি করা হয়েছে। এগুলো মূলত মাইন ও অতর্কিত হামলা থেকে সেনাদের রক্ষা করে। এই যানগুলোর সুরক্ষা ক্ষমতা সাধারণ অ্যাসল্ট রাইফেলের বুলেট থেকে শুরু করে শক্তিশালী ল্যান্ডমাইন পর্যন্ত প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
ইরানের পদক্ষেপ
ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প গত চার দশকে, বিশেষ করে ৮ বছরের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর, দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতের প্রয়োজনীয়তা পূরণে বিশাল পরিবর্তন এনেছে এবং দেশকে বিদেশি সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করেছে। দেশের সাঁজোয়া যানের চাহিদা মেটাতে নিজস্ব জ্ঞান ও কার্যকর বিনিয়োগের মাধ্যমে ইরান উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প বিভিন্ন ধরণের সাঁজোয়া যান তৈরি করেছে, যা সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় সেনাদের জীবন সুরক্ষায় এই যানগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
সাঁজোয়া যান ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা
ইরানের কিছু সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং সম্ভাব্য হুমকির কারণে সামরিক ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন স্তরের সুরক্ষামূলক যানের প্রয়োজনীয়তা সব সময়ই ছিল। সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান চক্র থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিস্তৃত হুমকি মোকাবিলায় সাঁজোয়া যানের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।
এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই বিভিন্ন আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের সাঁজোয়া যান ডিজাইন ও তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো সাঁজোয়া যান' ক্যারাকাল'। এই যানটি সীমান্তরক্ষীদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। জানা গেছে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি'র স্থলবাহিনী ইতোমধ্যে এটি ব্যবহার শুরু করেছে এবং পুলিশ বাহিনীও এটি যুক্ত করতে যাচ্ছে।
বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতা
২০১৯ সালের পুলিশ সরঞ্জাম প্রদর্শনীতে (আইপিএএস) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শহীদ কোলাহদুজ ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি এই বুলেটপ্রুফ সাঁজোয়া যান 'ক্যারাকাল'-এর তথ্য প্রথম প্রকাশ করা হয়।
ওজন ও ধারণক্ষমতা: এর ওজন ৫ টন এবং এটি দুই সারিতে মোট ৬ জন আরোহী বহন করতে পারে। এর ওপর ৩০ সেন্টিমিটার উচ্চতার একটি বুর্জ (Turret) বসানোর সুযোগ রয়েছে।
আকার: যানটি ৫৭০ সেমি দীর্ঘ, ২৩০ সেমি চওড়া এবং ছাদ পর্যন্ত ২৪০ সেমি উঁচু (বুর্জসহ ২৭০ সেমি)।
ইঞ্জিন ও গতি: এতে রয়েছে ১৪০ হর্সপাওয়ারের ৪-সিলিন্ডার ওয়াটার-কূলড ইঞ্জিন। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার এবং এটি এক টানা ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। এটি ৬০% উল্লম্ব ঢাল এবং ৩০% অনুভূমিক ঢালে চলতে সক্ষম এবং ৪৩ সেমি উঁচু বাধা পার হতে পারে।
সুরক্ষা স্তর: কারাকালের সুরক্ষা স্তর 'BR6' (যা ৭.৬২ মিমি লেড-কোর বুলেট প্রতিরোধ করতে পারে)। তবে এটি কোনো 'এমআরএপি' নয়, তাই এর নিচের অংশটি ল্যান্ডমাইন বা বিস্ফোরণ প্রতিরোধী নয়। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এর সুরক্ষার স্তর আরও বাড়ানো সম্ভব। মূলত টহল এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ামূলক অভিযানের জন্য এটি বেশি উপযোগী।
অস্ত্র ও অন্যান্য সুবিধা: এর বুর্জে ১২.৭ মিমি মেশিনগানের মতো হালকা ও মাঝারি অস্ত্র বসানো যায় এবং ভেতর থেকে গুলি করার জন্য ৫টি বিশেষ উইন্ডো রয়েছে। এতে চালক ও কমান্ডারের জন্য চারপাশের দৃশ্য দেখার ক্যামেরা, পাংচার-প্রুফ টায়ার এবং উন্নত কুলিং ও হিটিং সিস্টেম রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এটি জার্মানির 'কন্টিনেন্টাল' (Continental) কোম্পানির টায়ার ব্যবহার করে এবং এর নির্মাণশৈলী বেশ উন্নত মানের। ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে ইরানের উত্তর সীমান্তে আইআরজিসির মেকানাইজড ব্রিগেডের মহড়ায় এই 'ক্যারাকাল' সাঁজোয়া যানটির ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/১৮