ইরানের বিপ্লবী ছাত্ররা কেন মার্কিন দূতাবাস দখলে নিয়েছিল?
-
মার্কিন পতাকায় আগুন দিচ্ছে বিক্ষুব্ধ জনতা
ফার্সি ১৩ অবন মোতাবেক ৩ নভেম্বর ইরানে পালিত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় দিবস ও মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া দখলের বার্ষিকী।
১৯৭৯ সালের এ দিনে তেহরানে অবস্থিত তৎকালীন মার্কিন দূতাবাস দখল করে নিয়েছিল ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র। এ দিবসের স্মরণে প্রতি বছরই ফার্সি ১৩ অবন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী দিবস পালিত হয়। এ উপলক্ষে রাজধানী তেহরানসহ সারাদেশে মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন লাখ লাখ ইরানি নাগরিক।
মার্কিন দূতাবাসগুলো যে গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করে গত কয়েক বছরে তা বিশ্বের প্রায় সব দেশের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এমনকি আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোর সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের ফোনে আড়ি পাততেও দ্বিধা করেনি আমেরিকা। এ কারণে ইউরোপীয় দেশগুলোও মার্কিন দূতাবাসগুলোকে গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া হিসেবে অভিহিত করেছে।
১৯৭৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি মরহুম ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয় লাভ করে। এর ফলে ইরানে অবসান হয় আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের। আমেরিকার তাঁবেদার স্বৈর শাসনের পতন হয়। এর ফলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে আমেরিকা।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নবগঠিত বিপ্লবী সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে আমেরিকা ব্যাপক ষড়যন্ত্র শুরু করে। ওই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তেহরানস্থ মার্কিন দূতাবাস নানা পরিকল্পনা হাতে নেয়। তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস থেকে যে ব্যাপক ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হচ্ছে,তা ইরানের বিপ্লবী ছাত্ররা টের পেয়ে যায়। তারা সাহসিকতার সঙ্গে মার্কিন দূতাবাস দখল করে।
মার্কিন দূতাবাস দখলের পর সেখান থেকে ইরান বিরোধী গুপ্তচরবৃত্তির প্রচুর দলিলপত্র উদ্ধার করা হয়। সেসব দলিলপত্র এখনো সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে। দূতাবাস ভবনটি এখনও ইরানে গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া হিসেবে পরিচিত। বিপ্লবী ছাত্রদের সেদিনের ওই পদক্ষেপ ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছিল।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এ ঘটনা সম্পর্কে দেশটির সব পর্যায়ের নেতারাই বারবার বক্তব্য দিয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি এক বক্তব্যে ওই দিনের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছেন, ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তার দেশের ঈমানদার ও সাহসী যুবকরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের মাধ্যমে এটা আবিষ্কার করে যে সেটা আসলে ছিল গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া এবং তারা তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে।
সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেছেন,মার্কিন সরকার সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের হওয়ায় সব দেশের ঘরোয়া বিষয়ে হস্তক্ষেপে বিশ্বাসী, কিন্তু ইরানি জাতি ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে আমেরিকার বলদর্পিতা ও কর্তৃত্বকামিতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং বিপ্লবের বিজয়ের পরও তাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদের শেকড় কেটে দেয়; আর এভাবে তারা অন্য অনেক দেশের বিপরীতে বিপ্লবের কাজকে অর্ধ-সমাপ্ত রাখেনি বলেই ওইসব দেশের বিপ্লবীদের মতো ক্ষতির শিকারও হয়নি।
১৯৭৯ সালের এদিনে মার্কিন দূতাবাস দখলের পর ইরানিরা এর নাম দিয়েছিল গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া। এর কয়েক দশক পরে ইউরোপের মার্কিন দূতাবাসগুলোও গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কয়েক বছর আগে আমেরিকার মিত্র সরকারগুলোও সেসব দেশে মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এডওয়ার্ড স্নোডেনের মতো ব্যক্তিরা আমেরিকার ওই ঘৃণ্য চেহারা সবার সামনে ফাঁস করে দিয়েছে।
কয়েক বছর আগে মার্কিন গুপ্তচরবৃত্তির যেসব ঘটনা ফাঁস হয়েছে, তা থেকে এটা বলা যায়, ইরানিরা এ ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে বহু বছর এগিয়ে রয়েছে। কারণ কয়েক দশক আগেই ইরানের বিপ্লবীরা বুঝতে পেরেছিল, মার্কিন দূতাবাসগুলো কূটনৈতিক তৎপরতার আড়ালে ভয়াবহ গুপ্তচরবৃত্তি চালায়। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন কূটনীতিকরা হচ্ছে গুপ্তচর।
১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর ইরানি ছাত্ররা তেহরানে ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিককে আটক করে। ওই সব ছদ্মবেশী গুপ্তচর ইরানে ৪৪৪ দিন আটক ছিল। মার্কিন সরকার পরে তেহরানের বিপ্লবী সরকারের দেয়া শর্তগুলো মেনে চলার অঙ্গীকারের বিনিময়ে ওই কূটনীতিকদের মুক্ত করে। সমসাময়িক বিশ্বের ইতিহাসে ওই ঘটনা ছিল নজিরবিহীন।#
পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/৩