ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব কী?
আগামী শুক্রবার ইরানের প্রেসিডেন্ট ও সিটি কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরইমধ্যে এখানে নির্বাচনী প্রচার জমে উঠেছে। অনেকেই ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। চলুন দেখা যাক ইরানের সংবিধানে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।
সংবিধানে যে কোনো একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রকাশ পায়। সে কারণে সেই জাতির সামষ্টিক বা অভিন্ন ইচ্ছাই হলো সংবিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানের ১১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে দেশের প্রেসিডেন্টের ওপর। ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা এক আল্লাহর প্রতি, ঐশী ওহীর প্রতি, ন্যায়-ইনসাফ, ইমামত, পরকাল ইত্যাদির প্রতি ইমান এবং মানুষের স্বাধীনতা ও মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামী ইরানের একজন প্রেসিডেন্ট এইসব বিষয়ে যথাযথ দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সংবিধানের ৫৬ নম্বর অনুচ্ছেদে এসেছে, এই দায়িত্ব পালনে মনে রাখতে হবে: মানুষ এবং এই বিশ্বের ওপর সার্বভৌমত্বের অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনিই মানুষকে সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে থাকেন। সুতরাং আল্লাহ প্রদত্ত এই অধিকারকে কোনো ব্যক্তিস্বার্থে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো একটি গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজে লাগানোর কোনো সুযোগ নেই।
তবে ১১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন দেশের জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে। সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিষয়টিও সে রকম। সংবিধানে রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগ-নির্বাহী, সংসদ ও আইন এবং বিচার-এগুলো পৃথক পৃথক হবার ফলে ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের কুক্ষিগত হবার কোনো সুযোগ থাকে না। সুতরাং স্বৈরাচার জন্ম নেবার পথটাও বন্ধ রয়েছে। পক্ষান্তরে এর মধ্য দিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে ক্ষমতার মধ্যে যেমন ভারসাম্য এসেছে তেমনি দুর্নীতির পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
সংবিধানের সাতান্ন নম্বর অনুচ্ছেদে এসেছে এই তিনটি বিভাগ পরস্পর থেকে পৃথকভাবে অর্থাৎ স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে। তবে প্রতিটি বিভাগই থাকবে সর্বোচ্চ নেতার অধীনে। আর সংবিধান অনুযায়ী স্বয়ং প্রেসিডেন্ট সমগ্র জাতির কাছে, সর্বোচ্চ নেতার কাছে এবং সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী একজন প্রেসিডেন্ট চার বছর মেয়াদের জন্যে নির্বাচিত হবেন। পরপর দুই মেয়াদের জন্যে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। অর্থাৎ একটানা দুই মেয়াদ বা আট বছর একজন নির্বাচত প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একটানা দুই মেয়াদের বেশি সময়ের জন্যে এই পদে থাকার অধিকার সংবিধানে নেই। প্রেসিডেন্ট হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পর দেশের সর্বোচ্চ পদ। সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এই পদে আসীন হতে হয়। ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের সকল দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার, সম্মেলনে অংশ নেওয়ার দায়িত্বও তাঁর ওপর ন্যস্ত।
বিভিন্ন বিশ্ব সংস্থায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্ট। একইভাবে বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অতিথিদের বরণ করে নেওয়া বা তাদের মেহমানদারি করার দায়িত্বও তাঁর। বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্র, ইশতেহার বা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করার দায়িত্বও প্রেসিডেন্টের। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়া এবং কূটনৈতিক পরিচয়পত্রে স্বাক্ষর করার দায়িত্বও তাঁর। একইভাবে ভিনদেশী কূটনীতিকদের পরিচয়পত্র গ্রহণ করাও তাঁরই দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বও প্রেসিডেন্টের ওপর। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদসহ উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন পরিষদেরও দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের।
সুতরাং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অভ্যন্তরীণ হোক কিংবা বাইরেরই হোক যে-কোনো হুমকি মোকাবেলার দায়িত্বও প্রেসিডেন্টের। চাই সে হুমকি বস্তুগতই হোক অথবা আধ্যাত্মিক। সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি সর্বপ্রকার হুমকি মোকাবেলায় পদক্ষেপ নেবেন প্রেসিডেন্ট।
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদ আনুষঙ্গিক যেসব পরিষদ গঠন করবে সেগুলোরও প্রধান দায়িত্বে থাকবেন প্রেসিডেন্ট অথবা প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের কোনো একজন সদস্যকে মনোনয়ন দেবেন। যাই হোক, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ১১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজস্ব দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে শপথবাক্য পাঠ করেন। ঐ শপথনামায় সংবিধান প্রদত্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্বগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বগুলো পালন করার জন্যে জনগণের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সেইসাথে রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যান্য অঙ্গ ও বিভাগের সাথেও সমন্বয় প্রয়োজন। রাষ্ট্রের কোনো একটি বিভাগ যদি সমান্তরাল গতিতে না চলে তাহলে এই দায়িত্ব পালন করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সরকার ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব এবং ভূমিকার মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তদারকি করার বিষয়টিও পড়ে।#
পার্সটুডে