বিশ্বের অনন্য এক প্রাকৃতিক নিদর্শন হামেদানের আলীসাদ্‌র গুহা
https://parstoday.ir/bn/news/iran-i63064-বিশ্বের_অনন্য_এক_প্রাকৃতিক_নিদর্শন_হামেদানের_আলীসাদ্_র_গুহা
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ইরানে প্রাকৃতিক অনেক বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনোটি একেবারেই ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রমধর্মী বলার কারণ হলো এ ধরনের নিদর্শন সমগ্র পৃথিবীতে বিরল। এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রাকৃতিক নিদর্শনটি একটা গুহা। এর নাম হলো গারে আলীসাদ্‌র বা আলিসাদ্‌র গুহা৷
(last modified 2026-04-10T03:25:29+00:00 )
মার্চ ১৭, ২০১৯ ২৩:২৮ Asia/Dhaka

ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ইরানে প্রাকৃতিক অনেক বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনোটি একেবারেই ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রমধর্মী বলার কারণ হলো এ ধরনের নিদর্শন সমগ্র পৃথিবীতে বিরল। এই ব্যতিক্রমধর্মী প্রাকৃতিক নিদর্শনটি একটা গুহা। এর নাম হলো গারে আলীসাদ্‌র বা আলিসাদ্‌র গুহা৷

হামেদান শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে একটি পাহাড়ের নীচে এই গুহাটি অবস্থিত। ওই এলাকার স্থানীয় লোকজন গুহাটির নাম দিয়েছে আলীসাদ্‌র। গুহাটির ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য হলো এর ভেতরে অসংখ্য লেক বা নালা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে আছে। লেকগুলো আঁকাবাঁকা। তবে লেকের পানি অসম্ভব স্বচছ। পানির কোনো রং নেই, গন্ধও নেই। স্বচ্ছতার কারণে পাঁচ মিটার গভীর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। পানির স্বাদ সাধারণ মিষ্টি পানির মতোই। এর মধ্যে যে পানি তার গভীরতা হলো আট মিটার বা সাড়ে ছাব্বিশ ফুট। গুহার উচ্চতা প্রায় চল্লিশ মিটার বা এক শ’ বত্রিশ ফুট।

তবে পানির এই গভীরতা সবসময় সমান থাকেনা, মাঝেমধ্যে উঠানামা করে। পঞ্চাশ থেকে এক শ’ সেন্টিমিটার অর্থাৎ বিশ থেকে চল্লিশ ইঞ্চির মতো বাড়ে কমে। সাত কোটি বছরের প্রাচীন এই গুহাটি ১৯৬৩ সালে প্রথমবারের মতো আবিষ্কৃত হয়েছে। হামেদানের পর্বতবাসী বা পর্বতারোহীরা এই রহস্যময় গুহাটি আবিষ্কার করেন। পাহাড়ের নীচের এই জলগুহাটির এ পর্যন্ত চব্বিশ কিলোমিটার আবিষ্কৃত হয়েছে। কৌতূহলী দর্শকরা পায়ে হেঁটে কিংবা নৌকা বেয়ে গুহার ভেতরের এই করিডোর উপভোগ করতে পারেন। তবে খনন কাজ এখনো চলছে।

আলীসাদ্‌র গুহাটি ‘সরি কিয়েহ’ (হলুদ প্রস্তর) পাহাড়ের নীচে অবস্থিত। পাহাড়টি খুব বেশি উঁচু নয়। আলীসাদ্‌র গ্রামের দক্ষিণ অংশে পাহাড়টির অবস্থান। এই পাহাড়ে আরও দুটি গুহা আছে। একটির নাম ‘সারব’ অপরটির নাম ‘সুবাশি’। আলীসাদ্‌র গুহা থেকে সাত এবং এগারো কিলোমিটার দূরে এই গুহাগুলোর অবস্থান। আলীসাদ্‌র গুহাটি সাফাভি শাসনামলে আবিষ্কৃত হয়। ১৯৬২ সালে হামেদানের পর্বতারোহীরা প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থা করে গণমানুষের পরিদর্শনের উপযোগী করে তালে। ধীরে ধীরে এই গুহা ইরানের অন্যতম প্রাকৃতিক ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি আলীসাদ্‌র গুহার ভেতরে খনন কাজ চালিয়ে বেশকিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্রাপ্ত জিনিসপত্র থেকে প্রমাণিত হয় যে সেলজুকি শাসনামলে এই গুহার ভেতর মানুষ বাস করতো। প্রাপ্ত জিনিসপত্রগুলো হলো বড়ো কলস, প্রদীপ জ্বালাবার জন্যে ব্যবহৃত পিলসূজ,এনামেল বাধাতব এবং মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র। ফার্সি ১৩৭৩ সাল অর্থাৎ ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক বিস্ময়কর এই আলীসাদ্‌র গুহার উপর গবেষণা চালাবার জন্যে আসেন। তাদের মধ্যে একজন বিশেষজ্ঞ এই গুহাটির বৈশিষ্ট্যগত স্বাতন্ত্র্যে চমৎকৃত হয়ে বলেছেন- আলীসাদ্‌র গুহাটি বিশ্বের অন্যান্য গুহার তুলনায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এবং নিশ্চিতভাবে এই গুহাটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ পানিগুহা।

আলীসাদ্‌র গুহার ভেতরের অসাধারণ দৃশ্যাবলী, এর ভেতরের চমৎকার আবহাওয়া, সুনসান নীরবতা এতো বেশী চিত্তাকর্ষক যে, যে-কোনো পর্যটককেই আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে হামেদানের এই গুহাটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হাজার হাজার দর্শক প্রতি বছর এই গুহা দর্শনে হামেদান সফরে যান। পরিদর্শনকারীদের একটা বিরাট অংশই বিদেশি। বিশ্বের পর্যটকগণ ধীরে ধীরে অসম্ভব রহস্যময় এই পানিগুহার সাথে পরিচিত হচ্ছে।

যাইহোক, আলীসাদ্‌র গুহাটির ভেতরে আপনি যদি বেড়াতে যান, বিস্মিত হয়ে যাবেন। এতো সুন্দর করে, এতো শৈল্পিকভাবে গুহাটি সুসজ্জিত যে, দেখলেই মনে পড়ে যাবে সেই কবিতাংশটি- কে সে জন যার গড়া এই নিখিল ভুবন ইত্যাদি।

তো এর ভেতরে বেড়াতে গেলে আপনি বোটে যেতে পারেন। প্যাডেল বোট নিজে নিজে চালাতে পারেন, তা না হয় নৌকাচালক আপনাকে নিয়ে যাবে অপার রহস্যময় এই গুহার বিচিত্র কোণে। যেদিকেই তাকাবেন শুধু বিস্ময় আর বিস্ময় আপনাকে কর্মচঞ্চল এই পৃথিবী থেকে নতুন এক পৃথিবীতে নিয়ে যাবে। গুহার মাঝখানে আধা ঘণ্টা নৌকায় বেড়াবার পর আপনি ইচ্ছে করলে নেমে গিয়ে পায়ে হেঁটে উপরের দিকে উঠে যেতে পারেন। আনুমানিক পাঁচ শ' সিঁড়ি উপরে গেলে আপনি ইচ্ছে করলে অন্য রুটে গুহামুখের দিকে ফিরে আসতে পারেন হেঁটে। হেঁটে আসতে গেলে আনুমানিক আধাঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। এসময় আপনার কাছে মনে হবে আপনি যেন পৃথিবীর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। সে এক অভূতপূর্ব অনুভূতি।

স্থানীয় দর্শনার্থী এবং বিদেশী পর্যটকরা এই গুহা পরিদর্শন শুরু করেন ১৯৭৫ সালে। ১৯৯১ সালে আলিসাদ্‌র ট্যুরিজম কোম্পানি পুরো এলাকার উন্নয়নকাজ শুরু করে। বর্তমানে সেখানে হোটেল, অতিথিশালা, কাঠনির্মিত ভিলা এবং তাঁবু গাড়ার মতো প্রশস্ত জায়গা অহরহ এবং সহজলভ্য। এছাড়াও আছে বিনোদনের জন্যে সিনেমা-থিয়েটার ও খেলারমাঠ। খাওয়া-দাওয়ার জন্যে আছে রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থা। সবমিলিয়ে আলীসাদ্‌র গুহা মনোরম একটি অবকাশ যাপন কেন্দ্র হিসেবেও বিখ্যাত। এ ধরনের গুহা পৃথিবীতে খুবই বিরল। আমেরিকায় একটি গুহা আছে কিন্তু তার নীচে পানি নেই। আরেকটি আছে ইন্দোনেশিয়ায়। তবে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পানিগুহা হিসেবে এই আলীসাদ্‌রের খ্যাতি আজও অম্লান।

আলিসাদ্‌র গুহার ভেতরে দেওয়ালের গায়ে রয়েছে পিওর ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের পলেস্তারা। এগুলো চুইয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে। আবার গুহার নীচের ফোয়ারা থেকে পানি আসে। এ দুটোই গুহার ভেতরের পানির প্রধান উৎস। গুহার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বা দৃশ্য অসম্ভব সুন্দর এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কোনো রকমের দূষণ নেই ভেতরে। একেবারে সুনসান নীরবতা ভেতরে। গুহার ভেতরের কোনো কোণে যদি একটি মোম জ্বালানো হয় ওই মোমের শিখা একটুও নড়বে না।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৭