বজ্রপাত শুরু হলে কোথায় আশ্রয় নেবেন, কোথায় নেবেন না
https://parstoday.ir/bn/news/uncategorised-i22480-বজ্রপাত_শুরু_হলে_কোথায়_আশ্রয়_নেবেন_কোথায়_নেবেন_না
বাংলাদেশে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ এবং তার প্রতিকার সম্পর্কে দেশটির আবহাওয়াবিদ তসলিমা ইমাম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। বজ্রপাত হলে কোথায় আশ্রয় নেয়া যাবে আর কোথায় আশ্রয় নেয়া যাবে না, সে বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি।
(last modified 2026-02-17T13:30:44+00:00 )
অক্টোবর ০৯, ২০১৬ ২০:০৫ Asia/Dhaka

বাংলাদেশে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার কারণ এবং তার প্রতিকার সম্পর্কে দেশটির আবহাওয়াবিদ তসলিমা ইমাম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। বজ্রপাত হলে কোথায় আশ্রয় নেয়া যাবে আর কোথায় আশ্রয় নেয়া যাবে না, সে বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি।

রেডিও তেহরান: প্রতিবছর বজ্রপাতে বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ২০০ মানুষ মারা যাচ্ছে। গত সাত বছরে বজ্রপাতে বাংলাদেশে মারা গেছে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ- এমন খবরও রয়েছে। এ বিষয়ে প্রথমেই আমরা জানতে চাইবো যে, কেন এই বজ্রপাত হয়? এটা কী সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল?

তসলিমা ইমাম: বজ্রপাত এটা প্রাকৃতিক একটি বিষয়, এটা সত্যি। তবে আমরা যেটা লক্ষ্য করছি, বর্তমানে বজ্রপাতের সংখ্যা কিন্তু বাড়ছে। বিশেষ করে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কিছু কিছু জায়গায় বজ্রপাত বেশি হয়। সে অবস্থানের মধ্যে বাংলাদেশও কিন্তু একটি। যে কথাটা এখানে বলা প্রয়োজন, বজ্রপাত যে মেঘগুলি থেকে হয়, অর্থাৎ বজ্রবৃস্টির যে মেঘগুলো, সেগুলো এমন এলাকায় বেশি তৈরি হয়, যেখানে সূর্যের তাপ বেশি পড়ে, উত্তপ্ত থাকে, গরম হয় এবং বাতাসে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প থাকে, সেদিক থেকে বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্লোবালই যে তাপমাত্রাটা বাড়ছে আমরা কিন্তু স্ট্যাটিসটিক্যালি অ্যানালাইসিস করে দেখেছি, বাংলাদেশের ভিতরকার উপাত্ত নিয়ে তাপমাত্রা, বাংলাদেশের ভিতরেও কিন্তু গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। এ ট্রেন্ডটা প্রায় ০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মত লাস্ট ৪০ ইয়ার্সে আমরা দেখেছি। আর যেহেতু, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আছে,এখান থেকে দক্ষিণা বাতাসের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ জলীয় বাষ্প চলে আসে। যে কারণে গ্রীষ্মকালে বিশেষ করে মার্চ, এপ্রিল, মে মাসে বাংলাদেশের উপরে প্রচুর বজ্রবৃষ্টির মেঘ তৈরি হয়। আর তা থেকে বজ্রঝড় হয়ে থাকে। এখানে একটি মজার বিষয় বলা যেতে পারে, সেটা হল পৃথিবীতে দিনে প্রায় ৮০ লক্ষ বার বজ্রপাত হয়। এতে মৃত্যুর হার অনেক। আর এ বছর ২০১৬র মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩২ টি জেলাতে ১০৩ জন এ বজ্রপাতের কারণে জীবন হারিয়েছে। একদিনেই মারা গেছে ৭ জন।

রেডিও তেহরান: জি! আজকাল বলা হচ্ছে- বজ্রপাতের মাত্রা আগের চেয়ে এখন অনেক বেড়েছে। কথাটা কি আসলেই সত্য। সত্য হয়ে থাকলে বজ্রপাতের মাত্রা বেড়ে যাবার কী কারণ থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

তসলিমা ইমাম: যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন মানেই হচ্ছে যে, বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যেটা আপনারা বিশ্ব আবহাওয়ার রিপোর্টে দেখেছেন এবং আমরাও আমাদের বাংলাদেশের ভিতরের যে বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা সেটাও আমরা বিগত ৪০-৫০ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছি, সেখানে আমরা দেখেছি গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়ার সাথে বজ্র-বৃষ্টির ঝড়গুলো সৃষ্টি হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে এবং বাড়ার কারণেই এর সংখ্যা বেড়ে গেছে।

রেডিও তেহরান: আজকাল অনেকে বলে থাকেন, মোবাইল প্রযুক্তি ও ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠা করা ম্যাগনেট পিলার তুলে নেয়ার কারণে বজ্রপাতটা বেশি হচ্ছে। আসলে এই বক্তব্যের কি কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে?

তসলিমা ইমাম: মোবাইল ফোন যেহেতু এটা কর্ডলেস ডিভাইস, এটা আমার মনে হয়, না না, মনে হয় বলাটা ঠিক হবে না বরং এটাই ঠিক যে, মোবাইল ফোন বজ্রপাতের জন্য অতোটা ভয়াবহ কিছু নয়। তারচেয়ে বরং আমরা ঘরের ভেতর যে ল্যান্ডফোনগুলো কর্ডসহ ব্যবহার করছি বা ইলেক্ট্রিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছি,যার সাথে পরিবাহীর একটা সম্ভাবনা রয়েছে, তার রয়েছে,সেগুলো দিয়ে বজ্রপাত আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে।

রেডিও তেহরান: প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ মোকাবেলা করার বিশেষ কোনো উপায় আছে বলে মনে করেন কিনা?   

তসলিমা ইমাম: হ্যাঁ, অবশ্যই উপায় আছে। প্রথমত: জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো এ জনসচেতনতা কীসের উপর বৃদ্ধি করব?  এক্ষেত্রে প্রথমত: এখানে  আমাদের করনীয় কিছু বিষয় আছে যেগুলো মেনে চললে খুব সহজেই আমরা আমাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে পারব। যার প্রথমত: আমি কিছু জিনিষ বলতে চাই, যে বজ্রবৃষ্টিতে মেঘগুলি তৈরি হয়, সে মেঘগুলি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়ে।এই ধরেন, আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা, ঝড়-বৃষ্টি দিয়ে বজ্রপাত দিয়ে ২/১ ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এভাবে কোন কালো মেঘ আকাশে দেখা দিলে বা বিদ্যুৎ চমকালে বা বজ্রপাতের গর্জন শোনা গেলে খোলা জায়গায় থাকা যাবে না। একটা বিল্ডিঙয়ের ভেতরে চলে যেতে হবে বা কোন আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যেতে হবে অথবা দালানের নিচে চলে যেতে হবে। তবে টিনের চালা বা ছাউনির নিচে যাওয়া যাবে না। ঘরের ভিতরে অনেকে মনে করেন অবস্থান করলে জীবন বেঁচে যাবে, আসলে তা কিন্তু সঠিক নয়। বাস্তবে বজ্রপাতে একতৃতীয়াংশ লোক ঘরের ভিতরেইও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। বজ্রপাতের সময় খোলা জানালার পাশে যাওয়া বা ঘরের বারান্দায় যাওয়া ঠিক হবে না। এ সময় কোন ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলতে যাওয়া বা স্পর্শ করাও উচিত হবে না। আর বজ্রপাত সাধারণত: উঁচু স্থানে যেমন: বড়গাছ, বিদ্যুতের খাম্বা, উঁচু উঁচু জিনিষ যা মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত তাতে আঘাত হানে। অনেক সময় দেখা যায়, ছোট্ট বাচ্চারা বা কৃষক ভাইরা বজ্রপাতের সময় বড়গাছের নিচে আশ্রয় নেয়, এটাও কিন্তু সঠিক কাজ নয়। সম্ভব হলে বড়গাছের পাশে ছোট্ট গাছ থাকলে, ছোট্ট গাছের নিচে আশ্রয় নিতে হবে। নিচু জায়গায় দাঁড়ানো যেতে পারে। আর যদি খোলা মাঠে কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকে, সেক্ষেত্রে ছোট হয়ে গুটিয়ে বসে পড়া। মাটির সাথে সম্পর্ক খুব কম রাখা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, কোনভাবেই মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না। আর পুকুরে বা নদীতে থাকলে, উপরে উঠে আসতে হবে। নৌকায় থাকলে ছাউনির নিচে যেতে হবে। আর কেউ ছাতা ব্যবহার করে রাস্তায় হাঁটতে থাকেন, সেক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে ঐ ছাতার ডাঁটিটা যেন ধাতব বস্তুর না হয়। ঐ-ছাতা কাঠের বা প্লাস্টিকের হলে ভাল হয়। আর বিল্ডিঙের ক্ষেত্রে আমাদের উচিত অবশ্যই বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা। আরও বলা যেতে পারে যখন বজ্রপাত শেষ হয়ে যাবে বা শেষ হয়ে গেল বলে মনে হবার পরও কমপক্ষে আধা ঘণ্টা নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকতে হবে। বজ্রপাতের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, সেগুলো আপনাদের মাধ্যমে জনগণকে জানাতে চাই। সেটা হলো যে, বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হলে মনে রাখতে হবে বজ্রপাত ৮ থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে গিয়েও আঘাত হানতে পারে। অর্থাৎ যেখানে বজ্রপাত আঘাত হানে তার থেকে ৮থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে গিয়েও আঘাত করতে পারে। দ্বিতীয়ত: বজ্রপাত মাটিতে আঘাত হানার পরও মাটি থেকে ১০০ ফুট দূরত্বে গিয়েও পুনরায় আরেকজনকে আঘাত হানতে পারে। এ বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। আরেকটা বিষয় হলো অনেকের ভতরেই একটা ভুল ধারনা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, যেখানটায় বজ্রপাত হচ্ছে তা থেকে ৪৫ ডিগ্রি কোণের মাঝখানে দাঁড়ালে বজ্রপাত আঘাত হানতে পারে না,একথাটি কিন্তু ভুল। আবার অনেকে মনে করেন, রাবারের জুতা বা স্যান্ডেল পরলেও বজ্রপাত থেকে বেঁচে যাবে, সেটাও ঠিক নয়। বজ্রপাতের সময় সবসময় উচিৎ নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা এবং যতটা সম্ভব বজ্রপাত শেষ হওয়ার পরেও কমপক্ষে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে তারপরে বাইরে বেরিয়ে আসা।

রেডিও তেহরান: জি তসলিমা ম্যাডাম আপনি জনসচেতনতা সৃষ্টি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জনগণের পরিহার্জ্য এবং করণীয় সম্পর্কে চমৎকার দিকনির্দেশনা দিলেন। খুবই চমৎকার হয়েছে ব্যাপারটা। আচ্ছা সবশেষে আপনার কাছে জানতে চাইবো যে এই যে জনসচেতনতা সম্পর্কে আপনি বললেন, এ ব্যাপারে আমাদের বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিনা?  

তসলিমা ইমাম: হ্যাঁ, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হতে এখন অনেক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। যেমন: আমাদের বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ হতে অনেকগুলি জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানও করেছি। আমরা সচেতনতার বিষয়গুলো বিভিন্ন পোস্টার ও ব্রুসিয়রের মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি, পৌঁছে দিচ্ছি। আমরা বিভিন্ন ধরণের অ্যাওয়্যারনেস বিল্ডার্স সেমিনার করছি, সিমপোজিয়াম করছি, বিভিন্ন লোককে এখানে ডেকে আনছি, বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের লোককে। সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে যে জনগণকে আরো সচেতন করতে হবে। লাইটিং ট্রাইকিং বা লাইটিং ডিটেক্টর আমরা বসানোর চেষ্টা করছি বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশে। যাতে আরো পুঙ্খানুপুংখানুভাবে আমরা দেখতে পারি, বজ্রপাতগুলি কোথায় বেশি মাত্রায় হচ্ছে। কী মাত্রায় বাড়ছে। সরকার আরো একটি জরুরী পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে আমি মনে করি, যারা বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের পরিবারকে সরকার কিছু আর্থিক সাহায্য দিবে।

আরো একটি জরুরী জনসচেতনতামূলক বিষয় হল, অনেকে ভুল ধারনা করে, বজ্রপাতে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে তার ভিতরে চার্জ থাকে, আসলে একথা ঠিক নয়। বজ্রপাতে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে তাকে ধরলে সে চার্জ হয় না।

রেডিও তেহরান: জি! অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে তসলিমা আপা!

তসলিমা ইমাম: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।বিশেষ করে আপনাদের এই রেডিওকে অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই জন্য যে,বিশেষ করে এই সময়ের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনাদের মাধ্যমে তথ্যগুলো যদি জনসাধারণের কাছে পৌঁছে যায়, জনসাধারণ যদি পরামর্শগুলো শুনতে পারে এবং মেনে চলে তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই বজ্রপাত থেকে তারা তাদের জীবনকে রক্ষা করতে পারবে।# 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও উপস্থাপনায়: নাসির মাহমুদ

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/৪