জাতিসংঘের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের নতুন আক্রমণ; বাস্তবতাকে বিকৃত করে উপস্থাপনের চেষ্টা
https://parstoday.ir/bn/news/world-i155596-জাতিসংঘের_বিরুদ্ধে_ট্রাম্পের_নতুন_আক্রমণ_বাস্তবতাকে_বিকৃত_করে_উপস্থাপনের_চেষ্টা
পার্সটুডে: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘকে 'অকার্যকর' আখ্যা দিয়ে এই আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরুদ্ধে নতুন করে আক্রমণ চালিয়েছেন।
(last modified 2026-04-10T03:25:29+00:00 )
ডিসেম্বর ২৯, ২০২৫ ১৩:১৮ Asia/Dhaka
  • ডোনাল্ড ট্রাম্প
    ডোনাল্ড ট্রাম্প

পার্সটুডে: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘকে 'অকার্যকর' আখ্যা দিয়ে এই আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরুদ্ধে নতুন করে আক্রমণ চালিয়েছেন।

পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনা করে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অকার্যকর বলে অভিহিত করেন। তিনি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান।

ট্রাম্প দাবি করেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রই সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘের ভূমিকা পালন করছে। এর আগে তিনি বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ উসকে দেওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করে দাবি করেছিলেন যে, তিনি বিশ্বের ৮টি যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছেন।

যদিও বিতর্কিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘকে অকার্যকর বলে নতুন করে আক্রমণ করেছেন, তবে এই দাবি বাস্তবতার প্রতিফলনের চেয়ে বৈশ্বিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আড়াল করার প্রচেষ্টাই বেশি। জাতিসংঘের কার্যক্রম এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-পরিকল্পনার যত্নসহ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, এই সংস্থার অকার্যকারিতা মূলত বৃহৎ শক্তিবর্গ, বিশেষত আমেরিকার আচরণ এবং ভেটো ক্ষমতার সুবিধাভোগী ব্যবহারের ফলাফল; জাতিসংঘের অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণে নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে। দশকের পর দশক ধরে এই সংস্থা বহু ক্ষেত্রে সংঘাত বিস্তার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে, সংকটপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষী মিশন মোতায়েন করেছে এবং মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন ও রোগ প্রতিরোধের মতো ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলেছে। সুতরাং জাতিসংঘ সম্পূর্ণ অকার্যকর- এই দাবি সঠিক নয়। মূল সমস্যা নিহিত রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতার মধ্যে, যা বহুবার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে। ভেটো ক্ষমতাধারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বেশি এই ক্ষমতা ব্যবহার করেছে নিজের বা তার মিত্রদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা ঠেকাতে।

গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ও সংকট সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়াই এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে চালানো হয়েছিল। এই আগ্রাসন শুধু অঞ্চলটির স্থিতিশীলতা ধ্বংস করেনি, বরং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উত্থানের পথও সুগম করেছে। আফগানিস্তানেও ২০০১ সালে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অজুহাতে দেশটি দখল করার পর দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী শান্তির বদলে সহিংসতা, অস্থিতিশীলতা ও লাখো মানুষের বাস্তুচ্যুতি বাড়িয়েছে। ফিলিস্তিন সংকটে ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থনও বহুবার নিরাপত্তা পরিষদে বাধ্যতামূলক প্রস্তাব গৃহীত হতে দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে ৮০ বারের বেশি এমন প্রস্তাব আটকে দিয়েছে, যা সহিংসতা কমাতে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার রক্ষায় সহায়ক হতে পারত। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে বিপুল সামরিক ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে ওয়াশিংটন কার্যত গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং অঞ্চলজুড়ে আগ্রাসনের পথ উন্মুক্ত করেছে।

জাতিসংঘকে অকার্যকর বলে অভিযুক্ত করে ট্রাম্প আসলে বৈশ্বিক সংকটের দায় যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিতে চাইছেন। তিনি এমন এক সময়ে এই অভিযোগ তুলছেন, যখন তিনি নিজে এবং তার আগের মার্কিন প্রশাসনগুলো একতরফা নীতির মাধ্যমে বারবার জাতিসংঘের ভূমিকা দুর্বল করেছে।

ট্রাম্পের শাসনামলে মানবাধিকার পরিষদ এবং ইউনেস্কো থেকে আমেরিকার প্রত্যাহার এই নীতির একটি উদাহরণ- যা প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন বহুপাক্ষিকতাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে বিশ্বের ওপর নিজের মতবাদ চাপিয়ে দিতে চায়। এই ধরনের আচরণ বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের প্রতি আস্থা কমিয়েছে এবং সংকট সমাধানে এর সক্ষমতা সীমিত করেছে।

বাস্তবতা হলো, বড় শক্তিগুলোর সহযোগিতা ছাড়া জাতিসংঘ তার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে পারে না। ট্রাম্প যে অকার্যকারিতার কথা বলছেন, তার মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বাধা ও কারসাজি। সিরিয়া সংকটে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এবং বিশেষ করে গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের নিন্দা ঠেকাতে ভেটোর বারবার ব্যবহার- এই নীতির স্পষ্ট উদাহরণ। ইয়েমেন যুদ্ধেও সৌদি আরবকে ব্যাপক মার্কিন অস্ত্র বিক্রি যুদ্ধ ও মানবিক সংকট দীর্ঘায়িত করতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু সংকট সমাধানে ব্যর্থই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজেই সংকট সৃষ্টির প্রধান কারণ। আরেকটি উদাহরণ হলো- ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

অন্যদিকে, মানবিক ও উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে জাতিসংঘ এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বব্যাপী টিকাদান, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই, শরণার্থীদের সহায়তা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় এই সংস্থার কর্মসূচিগুলো এমন অর্জন, যা উপেক্ষা করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বড় শক্তি যদি এই সংস্থাকে দুর্বল করার বদলে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কার এবং ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার কমানোর দিকে অগ্রসর হয়, তবে জাতিসংঘ আরও কার্যকর হতে পারে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের সংকট সৃষ্টির ভূমিকা উপেক্ষা করে জাতিসংঘকে অকার্যকর বলা আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক দোষ চাপানোর কৌশল।

জাতিসংঘের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আক্রমণ ন্যায্য সমালোচনার চেয়ে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আড়াল করার প্রচেষ্টাই বেশি। কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ এখনও বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা। প্রকৃত অকার্যকারিতা তখনই দেখা দেয়, যখন বড় শক্তিগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, নিজেদের স্বার্থে এই সংস্থাকে ব্যবহার করে এবং ভেটো ক্ষমতার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করে। তাই জাতিসংঘকে দোষারোপের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতি ও ভেটোর অপব্যবহারকেই বৈশ্বিক সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে সমালোচনা করা উচিত।#

পার্সটুডে/এমএআর/২৯