ট্রাম্পের প্রতি মার্কিনিদের অসন্তোষ বৃদ্ধি; অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি
-
মার্কিন প্রেসেডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
পার্সটুডে- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বছর ব্যর্থ হয়েছে। সিএনএন-এর একটি নতুন জরিপের ফলাফলে এ কথা বলা হয়েছে।
পার্সটুডে লিখেছে, সিএনএন-এর একটি নতুন জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিক মনে করে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে সফলভাবে কাজ করেননি এবং সঠিক অগ্রাধিকারগুলো নির্বাচন করেননি।
জরিপটিতে আরও বলা হয়েছে, আমেরিকার জনগণের দৃষ্টিতে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় রোধ এবং মার্কিন জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য খুব বেশি কিছু করেনি। যদিও ট্রাম্প সব সময় নিজেকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একজন সফল প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিজেকে তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের কর্মক্ষমতা নিয়ে অসন্তোষের কারণগুলি মার্কিন এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই তুলে ধরা যায়। অভ্যন্তরীণভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসনের অক্ষমতা নাগরিকদের অসন্তোষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলির মধ্যে একটি।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বছরে আবাসন, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং খাদ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের ওপর সরাসরি চাপ পড়েছে। আমেরিকার অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে সরকারের কর নীতি মূলত বৃহৎ কর্পোরেশন এবং উচ্চ-আয়ের গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য তৈরি করা হয়েছে। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে অস্থিরতা, নিয়মকানুনে হঠাৎ পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে অপ্রত্যাশিত মিথস্ক্রিয়া ব্যবসায়িক পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলেছে এবং টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করেছে।
এ প্রসঙ্গে, জনমত জরিপের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলা হয়েছে, নভেম্বর মাসে বেকারত্বের হার ৪.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর এবং শিল্প পুনরুজ্জীবন এবং কারখানার চাকরি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পূরণ হয়নি। ২০২৫ সালের শেষে মুদ্রাস্ফীতির হারও অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে অনেক পণ্য ও পরিষেবার দাম বেড়েছে। হ্যাম্পটন গ্লোবাল বিজনেস রিভিউয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করেছে এবং অনেক প্রয়োজনীয় পণ্যকে বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত করেছে। এছাড়াও, খাদ্য, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শক্তির ক্রমবর্ধমান দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে এবং জনসাধারণের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এ বিষয়গুলি ছাড়াও, ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র্র নীতিও অসন্তোষ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আমদানির ওপর ভারী শুল্ক আরোপ এবং চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদের মতো দেশগুলির সাথে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়েছে।
এছাড়াও, কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা এবং ঐতিহ্যবাহী মার্কিন মিত্রদের সাথে উত্তেজনা তৈরি করা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পরিবেশকে তুলনামূলকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। অস্থিরতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারকেও প্রভাবিত করেছে। যার ফলে বিনিয়োগকারীরা মার্কিন অর্থনীতির ভবিষ্যত সম্পর্কে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে এবং এই সতর্কতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিয়েছে।
অন্যদিকে, কঠোর অভিবাসন নীতি, কৃষি, নির্মাণ এবং পরিষেবার মতো খাতে কিছু সস্তা এবং প্রয়োজনীয় শ্রম সীমিত করেছে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করেছে। ফলশ্রুতিতে পণ্যের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সংকটের প্রতি মার্কিন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের কর্মক্ষমতা নিয়ে অসন্তোষও বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে সমন্বয় ছাড়াই বা অর্থনৈতিক পরিণতির মূল্যায়ন ছাড়াই নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু ক্ষেত্রে সংকটে পড়তে হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনার জন্য বেশি অর্থ প্রদান করতে হয়েছে।
আমেরিকার বেশিরাভাগ মানুষ মনে করে, ট্রাম্প জনগণের প্রধান উদ্বেগের দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা প্রতীকী বিষয়গুলিতে তার শক্তি ব্যয় করেছেন। সব মার্কিন জনগণের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরিবর্তে তিনি একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তির নেতা হিসেবে রয়ে গেছেন। তিনি তার রাজনৈতিক মূলধনের একটি বড় অংশ দলীয় লড়াইয়ে ব্যয় করেছেন, মিডিয়া আক্রমণ করেছেন, নির্বাচনী জয়ের ওপর জোর দিয়েছেন এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকারের চিত্র তুলে ধরতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন। এই পদ্ধতির ফলে আমেরিকার জনগণের একটি বড় অংশ মনে করে, ট্রাম্প প্রশাসন সত্যিকার অর্থে তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না এবং জনসাধারণের ইস্যুগুলির চেয়ে রাজনৈতিক সংঘাতে বেশি জড়িত।
ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্বের অত্যধিক ব্যবহার সম্পর্কে আমেরিকার জনগণের মধ্যে উদ্বেগও বেড়েছে। অনেকে বিশ্বাস করেন, ট্রাম্প ক্ষমতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রীক করে এবং তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করে প্রশাসনের ঐতিহ্যবাহী ভারসাম্যকে বিপর্যস্ত করেছেন। হঠাৎ সিদ্ধান্ত, বিচার বিভাগীয় ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ এবং রাজনৈতিক রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে এমন এক ব্যবস্থাপনা শৈলী তৈরি করা হয়েছে যাতে এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে যে ট্রাম্প যুগে রাজনীতি ব্যক্তিগত ইচ্ছার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
একই সাথে, ট্রাম্পের আমলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। শুরু থেকেই, তিনি পরিচয়, জাতি এবং অভিবাসন সীমানা ভিত্তিক একটি বক্তৃতার ওপর নির্ভর করেছেন এবং এই বক্তৃতার বাস্তবায়ন, বিশেষ করে অভিবাসী এবং বিক্ষোভকারীদের সাথে সহিংস সংঘর্ষের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু এবং তরুণসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অবিশ্বাস এবং ভয় বাড়িয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম বছরের কর্মক্ষমতা নিয়ে সেদেশের মানুষে অসন্তোষে প্রকাশ পায় যে ,মার্কিন সমাজের সংকটগুলোরই কেবল সমাধান হয়নি বরং তার নেতৃত্বে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয় পরিত্যাগ করা হয়েছে অথবা বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম বছরে কেবল সেদেশের জনগণের সন্তুষ্টি অর্জন করতেই ব্যর্থ হননি বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং সামনের চ্যালেঞ্জ পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তার প্রশাসনের ক্ষমতা নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। #
পার্সটুডে/জিএআর/১৮