আফ্রিকায় ব্রিটিশ যুদ্ধাপরাধ: বোয়ার যুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাসের লজ্জা
-
ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে নিহত বোয়ার কণ্ঠস্বর
পার্সটুডে-উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে, আফ্রিকা মহাদেশে পশ্চিমা উপনিবেশবাদের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর মধ্যে একটি সংঘটিত হয়েছিল।
১৮৯৯ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় বোয়ার যুদ্ধগুলো কেবল একটি জাতির স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য একগুঁয়ে প্রতিরোধের সাক্ষী ছিল না বরং ব্রিটেনের নৃশংস সহিংসতা এবং জঘন্য যুদ্ধাপরাধের কারণে উপনিবেশবাদের ইতিহাসের অবিস্মরণীয় এবং তিক্ত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে ওঠে।
আফ্রিকার ইতিহাস, বিশেষ করে যখন ব্রিটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়ামের মতো ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো আফ্রিকার বিভিন্ন ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করেছিল, তখন সর্বদা সহিংসতা, শোষণ এবং নিষ্ঠুরতা চালিয়েছিল। পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা আফ্রিকা মহাদেশের প্রাকৃতিক এবং মানব সম্পদ শোষণ করার জন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করেছিল। ওই প্রচেষ্টার মাধ্যমে, পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা কেবল আদিবাসীদের মানবাধিকারকেই উপেক্ষা করে নি বরং তাদেরকে নৃশংসভাবে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করেছিল।
এ ক্ষেত্রে ১৭শ থেকে ১৯শ শতাব্দীর ডাচ, জার্মান এবং ফরাসি হুগেনট অভিবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের একটি দল, বোয়ের্সদের সাথে আচরণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বর্বরতা এবং নিয়মতান্ত্রিক শোষণের তীব্রতাকে চিত্রিত করে। আফ্রিকার ভাষায় "বোয়ের্স" শব্দটির অর্থ কৃষক এবং এই গোষ্ঠীর জীবনধারাকে বোঝায়, যা মূলত কৃষি এবং গ্রামীণ সম্প্রদায়ের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এই দলটি প্রথম ১৬৫২ সালে কেপ অফ গুড হোপে পৌঁছায় এবং ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে বসতি স্থাপন করে। সময়ের সাথে সাথে, বোয়ের্স একটি স্বাধীন সম্প্রদায়ে পরিণত হয় এবং আফ্রিকান ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। তাদের অনেকেই ১৮৩০ থেকে ১৮৫০ এর দশক পর্যন্ত "গ্রেট ট্রেক" শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকার দূরবর্তী অঞ্চলে অভিবাসন করে। তাদের লক্ষ্য ছিল ট্রান্সভাল এবং অরেঞ্জ ফ্রি স্টেটের মতো স্বাধীন বোয়ের্স প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। বোয়ের্স তাদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে এবং ব্রিটিশ প্রভাব প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল।
প্রথম বোয়ার যুদ্ধের পরপরই শুরু হওয়া দ্বিতীয় বোয়ার যুদ্ধের (১৮৯৯-১৯০২) সময় বোয়াররা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ব্রিটেন বোয়ারদের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জমি সম্পূর্ণরূপে দখলের প্রচেষ্টার ফলে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এই যুদ্ধে, বোয়াররা অসম যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা বোয়ারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, গণহত্যা এবং নির্যাতনসহ নৃশংসতাপূর্ণ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে।
যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এমন পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল যা স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধ ছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে কুখ্যাত ও নৃশংস অপরাধগুলোর মধ্যে একটি ছিল বোয়ার জনগণ, সেইসাথে আদিবাসী আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে আটকে রাখার জন্য কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ব্যবহার করা। বোয়ার প্রতিরোধ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই শিবিরগুলো বিশেষভাবে সম্প্রসারিত হয়েছিল। বোয়ার নারী, শিশু এবং বেসামরিক নাগরিকদের বোয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য এই শিবিরগুলোতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এই শিবিরগুলোতে জীবনযাত্রার অবস্থা ছিল অত্যন্ত অমানবিক। ক্ষুধার পাশাপাশি হলুদ জ্বরের মতো বিচিত্র সংক্রামক রোগ এবং সেইসাথে শিবিরগুলোতে অত্যন্ত অপর্যাপ্ত সংকুলানের কারণে ২৬ হাজারেরও বেশি বোয়ার মহিলা ও শিশু এবং ২০ হাজারেরও বেশি আফ্রিকান প্রাণ হারায়।#
পার্সটুডে/এনএম/১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন