নিউ স্টার্ট চুক্তির অবসান: বিশ্ব কি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার পথে?
-
যুক্তরাষ্ট্র–রাশিয়া পারমাণবিক চুক্তির অবসান: আতঙ্কে বিশ্ব
পার্সটুডে: যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি 'নিউ স্টার্ট' খুব শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আজ (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে কার্যকর থাকা শেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি। এর অবসান বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত রাখার একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে ছিল। এখন সেই কাঠামো ভেঙে পড়তে যাচ্ছে, যা নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
নিউ স্টার্ট চুক্তি কী ছিল?
'নিউ স্টার্ট' চুক্তি ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০১১ সালে কার্যকর হয়। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমানো এবং দুই দেশের মধ্যে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
এই চুক্তি অনুযায়ী:
- যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সর্বোচ্চ ১,৫৫০টি কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন করতে পারবে
- অস্ত্রসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত আদান-প্রদান করা হবে
- সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে আগাম জানানো হবে
- পরিদর্শন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা হবে
এর ফলে ভুল বোঝাবুঝি, উত্তেজনা এবং যুদ্ধের আশঙ্কা অনেকটাই কমে এসেছিল।
কেন চুক্তিটি শেষ হচ্ছে?
এই চুক্তির মেয়াদ প্রথমে নির্ধারিত ছিল ২০২১ সাল পর্যন্ত। তবে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন-এর সিদ্ধান্তে এটি আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হয়। ফলে মেয়াদ নির্ধারিত হয় ২০২৬ সাল পর্যন্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি, ইউক্রেন যুদ্ধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক সংকটের কারণে নতুন করে চুক্তি নবায়ন বা বিকল্প কোনো চুক্তি করার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করে, যদিও তারা তখন বলেছিল যে সংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা তারা মেনে চলবে।
কেন এটি বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির অবসান মানে হলো—
- পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আর কোনো বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো থাকবে না
- যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া চাইলে অস্ত্রের সংখ্যা বাড়াতে পারবে
- নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে
- অন্যান্য দেশও পারমাণবিক অস্ত্র বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারে
- বিশ্বে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে
এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া
বিশ্বের ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার উচিত এই চুক্তির বিকল্প কোনো সমাধান খোঁজা, যাতে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু না হয়।
ব্রিটেনের সাবেক সেনাপ্রধান অ্যাডমিরাল টনি রাদাকিন সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এই পরিস্থিতিকে “উদ্বেগজনক” বলে উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তারা 'আরও ভালো একটি চুক্তি' চায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি—ভবিষ্যতের যেকোনো নতুন চুক্তিতে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অন্যদিকে রাশিয়া বলছে, শুধু চীন নয়—ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো ইউরোপীয় পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোকেও এই কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
এই মতপার্থক্যের কারণে নতুন কোনো চুক্তি নিয়ে এখনো কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।
ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন:
- নতুন আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়নি
- তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশ্ব একটি আরও অনিশ্চিত, ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থির নিরাপত্তা যুগে প্রবেশ করছে
- পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বড় সংকটের মুখে
নিউ স্টার্ট চুক্তির অবসান শুধু একটি চুক্তির শেষ নয়, বরং এটি বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত। #
পার্সটুডে/এমএআর/৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।