ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খানের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। বিশেষ করে বিপ্লবের চার দশকে ইরান কতোটা উন্নতি করলো, কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করলো সেসব নিয়ে গবেষণাধর্মী বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরছিলেন তিনি।
গত পর্বে আমরা জেনেছি যে ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অসামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পারমাণবিক ক্ষেত্রে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, ন্যানো টেকনোলজিতেও ইরান ব্যাপক এগিয়ে গেছে। আরও জেনেছি তরুণ সমাজ বিপ্লবের প্রভাবে কতোটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। আজকের আসরে আমরা একটু ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করবো।
মার্কিন বুদ্ধিজীবী জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জন লুইস স্পোজিটো। তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ওপর অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন এমনকি একটি বইও লিখেছেন " ইরানের বিপ্লব ও বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব" নামে। এই বইতে তিনি পরিস্কারভাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ধর্মীয় শেকড় নিয়ে কথা বলেছেন। সেইসাথে ইরানের সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তো বটেই এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে এই বিপ্লবের প্রভাব নিয়েও কথা বলেছেন। জন লুইস স্পোজিটো ইসলামি বিপ্লব সম্পর্কে বলেছেন,যে প্রক্রিয়ায় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে তা সবাইকে অবাক করেছে। রাজনীতিবিদ এবং গবেষকরা বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারকারী গতিময় ওই বিপ্লবের গতিবিধি বোঝার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিপ্লবের ওই বাস্তবতাকে সহজে উপলব্ধি করা সহজ ছিল না।
"সভ্যতাগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব" তত্ত্বের প্রণেতা মার্কিন তাত্ত্বিক হান্টিংটন ১৯৯৩ সালে বলেছিলেন,রাজনৈতিক ইসলাম প্রেরণা পেয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব থেকে। তিনি বলেছেন,যে ইসলাম নিজেকে পাশ্চাত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে তা মার্কিন বিশ্ব-ব্যবস্থার জন্য প্রধান বিপদ। কারণ,মার্কিন বিশ্ব-ব্যবস্থা অনুযায়ী ধর্ম ও রাজনীতি পৃথক থাকতে হবে। কিন্তু ইরানের বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক চেতনার মাধ্যমে। বিপ্লব সংঘটিত হবার সময় বিশ্ববাসীর ধারণা ছিল প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য মতাদর্শের বাইরে অন্য কোনো আদর্শ স্থান পাবার প্রশ্নই আসে না। প্রাচ্যে ছিল কমিউনিজম আর পাশ্চাত্যে ছিল ইম্পেরিয়ালিজম। ইসলাম তো দেড় হাজার বছর আগের মানে পুরোণো একটি আদর্শ। এই যুগে সেই আদর্শ চলতেই পারে না। অথচ ইরানে যে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে তার মূল শ্লোগান ছিল: "না শারকি না গারবি, জমহুরিয়ে ইসলামি"। অর্থাৎ প্রাচ্য নয় পাশ্চাত্য নয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র।
ইসলামি বিপ্লবের পর বিশ্ববাসী অবাক হয়ে দেখলো ইরানের ইসলামি সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের ক্রম-উন্নতি। ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া আট বছরের যুদ্ধ, আমেরিকার বিচিত্র ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক অবরোধ,নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি সত্ত্বেও ইরান শিক্ষা, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা,অর্থনীতি,বিজ্ঞানসহ সকল ক্ষেত্রেই অভাবনীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি লাভ করেছে । যেমনটি বললেন ড. সিদ্দিকুর রহমান খান:
এই বিস্ময়কর ঘটনাটিই ঘটেছে ইসলামি বিপ্লব পরবর্তী ইরানে। স্বাভাবিকভাবেই এই বিপ্লব আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে যুব প্রজন্মের ইসলামী জাগরণকেও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের ফল হিসেবেই দেখা হয়। বিশেষ করে মিশর ও তিউনিসিয়ার ইসলামী জাগরণের সঙ্গে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মিল লক্ষণীয়। ইরানের বিপ্লবী মুসলমানদের মত তারাও কঠোরভাবে মার্কিন ও ইহুদিবাদী আধিপত্যের বিরোধী। ড. সিদ্দিক বলছিলেন যে চিকিৎসাক্ষেত্রেও ইরানের অগ্রগতি এককথায় বিস্ময়কর।
ইরানে ইসলামি বিপ্লবের বিজয় অন্যায় ও অবিচারের অন্ধকার দূর করে আলোর এক দীর্ঘস্থায়ী বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই এই আলোর বিকিরণ লক্ষ্য করেছে বিশ্ববাসী। এই বিপ্লবের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা ভেবেই পেন্টাগন আর ক্রেমলিনসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরানের চলচ্চিত্র সেই ভাষ্য অত্যন্ত নিপুণ ও শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাপী। চলচ্চিত্রে ইরানের সাফল্য সম্পর্কে ড. সিদ্দিকের মন্তব্য এরকম:
ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ও নেতা ইমাম খোমেনীর (রহ) নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয় সংঘটিত হওয়ার পর টাইম ম্যাগাজিন এক নিবন্ধে মন্তব্য করেছিল যে,গোটা মুসলিম উম্মাহ জেগে উঠছে। বিশেষ করে বিশ্বের উত্তপ্ত কড়াই হিসেবে বিবেচিত মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া আরব বসন্তও তারই প্রমাণ বহন করে। কোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই ইরান। বিচিত্র বাধা-প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দেশটি যে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে সেই তথ্য জানালেন ড. সিদ্দিক।
বন্ধুরা! বিপ্লব পরবর্তীকালে ইরানের বিচিত্রমুখি উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করলাম। এ আলোচনার পরিসমাপ্তি টানবো ইরানের সর্বোচ্চ নেতার একটি বাণী উদ্ধৃত করে। তিনি বলেছেন:
চল্লিশ বছর, চার দশক আগে আমেরিকার এদেশি ক্রীড়ণকেরা নিজেরা নিজেদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতো যে: ছয় মাস অপেক্ষা করো, বিপ্লব শেষ হয়ে যাবে। ছয় মাস শেষে কোনো পরিবর্তন না দেখে বলতো: আর একটা বছর অপেক্ষা করো! এখন বিপ্লবের চল্লিশ বছর কেটে গেছে। সেই বিপ্লবের নতুন চারাটি এখন বিশাল মহীরূহে পরিণত হয়েছে। এখনও আমেরিকা নিজেদেরকে এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্রদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছে: আর মাত্র দুই তিন মাস অপেক্ষা করো। এ প্রসঙ্গে আমার একটি কবিতা মনে পড়ছে:
شتر در خواب بیند پنبه دانه ، گهی لپ لپ خورد گه دانه دانه
"উট স্বপ্নে দেখে তুলার বিচি চিবোচ্ছে। কখনো গপাগপ কখনো একটি করে খাচ্ছে"।
গল্পটি হলো:এক লোক দুটি কলসি ভরে দুধ নিয়ে শহরে যাচ্ছিল বিক্রি করতে। পথিমধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কলসি মাটিতে সামনে রেখে একটি গাছে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নেয়। চোখ বুজে ভাবতে থাকে:যদি দুধের ভালো দাম পাওয়া যায় তাহলে দুই থেকে চার কলসি দুধ হবে। চার থেকে আট। এরপর দুধ থেকে ঘি তৈরি হবে। ঘিয়ের বাজার ভালো হলে একটা দোকানই দিয়ে দেবে।ব্য বসা ভালো হলে গভর্নরের মেয়েকে বিয়ে করবে। বিয়ের কথা ভাবতেই একটু অন্যরকম হয়ে গেল মন। মেয়েটির সঙ্গে কথাবার্তা বলার এক পর্যায়ে কোনো কারণে রেগে যায় দুধ বিক্রেতা। রাগ সংবরণ করতে না পেরে লাত্থি মেরে বসে মাটিতে। দু:খজনকভাবে সেই লাত্থি গিয়ে লাগে তার কলসিতে এবং কলসি দুটো ভেঙে সব দুধ মাটিতে মিশে যায়।
সুতরাং শত্রুরা যতই দিবাস্বপ্ন দেখুক আল্লাহর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আল্লাহ বলেছেন:"এরা তাদের মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। অথচ আল্লাহর ফায়সালা হলো তিনি তার নূরকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন। কাফেররা তা যতই অপছন্দ করুক না কেন"।
বন্ধুরা! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান খানও দীর্ঘ এ যাত্রায় আমাদের সময় দিয়ে ধন্য করেছেন। রেডিও তেহরানের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি রইলো আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।আর আপনারা যারা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সঙ্গ দিলেন আপনাদেরকেও জানাই আন্তরিক মোবারকবাদ। ইরানের অগ্রগতি আসলে এরকম দু'চারটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আধিপত্যবাদী শক্তির মিডিয়াগুলোর অপপ্রচারণায় কোনোরকম কান না দিয়ে ইরানের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে জানতে সচেতন হয়ে উঠুন,রেডিও তেহরানের সঙ্গেই থাকুন।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/২৯
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন