জুন ০৮, ২০২২ ২১:১৩ Asia/Dhaka

শ্রোতা/পাঠকবন্ধুরা! রেডিও তেহরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান স্বাস্থ্যকথার আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশীদ। বাংলাদেশে এখন জৈষ্ঠ্যমাস। হাঁসফাঁস গরম। আম কাঁঠাল লিচু জাম পাকানো গরম। মাঝে মাঝে ঝড় বৃষ্টি হলেও গরম কিন্তু বেশ। আর অতিরিক্ত গরম সব সময়ই মানুষের জন্য ক্ষতিকর। এই গরমে সাধারণত যেসব রোগব্যাধিতে মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকে সে সম্পর্কে তার প্রতিকার নিয়ে আজও কথা বলব বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. আবু কামরান রাহুলের সঙ্গে।

তিনি, মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন বিভাগ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। সম্প্রতি  তিনি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে বিশেষ ট্রেনিং করছেন।

রেডিও তেহরান: জনাব ডা. আবু কামরান রাহুল রেডিও তেহরানে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

ডা. রাহুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।

রেডিও তেহরান: ডা. আবু কামরান রাহুল, গরমকালের রোগ-ব্যাধি এবং করণীয় সম্পর্কিত আলোচনার প্রথম পর্বে আপনি হিট স্ট্রোক, পেটের অসুখ, ত্বকের সমস্যা, হিট একজর্সন, সান বার্নসহ নানা রোগের কথা বলেছিলেন এবং হিট স্ট্রোক ও পেটের সমস্যা এবং ত্বকের সমস্যা ও করণীয় সম্পর্কে আমাদের শ্রোতাদের সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ক দ্বিতীয় পর্বের আলোচনার শুরুতে আপনার কাছে জানতে চাইব- আপনি হিট একজর্সন'র কথা বলছিলেন। সেটি কি কেন হয় এবং প্রতিকারে করণীয় কি?

ডা. আবু কামরান রাহুল:  হিট একজর্সন এর বাংলায় আমরা বলে থাকি তাপ নিঃশেষণ। সাধারণ গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘক্ষণ পরিশ্রম করলে হিট একজর্সন হয়। এসময় শরীরের তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়ার্স হয়ে থাকে। শরীরে প্রচণ্ড ঘাম হয়। এতে শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে লবন সোডিয়াম- সেটি বের হয়ে যায়। এর ফলে শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তারমধ্যে রয়েছে,

১) ত্বক অনেক গরম হয়ে যায়।

২) প্রচণ্ড ঘাম হয়।

৩) অনেক বেশি মাথা ব্যথা হয়।

৪) শরীর দুর্বল লাগে।

৫) ক্লান্তি এবং বিরক্তি ভাব হয়।

৬) অনেক বেশি পানিশূন্য হয়ে পড়ে শরীর এবং হৃদপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে যায়।

এরকম পরিস্থিতি হলে রোগীকে যতদ্রুত সম্ভব তাপ থেকে ছায়ায় নিতে হবে। শরীরের পোশাক খুলে ঠাণ্ডা পানির স্প্রে করে দিতে হবে এবং ফ্যানের নিচে রাখতে হবে রোগীকে। তাতে তার শরীর কিছুটা শীতল হবে। পানির স্বল্পতা পূরণের জন্য খাবার স্যালাইন অনেক বেশি খেতে হবে কিংবা শিরায় স্যালাইন দিতে হবে। আর দ্রুত চিকিৎসা না করলে তাপ নিঃসরণ হিট স্ট্রোকে কিন্তু পরিণত হতে পারে।

রেডিও তেহরান: ডা. রাহুল সান বার্ন'র কোথা শোনা যায় গরমকালে হয়। এ সম্পর্কে যদি একটু বুঝিয়ে বলেন।

ডা. আবু কামরান রাহুল: দেখুন, সান বার্ন বা রোদে পড়ার বিষয়টি হচ্ছে- যদি কেউ দীর্ঘক্ষণ সূর্যালোকে থাকে তখন ক্ষতিকারক অতি বেগুনি রশ্মি বা আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি ত্বকে প্রবেশ করে এবং সান বার্ন নামক অবস্থার সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় ত্বক শুষ্ক ও লাল হয়ে যায় সেইসাথে একটু একটু চুলকায়। সাথে বমি বমি ভাব, জ্বর ও ঠাণ্ডা থাকে। ত্বকে ফোসকাও পড়তে পারে। তবে রোগীর অবস্থার উন্নতি হলে অনেক ত্বক থেকে খোসা উঠতে পারে। সান বার্নটা সাধারণ গ্রীষ্মকালেই বেশি দেখা যায়। সান বার্ন স্কিন ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দেয়। সান বার্ন থেকে বাঁচার জন্য ভালো কোম্পানির লোশন মুখ-গলা ও হাতে লাগতে হবে বাইরে বের হবার সময়। তাছাড়া রৌদ্রের মধ্যে বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করতে হবে।

শ্রোতাবন্ধুরা! আপনারা স্বাস্থ্যকথার আসরে বিশিষ্ট চিকিৎসক আবু কামরান রাহুলের গরমকালের রোগ ব্যাধি নিয়ে দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের আলোচনা শুনছেন। ফিরছি খুব শিগগিরি। আমাদের সাথেই থাকুন।

 রেডিও তেহরান:  মিউজিক বিরতির পর আবারও ফিরলাম। ডা. রাহুল-এই গরমকালে শিশুদের খাওয়া-দাওয়া, সতর্ক থাকা ইত্যাদি বিষয়ে আপনি কি পরামর্শ দেবেন?

ডা. আবু কামরান রাহুল: দেখুন, গরমের সময় বাচ্চাদের প্রতি অনেক যত্ন নিতে হবে এবং বাচ্চাদের বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। গরমের সময় বাচ্চারা তুলনামূলকভাবে বেশি অসুস্থ হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি আমাদের অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। তারমধ্যে শিশুর শরীরে লবণ এবং পানির ঘাটতি যাতে না হয় সে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের বারবার বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। আর বুকের দুধ সরবরাহ ঠিক রাখতে মাকে নিয়মিত সুষম খাবারের পাশাপাশি পানি, ডাবের পানি, ফলের রস ও দুধ পান করতে হবে। আর ছয় মাসের চেয়ে বড় শিশুদের দুধের পাশাপাশি অল্প অল্প করে ঠাণ্ডা ফুটানো পানি, ডাবের পানি, ফলের রস পান করাতে হবে। তবে যদি শিশুর ঘাম খুব বেশি হয় সেক্ষেত্রে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে।

শিশুর শরীর শীতল রাখতে হবে। শিশুকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। ভেজা গামছা বা তোয়ালে দিয়ে মাথাসহ পুরো শরীর বারবার মুছে দিতে হবে। শিশুর জামা কাপড় হতে হবে আরামদায়ক। শিশুকে সূতি ও হালকা রংয়ের ঢিলেঢালা পোশাক পরাতে হবে। গরমের সময় ঘর ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে যাতে প্রচূর পরিমাণে আলো বাতাস ঢুকতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। ফ্যান কিংবা এসে সহনীয় মাত্রায় ছেড়ে রাখতে হবে। লক্ষ্য রাখতে শিশু ঠিকমতো প্রস্রাব করছে কি না। প্রস্রাবের রং কেমন এবং শিশুর চোখ মুখ শুকনো হয়ে যাচ্ছে কি না, জিহবা শুকিয়ে যাচ্ছে কি না। যদি এ ধরণের সিমটম দেখা যায় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

রেডিও তেহরান: বয়স্ক বিশেষ করে ৬৫ বা তারও চেয়ে বেশি বয়স্ক মানুষের জন্যও বা আপনার পরামর্শ কি হবে?

ডা. আবু কামরান রাহুল: গ্রীষ্মকালে বয়স্কদেরও অসুস্থ হওয়ার পরিমাণটা তুলনামূলকভাবে বেশি। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে বয়স্কদের বিষয়ে বেশ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এসময়ে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে। মাঝেমধ্যে ডাবের পানি, লবণ পানি ও স্যালাইন পানি পান করতে হবে। রাস্তাঘাটের খোলা পানি কিংবা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অতিরিক্ত চা বা কফি খাওয়া যাবে না। এগুলো শরীরকে আরও বেশি পানি শূন্য করতে পারে। হালকা রংয়ের পাতলা সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হবে। যাতে বাতাস সহজে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ঘেমে গেলে কাপড় পাল্টাতে হবে। কারণ ঘাম বসে গেলে ঠাণ্ডা লেগে যেগে পারে। বাইরের খাবার না খেয়ে ঘরে তৈরি খাবার খেতে হবে। এতে করে ফুড পয়জনিং কম হবে। বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে দুটো সময় এড়িয়ে চলা উচিত। সকাল ১০ টা থেকে ১১ টা এবং তিনটা থেকে চারটা- এ দুটো সময়ে প্রচণ্ড গরম থাকে। তাই এই দুটো সময়ে বয়স্কদের বাইরে না যাওয়া ভালো। আর যদি জরুরি কাজে বের হতেই হয় তাহলে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করতে হবে। প্রতিদিন স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি দিয়ে গোসল করা উচিত। ঘামে ভেজা কাপড় আবার পরিধান করলে ত্বকে সমস্যা হতে পারে। এসব বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করলে বষষ্করা গরমের সময় সুস্থ থাকতে পারবেন।

রেডিও তেহরান: জনাব, ডা. আবু কামরান রাহুল, রেডিও তেহরানের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য সচেতনা নিয়ে আর কিছু বলবেন কি?

ডা. আবু কামরান রাহুল: আসলে স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমরা নিজে জানব এবং অন্যকে জানাব। আজ রেডিও তেহরানের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আমার পরামর্শ হচ্ছে- যদি আমরা কেউ অসুস্থ হই তাহলে নিজে নিজে ওষুধ খাব না কিংবা ফার্মেসির লোকদের কথা অনুযায়ী কোনো ওষুধ কিনে খাব না। সাধারণত দেখা যায় আমরা কোনো অসুখ হলেই এভাবে এক কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। এরফলে দেখা যায় অসুখটা কমে না বরং অ্যান্টিবায়োটিকটা আমাদের শরীরে রেজিটেন্স হয়ে যাচ্ছে। এরফলে কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না এবং আমাদের চিকিৎসা খরচটাও বেড়ে যাবে। তাই আপনাদেরকে আমার সচেতনতামূলক পরামর্শ হচ্ছে-অসুস্থ হলে আমরা চিকিৎসকের পরামর্শ নেব। এই প্রচণ্ড গরমে আমি আপনাদের সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। সবাই ভালো থাকবেন।

তো জনাব ডা. আবু কামরান রাহুল, গরমকালের নানান রোগ-ব্যাধি এবং করণীয় নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে দুই পর্বের আলোচনায় সময় দেয়ার জন্য আপনাকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আর শ্রোতা/পাঠকবন্ধুরা! বিশিষ্ট মেডিসিন বিষয়ক চিকিৎসক ডা. আবু কামরান রাহুলের কাছ থেকে গরমকালের নানাবিধ রোগ ও তার প্রতিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুনে নিশ্চয়ই আপনাদের ভালো লেগেছে। তো আমাদের আজকের স্বাস্থ্যকথার আসরের সময় শেষ হয়ে এসেছে,আপনারা সবাই ভালো ও সুস্থ থাকুন এ কামনা করে আজ এখানেই বিদায় নিচ্ছি। আগামী সপ্তায় স্বাস্থ্য কথার আসরে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে হাজির হব। সে আসরেও আপনাদের সঙ্গ পাব বলে আশা করছি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৮

ট্যাগ