এপ্রিল ০৫, ২০২৩ ১৪:২১ Asia/Dhaka

প্রিয় পাঠক ও শ্রোতাবন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা গল্প ও প্রবাদের গল্পের আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প। গল্পটি এরকম: 

 একদিন এক শিকারী তীর ছুঁড়ে মারলো শিকারী বাজপাখিকে লক্ষ্য করে। তীরবিদ্ধ হয়ে ওই বাজপাখি লুটিয়ে পড়লো মাটিরে ওপর। বাজপাখিটি যেখানে পড়েছিল তার পাশেই ছিল একটি মুরগি। মুরগি বাজপাখির চীৎকার শুনে তার কাছে এগিয়ে গেল। তার ভাষায় সে বাজপাখির প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে বললো: আশা করি তুমি খুব বেশি আঘাত পাও নি। আমি কি তোমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?

মুরগির মনটা খুব পুড়ছিলো বাজপাখিটার জন্য। তাই আগ বাড়িয়ে আবারও বললো: আমি তোমার সেবাযত্নের জন্য প্রস্তুত আছি। বাজপাখি এবার মুখ খুললো: আমাকে কোনোরকম সাহায্য করা যদি তোমার পক্ষে সম্ভবও হয় তারপরও আমি চাই না তুমি আমার জন্য কোনোরকম সাহায্যের হাত বাড়াও! তুমি এখান থেকে সরে যাও! আমরা কোনোদিন পরস্পরের কাছাকাছি আসবো না মানে সন্ধি করবো না। মুরগি নাছোড়বান্দা। সে বললো: আমার সেঙ্গ এতোটা নির্দয় আচরণ করো না। আমি এমন কি অন্যায় করেছি যে তুমি আমার ওপর এতোবেশি বিরক্ত হয়ে আছো?

মুরগির কথা শুনে বাজপাখি বললো: তুমি এখান থেকে সরে যাও! আমাদের মাঝে কখনোই ঘনিষ্টতা হবে না। তাছাড়া তোমার ব্যবহার আমার কাছে কোনোরকম গুরুত্ব বহন করে না। মুরগি তারপরও পীড়াপীড়ি করলো এবং বললো: এতোটা নির্দয় আচরণ করছো কেন আমার সঙ্গে! আমি কী করেছি যে তুমি এরকম আচরণ করছো? কেন আমার প্রতি তুমি এরকম রুষ্ট? বাজপাখি বললো: তোমার অপরাধ হলো তুমি অকৃতজ্ঞ এবং বিশ্বস্ততা ও সাহসিকতার মূল্য বোঝো না। তাই এগুলোর গুরুত্ব তোমার কাছে নেই। আমি একটা মহান হৃদয় এবং বীরত্বপূর্ণ প্রাণী। তাই আমি অবিশ্বস্তদের সঙ্গে পরিচিত হতে অপছন্দ করি।

মুরগি এরকম শুনে ভীষণ অবাক হয়ে গেল। বললো: তুমি কেন আমার ওপর এরকম অপবাদ আরোপ করছো? কেন আজেবাজে কথা বলছো? আমার মাঝে কী অবিশ্বস্ততা দেখেছো তুমি-যে অবিশ্বস্ততার কারণে আমাকে তুমি ঘৃণা করছো? আমি একটা গৃহে পালিত মুরগি। আর তুমি হচ্ছো একটা বুনো পাখি। ভদ্র এবং মার্জিত রুচির অধিকারী তো সে-ই যে কিনা যুক্তি দিয়ে কথা বলে। তুমি কোন যুক্তিতে আমাকে অবিশ্বস্ততার অপবাদ দিচ্ছো? বাজপাখি এবার বিস্তারিত ব্যাখ্যা সহকারে, যুক্তি সহকারে মুরগির অবিশ্বস্ততার বিবরণ এবং কারণ তুলে ধরলো। 

বিরতির পর আবারও স্বাগত আপনাদের গল্প ও প্রবাদের গল্পের আজকের আসরে। মুরগির অবিশ্বস্ততার কারণ বাজপাখিক এভাবে তুলে ধরলো: আমার দৃষ্টিতে তোমার অবিশ্বস্ততার কারণ হলো তোমাকে মানুষেরা অত্যন্ত আদর যত্ন সহকারে লালন পালন করে। তোমাকে দানাপানি দেয় নিয়মিত। খোঁয়াড় তৈরি করে তোমাকে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে দেয় যেন কেউ তোমার ওপর হামলা চালাতে না পারে। অথচ তুমি তাদের এরকম আন্তরিক দয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো না। উল্টো তারা যখন তোমাকে ধরতে যায় তুমি তখন দৌড়ে পালাও। এই পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকার মাধ্যমে তুমি যে একটা গৃহপালিত প্রাণী-সেই পরিচয় না দিয়ে বরং বুনোদের চেয়েও বেশি বন্য প্রমাণ করো। পক্ষান্তরে আমরা শিকারি বাজপাখিরা বুনো হওয়া সত্ত্বেও যেসব মানুষ আমাদের যত্ন করে, খাবার দেয়, লালন পালন করে তাদের কাছে আমরাও পুরোপুরি বিশ্বস্ত এবং অনুগত থাকি। আমরা মানুষের কাঁধে গিয়ে বসি। তারা যা করতে বলে তাই করি। আমরা কোনোভাবেই তাদের ছেড়ে পালিয়ে যাই না। সুতরাং অবশ্যই আমরা বুনো হলেও তোমার মতো গৃহপালিত প্রাণীর চেয়ে অনেক ভালো।

মুরগি বললো: তুমি তো তোমার কারণ ব্যাখ্যা করলে এবার আমাকে আমার গল্পটা বলতে দাও! অনেক সময় লোকজন পরস্পরকে মূল্যায়ন করতে ভুল করে। এর কারণ হলো ভেতর বাহির সম্পর্কে না জানা। যার সম্পর্কে অপবাদ আরোপ করা হয় তার সম্পর্কে সত্যটা না জানা। তারা শুধু বাইরের দিকটা দেখেই মূল্যায়ন করে, একপাক্ষিক মূল্যায়ন হয় সেটা। তুমিও আমার ক্ষেত্রে সেই ভুলটাই করছো। তুমি শুধু আমার দৌড়ানোর দৃশ্যটাই দেখেছো কিন্তু আমার অভিযোগ,অনুযোগ সম্পর্কে কোনো খবরই নেই তোমার। তুমি তো খাবারের কারণেই মানুষের জন্য শিকার করো। আর আমাকে তারা যে দানাপানি দেয় তার বিনিময়ে আমি তাদের ডিম দেই। এ পর্যন্ত তোমার আমার অবস্থান একইরকম। কিন্তু তোমার তো মুরগির বারবিকিউর অগ্নিদহনের অভিজ্ঞতা নেই। আমার স্বজাতি এবং অন্য অনেক পাখিকে আগুণে কাবাব হতে দেখেছি। সে কারণে মৃত্যুর ভয়ে পালাতে চাই। আমাদের মতো তুমিও যদি কাবাব হতে তাহলে তুমিও পালাতে। বাজ বললো: আমি খুবই দু:খিত। তোমার জীবনের দুর্বিসহ অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানা ছিল না। আমাকে ক্ষমা করো। আসলে বাইরের দিক দেখে বিচার করা ঠিক না। ভেতরের খবর জানাটা জরুরি।#

পার্সটুডে/এনএম/৫/৬১

মূল ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ