‘ইমামের সঙ্গে দেখা করার মুহূর্তটি আমার জীবনের শ্রেষ্ট মুহূর্ত’
এবারের ইরান সফর সম্পর্কে বাংলাদেশের দৈনিক আজকের ভোলার সম্পাদক ও আল কুদস কমিটির সহসভাপতি মো: শওকত হোসেন বলেছেন,খুবই ভালো লাগছে। আর আমাদের কাঙিক্ষত ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থার একমাত্র বাস্তবতা কেবল ইরানেই আছে। তাই এখানে এসে মনটা ভরে যায়।
বিশিষ্ট এ সাংবাদিক বলেন, সময়ের ধারায় ইরানে পরিবর্তন হওয়াটা অস্বাভাকি নয়। তবে ইরানে পরিবর্তন হলেও যে মৌলিক বিষয়টি ইরানের রয়েছে সেটি হচ্ছে ইসলামি বিপ্লব আর সেই বিপ্লবের পক্ষে রয়েছে তারা।
ইরানিদের ইসলামি বিপ্লব, দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এসব বিষয় আমাকে আজও খুবই মুগ্ধ করেছে।
রেডিও তেহরান: জনাব মো: শওকত হোসেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সফর করছেন। কেমন লাগছে এখানকার পরিবেশকে?
মো: শওকত হোসেন: নিঃসন্দেহে এবারের সফরে খুবই ভালো লাগছে। কারণ আমাদের যে কাঙিক্ষ ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা-ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থার একমাত্র বাস্তবতা আছে ইরানে। কাজেই স্বাভাবিকভাবে এখানে আসলেই মনটা ভরে যায়।
যখন এখানে সবকিছু দেখি ইসলামি নিয়ম কানুনে চলছে বিশেষ করে যখন মেয়েদেরকে দেখি হিজাব পরে চলছে তখন খুবই ভালো লাগে। তাছাড়া ইরানের সবকিছুতে ইসলামের একটা লেবাস পাওয়া যায়। তবে বহু বছর আগে যখন ইরানে এসেছিলাম তখনও ইসলামি নিয়ম কানুন যেবাবে ছিল এবং এখনও তা আছে আল্লাহর অশেষ রহমতে। এখন তা শেষ হয়ে যায়নি।
এবার ইরান সফরে আসার আগে কেউ কেউ আমাকে বাংলাদেশ থেকে বলেছেন, আপনারা ৩৩ বছর আগে যে ইরান দেখে এসেছেন এখন সেই ইরান নেই। সেই বিপ্লবও নেই এবং সেই ধর্মীয় অনুভূতিও নেই। তবে এখানে এসে বাস্তবে যেটা দেখলাম সেটা হচ্ছে- আসলে অনেক সময় এরমধ্যে অতিবাহিত হয়েছে। উপসাগরীয় স্রোতের ধারাও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সমগ্র পৃথিবীতে এই ৩৩ বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কাজেই ইরানে পরিবর্তন হওয়াটা অস্বাভাকি নয়। তবে ইরানে পরিবর্তন হলেও যে মৌলিক বিষয়টি ইরানের ইসলামি বিপ্লব সেই বিপ্লবের পক্ষে রয়েছে।
ইরানিদের ইসলামি বিপ্লব, দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এসব বিষয় আমাকে আজও খুবই মুগ্ধ করেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ভিত্তি অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে বলে মন্তব্য করলেন এই সংবাদিক।
রেডিও তেহরান: আপনি তো ইসলামি বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনী (র.) বেঁচে থাকাকালীন ইরান সফর করেছিলেন। সে সময় থেকে এখনকার ইরান- কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন?
মো: শওকত হোসেন: দেখুন আমি বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। এবার যখন তেহরানে এসে হোটেলে উঠলাম তখন তারা আমাদেরকে খুব ভালোভাবে অভ্যর্থনা জানালো। চমৎকার আথিতেয়তার নিদর্শন দেখতে পেলাম। এরপর আমি এক বন্ধুকে নিয়ে একটু বাইরে বের হলাম সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখার জন্য।
একটা দোকানে গিয়ে সেখানে বিভিন্ন জিনিষের দরদাম করার সময় এক তরুণকে বললাম আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি এবং ইমাম খোমেনীর মেহমান। সে আমার কথা শুনে একটু হাসল এবং একটা খারাপ প্রতিক্রিয়া করল। তরুণের কথাবার্তাসহ সবকিছুই ভালো কিন্তু সে ইরানের সরকার বা ইমাম খোমেনী সম্পর্কে খুব একটা ভালো কিছু বলল না। তখন আমি তার সাথে একটু ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাইলাম। বল্লাম তুমি কি ইউরোপ আমেরিকা পছন্দ কর। সে তখন খুব খুশি হয়ে বলল হ্যাঁ আমরা ইউরোপ আমেরিকা পছন্দ করি। যুবকটির কথাবার্তা শুনে আমি কিছুটা হতাশ হলাম এবং মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।
এরপর হাঁটতে হাঁটতে আরেকটি দোকানে গিয়ে একই কথা বললাম এবং আরো বল্লাম আমরা ইমাম খোমেনীর মেহমান। একথা শুনে দোকানের লোকটি এগিয়ে এসে আমাদেরকে স্বাদরে গ্রহণ করলেন এবং বললেন ইমাম খোমেনী জিন্দাবাদ। সে তখন বললো ইরানের ইসলামি বিপ্লব আমাদের প্রাণের স্পন্দন। আমরা মরহুম ইমাম খোমেনীর অনুসারী ছিলাম এবং থাকব। তার কথাগুলো শুনে যে বুকভরা হতাশা একটু আগে নিয়ে এসেছিলাম তা থেকে মুক্ত হলাম। আমার ভেতরের দুঃখটা তখন অনেকটা দূর হয়ে গেল। এরপর আরো কয়েক জায়গায় গিয়ে কথাবার্তা বললাম। তাতে দেখলাম সামগ্রিকভাবে এখানকার মানুষের মধ্যে ইসলামের পক্ষের অনুভূতিটা বেশি ।
আমি তখন ভাবলাম- এ বিষয়টা সেই বিপ্লবের সময়ওতো কমবেশি ছিল। ৩৩ বছর আগেও যাদেরকে জেদ্দে ইনকিলাবি বলা হতো অর্থাৎ যারা বিপ্লব বিরোধী ছিল- তাদেরও একটা ক্ষুদ্র অংশ ছিল। কাজেই এতবছর পর এবং তরুণ সমাজের মধ্যে কিছুটা উল্টা পাল্টা হতেই পারে। এটা বিচিত্র কিছু নয়। তাছাড়া প্রযুক্তি এখন এতটাই এগিয়ে গেছে যে বিশ্বের একটা ধারা খারাপের দিকে ছুটে চলেছে। ফলে তরুণদের মধ্যে একটা শ্রেণি কিছুটা ভিন্ন হতেই পারে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে আমার মনে হলো যে ধরনের হতাশার কথা অনেক বাংলাদেশে বলেছিল সে রকম নয়। যেটি দেখলাম তা হচ্ছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ভিত্তি অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের এই গভীরতা দেখে বড় একটা আশাবাদ নিয়ে আমি বাংলাদেশে ফিরে যাব।
রেডিও তেহরান: আমরা যতদূর জানি, আপনি আগের সফরে ইমাম খোমেনীর সঙ্গে সাক্ষাত করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কেমন দেখেছিলেন বিপ্লবের নেতাকে?
মো: শওকত হোসেন: দেখুন বিপ্লবের পর পরই যখন ইরানে এসে ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (র.) কে কেমন দেখেছিলাম তখন- সেই অনুভুতির কথা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমি আমার লেখা বইয়ে- ইরানের ইসলামি বিপ্লব ও ইমাম খোমেনী (র.)’ কে নিয়ে আমার সেই অনুভূতির কথা লিখেছি।
জগতে কিছু মানুষ আছে যাদের কাছে গেলে ভিন্নরকম একটা অনভূতি সৃষ্টি হয়। সেই বিরল মানুষের একজন ছিলেন মরহুম ইমাম খোমেনী(র.)।
আমি তখনও বলেছি যে, শুনেছি প্রত্যেক জামানায় একজন মুজাদ্দেদ থাকেন। বিগত শতাব্দির মুজাদ্দেদ ছিলে হযরত ইমাম খোমেনী(র.)।
কারণ যেদিন ওনাকে দেখলাম সেদিনের অনুভূতি আমার জীবনের শ্রেষ্ট মুহূর্ত। ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ যা আমার স্মৃতির মধ্যে আজও একইভাবে অনুরণিত হয়।
আমরা তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্ররা এসেছিলাম। আমাদের সংখ্যা ছিল অনেক। যে অনুষ্ঠানে আমরা এসেছিলাম- সেটির নাম ছিল ‘বিশ্ব ইসলামি ছাত্র সম্মেলন’। সেই সম্মেলনে আমরা বাংলাদেশ থেকে ৮ জন এসেছিলাম।
আমাদেরকে যখন ইমামের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তখন ভিন্নরকম একটা অনুভূতি এবং পরিবেশ সেখানে সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে ইরানিরা এমনভাবে স্লোগান দিচ্ছিল... আগেই নির্দেশ ছিল কেবলমাত্র গাইড ছাড়া সেখানে কোনো ইরানি যেতে পারবে না। তবে যে কয়জন ইরানি গাইড সেখানে প্রবেশ করেছিল তারাই এমন একটা পরিবেশ তৈরি করেছিল যা আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান। আমার গাইডকে আমি ডেকে জিজ্ঞেস করলাম তোমরা এমন করছ কেন? তারা বললো ইমামের প্রতি ভালোবাসা থেকে আমরা এমনটি করছি। ইমামের প্রতি অনুভূতির বিষয়টি আমরা তখন বুঝেছি। এরপর ইমাম যখন হাত উচুঁ করলেন তখন সবাই শান্ত হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সব স্লোগান বন্ধ হয়ে গেল। ইমাম খোমেনী (র.) তার কথা শুরু করলেন।
তিনি যে আহ্বানটি জানালেন সেটি হচ্ছে- ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামি বিপ্লবের আহ্বান’। তার সে আহ্বানের কথা আমি আমার বইতে লিখেছি এবং বিভিন্ন জায়গায় বলেছি। ইমাম বললেন, আপনাদের অধিকাংশই সুন্নি অধ্যুষিত দেশ থেকে এসেছেন। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এখানে শিয়াদের সংখ্যা বেশি। কিন্তু আপনারা যখন একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন এবং পরিচালনা করবেন তখন আপনাদের নিয়ম অনুযায়ী করবেন।
তখন তিনি লেবাননের উদাহরণ দিয়েছিলেন। যখন লেবানন স্বাধীন হয় তখন ব্রিটিশরা দুই ধর্মকে তিন জাতিতে ভাগ করেছেন। একদিকে খৃষ্ঠান অন্যদিকে মুসলমানদের মধ্যে শিয়া-সুন্নি দুটো জাতি সৃষ্টি করেছেন। আর সেখানকার সংবিধান স্থায়ীভাবে এমনরূপ দেয়া হয়েছে যে মেজরিটি থেকে প্রেসিডেন্ট। মুসলমানদের দুইভাগ করায় খৃষ্টানরা বেশি হওয়ায় তাদের থেকে হবে প্রেসিডেন্ট সুন্নিদের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী আর শিয়াদের মধ্য থেকে স্পিকার।
ইমাম বলেছিলেন, খৃষ্টানদের মধ্যেও তো বিভিন্ন গ্রুপ আছে যেমন ক্যাথলিক প্রটেস্টান ইত্যাদি। তাদেরকে কিন্তু ভাগ করা হয়নি। অথচ মুসলমানদের মধ্যে বিভিক্ত সৃষ্টি করে ওরা প্রেসিডেন্টের পদটি নিয়ে নিল।
ইমাম সেদিন বলেছিলেন, যদি আমরা শিয়া-সুন্নি না হয়ে শুধু মুসলমান হতাম তাহলে লেবাননের তিনটা পদই আমাদের থাকত।
ইমাম আরো বলেছিলেন, শিয়া –সুন্নির বিভক্তিটা আজ নতুন করে হয়নি। বহু আগে থেকে এটা হয়েছে। আমরা তার উত্তরাধিকার। কিন্তু আমাদের বড় দায়িত্ব হচ্ছে শিয়া সুন্নির ভেতরকার ব্যবধানটা কমিয়ে আনা। আমাদের মধ্যে ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে হবে। আর সেই ঐক্যের আহ্বান সেদিন তিনি জানিয়েছিলেন। আমার কাছে বিষয়টি খুবই ভালো লেগেছিল।
আমরা তখন দেখেছিলাম ইরানের যে কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী হয়েছে- তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। আর সেই ঐক্যের আহ্বানে বাংলাদেশও শামিল ছিল। তখন আমরা বাংলাদেশ আল কুদস কমিটি করে আন্তর্জাতিক কুদস দিবস পালন করা শুরু করলাম। আর এরমূলে ছিল ইমাম খোমেনি (র.) ঐক্যের আহ্বান।
আমি মনে করি সেই ঐক্যের পরিবেশটা এখন অনেক বিঘ্নিত হয়েছে। এখন সারা বিশ্বজুড়ে আমাদের শক্ররা আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য, বিরোধকে আরো বাড়িয়ে দেয়ার জন্য নানারকম ষড়যন্ত্র করছে। তারা চেষ্টা করছে যাতে পৃথিবীর বুকে আর কোনো ইসলামিক রাষ্ট্র না হতে পারে, প্রকৃত ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা যেন আর কোনো দেশে না হতে পারে সেজন্য তারা ষড়যন্ত্র করছে। মুসলমানদের শক্র আমেরিকা এবং পাশ্চাত্য একটার পর একটা ষড়যন্ত্র করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে।
আমরা দেখছি একটার পর একটা নাটক তারা সৃষ্টি করছে। একসময় দেখলাম আমেরিকার সৃষ্টি তালেবান নাটক। তারপর দেখলাম আল কায়েদার নাটক।এখন দেখছি আইএসআইএল বা দায়েশ। আর প্রতিটি নাটক পরিচালিত হচ্ছে বাইরে থেকে। আর তাদের প্রধান কাজ হচ্ছে মুসলামানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করা। মুসলমানদের গায়ে, ইসলামের গায়ে সশস্ত্র ও সহিংসতার ছাপ লাগিয়ে দেয়া। তাদের উদ্দেশ্য এরমাধ্যমে সারাবিশ্বে ইসলামকে নিন্দিত করা। এমনকি মুসলমানদের মধ্যেও সংশয় সৃষ্টি করা যে আসলেই কি ইসলাম সন্ত্রাসের ধর্ম! আর এই নাটকে তারা বিজয়ী হচ্ছে। আর বিশ্বব্যাপী অনৈক্যের একটা প্রতিযোগিতা চলছে।
এ অব্স্থায় একমাত্র ইরানই ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে। আমি ইসলামি ইরানের নেতৃবৃন্দের কাছে আহ্বান জানাবো যে ইমাম খোমেনী (র.) যে যে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন সেই ঐক্যকে আরো শক্তিশালী করার জন্য এখানকার নেতারা যেন উদ্যোগ নেন।
শিয়া-সুন্নির মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির যে চেষ্টা চলছে সেটাকে দূর করার জন্য বিশ্বব্যাপী শিয়া-সুন্নি নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। কোনোভাবেই যেন শিয়া ও সুন্নি নেতারা আমেরিকার ষড়যন্ত্রের জালে পা না দেন। তারা প্রত্যেকে যেন ইমাম খোমেনী (র.) ঐক্যের আদর্শকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৫