জুন ২৬, ২০১৬ ১৫:০৭ Asia/Dhaka

পুলিশের ক্রসফায়াকে স্পষ্ট বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়ার আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক।

রেডিও তেহরানের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ক্রসফায়ারের ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যকে আমরা কিসসা বলে মনে করি। কারণ ১০ থেকে ১২ বছর ধরে পুলিশ একই বক্তব্য দিচ্ছে এবং একই ধরনের ঘটনা ঘটছে।

শাহদীন মালিক বলেন, কোনো হত্যার ঘটনা ঘটলেই- কেবল দিন তারিখ এবং অভিযুক্তদের নাম বদলে একটি কিসসা তারা বলছে। তবে তাদের এ বক্তব্য মানুষ আর বিশ্বাস করে না। তবে হ্যাঁ ক্রসফায়ারের দুই একটা ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একদিন না একদিন বিচার হবেই।

রেডিও তেহরান: জনাব ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশে সম্প্রতি বেশ কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এগুলোকে কেউ বলছেন ক্রসফায়ার আবার কেউ বলছেন বেআইনিভাবে হত্যা; কেউ বলছেন এটি আইনের শাসনের পরিপন্থি। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ড. শাহদীন মালিক: দেখুন, আসলে ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারের কথাটি বলছে পুলিশ। প্রায় ১০ থেকে ১২ ধরে বাংলাদেশে পুলিশের দ্বারা যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে সেগুলোর প্রতিটি ঘটনায় একইধরনের কিসসা তারা দাঁড় করাচ্ছে। পুলিশ বলছে তাকে নিয়ে আমরা এক জায়গায় যাচ্ছিলাম তখন তার সহযোগিরা আমাদের ওপর আক্রমণ করে এবং গোলাগুলি শুরু করে এবং আমরা আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়ি। তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি নিহত হয়। গত বারো বছরে এ ধরনের প্রায় বারো শ’রও বেশি ঘটনা ঘটেছে। আর সে কারণে ক্রসফায়ারের ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যকে আমরা কিসসা বলছি। কোনো হত্যার ঘটনা ঘটলেই- কেবল দিন তারিখ এবং অভিযুক্তদের নাম বদলে একটি কিসসা তারা বলছে।

ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার অর্থে পুলিশ বলছে, তাদেরকে আক্রমণ করা হয়েছে। তবে গত কয়েকবছর ধরে পুলিশের কাছে কোনো হত্যার ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তাদের যে দাবি ক্রসফায়ারের কিসসা সেটা আর কেউ বিশ্বাস করে না। হয়তো দুই একটা ঘটনা ঘটতেই পারে কিন্তু শতকরা ৯৫ থেকে ৯৭ ভাগ ঘটনা একইরকমভাবে ঘটবে –জনগণ এটাকে কিসসাই মনে করে। এটাকে সুস্পষ্টভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা চলে।

পুলিশ কাউকে নিয়ে যাচ্ছে এবং তারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ওই ব্যক্তি দোষী এবং সে অপরাধ করেছে ফলে তাকে শাস্তি দিতে হবে। আর পুলিশ সেই শাস্তি নির্ধারণ করছে। আর সেই শাস্তি দেয়ার জন্য তাকে গুলি করে হত্যা করছে।

রেডিও তেহরান: সরকার-বিরোধীদল সবাই এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে। তাহলে এ হত্যাকাণ্ড কার বা কাদের সিদ্ধান্তে চলছে?

ড. শাহদীন মালিক: দেখুন যারা সরকার চালায় তাদের ভেতরকার একাংশ থাকে যারা মনে করে আমাদেরকে আইন কানুন মেনে সরকার পরিচালনা করতে হবে। আরেকাংশ মনে করে না আইন কানুন মানার দরকার নেই; আমাদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য যা আছে তাতে সিদ্ধি লাভ করতে হবে। আর তাতে যদি আইন কানুন মানা না হয় কিন্তু দেশের উপকার হয়-তাহলে অসুবিধা কোথায়!

দেখুন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর বহুদেশে হয়েছে বহু সময় হয়েছে। যখন অপরাধ প্রবল হয়ে উঠেছে তখন অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক মনে করেছেন যে এদেরকে মেরে ফেললেই সমাধান হবে এই চিন্তা থেকে অনেকসময় এ ধরণের কাজগুলো হয়ে থাকে। তবে যারা এটা করে তারা বুঝতে পারে না যে এভাবে মানুষ মেরে ফেলে সমস্যার সমাধান করা যায় না।

রেডিও তেহরান: যেসব প্রেক্ষাপট থেকে ক্রসফায়ারের ঘটনা চালু হয়েছে এবং চলছে আপনার কী মনে হয় এর মাধ্যমে সেসব সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে বা যাবে?

ড. শাহদীন মালিক: না, এরমাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তবে এটা শুরু হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল তখন ২০০২ সালের অক্টোবর মাসের‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’র মাধ্যমে। তখন সেনাবাহিনীসহ যৌথবাহিনীকে মাঠে নামিয়ে দিল ভয়ঙ্কর সব অপরাধীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য। ওই সময় ৫৭ জন নিহত হয়েছিল। পরে আইন করে বলা হয়েছিল এই যে ৫৭ জন নিহত হয়েছে তাদের ব্যাপারে কেউ কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে না।

বিশেষত সেন্ট্রাল আমেরিকায় এবং দক্ষিণ আমেরিকায় এধরণের ক্রসফায়ার দিয়ে সেখানকার সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। উপরন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত দিকগুলো ভেঙ্গে পড়েছে। সমাজে বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং আইন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা সমাজ বর্বর ও সহিংস হয়ে উঠেছে। তো আমরা কিন্তু ওই পথে যাচ্ছি। গত দু তিন বছরের তুলনায় চলতি বছরের ৬ মাসের মধ্যে ক্রসফায়ারের ঘটনা অনেক বেড়েছে। কথার কথা- বলা যায় সাম্প্রতিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শতাধিক ব্যক্তি মারা গেছে। ফলে এতে সমাজে সহিংসতা বাড়ে। কারণ যে সমাজ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দিকে গেছে সে সমাজে অপরাধ সহিংসতা বেড়ে গেছে বর্বরতা বেড়ে গেছে।

রেডিও তেহরান: মাদারিপুরে জঙ্গি সন্দেহে আটক ফাইজুল্লাহ ফাহিমের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার যে দাবি করা হয়েছে তাতে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার। আর দশটা ঘটনার সঙ্গে এর পার্থক্যটা কোথায়?

ড. শাহদীন মালিক: দেখুন দেশের মানুষ অবশ্যই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। একইসাথে আমার মনে হয় জঙ্গিবাদকে ক্রসফায়ারে মাধ্যমে এটি আইনের মাধ্যমে নির্মূল করতে হবে। বেআইনি পথে আইনি কোনো কিছু অর্জন করা যায় না।

আর ফাইজুল্লাহ ফাহিমের বিষয়টি খুব বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এইজন্য যে- বয়সে খুবই তরুণ এবং অনেকটা ইনোসেন্ট চেহারার তাছাড়া তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গির অন্য কোনো অভিযোগ ছিল না। সে কারণে আমার মনে হয় কম বয়সি একটি তরুণকে গুলি করে মেরে ফেলার কারণে তার প্রতি সমবেদনটা একটু বেশি হয়েছে।

আর অন্য যেকথাগুলো বলা হচ্ছে যে তার মাধ্যমে অন্যান্য জঙ্গিদের খুঁজে বের করা যেত এ কথাটা খানিকটা কল্পনাপ্রসূত হয়ে যায়।

আমি এ ব্যাপারে বলব যে, সে তো পুলিশি রিমান্ডে মারা গেছে। খুবই নিষ্ঠুরভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। এজন্য তার প্রতি সমবেদনাটা অনেক বেশি।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা আপনি যে রিমান্ডের কথা বললেন, তো রিমান্ডে থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার দায় আসলে কার এবং এর আইনগত দিকটা আসলে কি?

ড. শাহদীন মালিক: দেখুন রিমান্ড বিষয়ে ২০১৩ সালের একটি আইন আছে। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন ২০১৩। এ আইনে বলা আছে হেফাজতে কারো মৃত্যু হলে ওই ব্যক্তির কোনো আত্মীয় স্বজন যদি আদালতে গিয়ে অভিযোগ করে সেক্ষেত্রে আদালতকে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে আইন আছে ঠিকই কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে এখনও অনেকেই অভিযোগ করতে সাহস পায় না। আর সে কারণে ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থার নেযার ঘটনা ঘটেনি। তবে এ ব্যাপারে সরকারেরও উচিত ছিল ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

রেডিও তেহরান: এই ক্রসফায়ারের পরিণতি কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়? এটি বন্ধের উপায়ই বা কী?

ড. শাহদীন মালিক: আপাতত সরকার এটা বন্ধ করবে বলে আমার মনে হয় না। আর এর পরিণতি বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেভাবে হচ্ছে তাই হবে। সত্তুর, আশি এবং নব্বুই’র দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরণের ঘটনায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানরা যারা জড়িত ছিলেন বা দায়িত্বে ছিলেন তাদের এখন বিচার হচ্ছে এবং শাস্তি হচ্ছে। আফ্রিকার দুটি দেশের রাষ্ট্রনায়কের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য এখন জেল হয়েছে।

তো আমাদের দেশেও আজ হোক বা কাল হোক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিচার হয়ে শাস্তি হবেই।সমাজকে উন্নত করতে হলে এবং এগিয়ে নিতে হলে সমাজের বড় অপরাধগুলোর কোনো না কোনো সময় শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যে যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটেছে এতদিন পর হলেও সমাজ তার বিচারের ব্যবস্থা করেছে এবং বিচার হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি সমাজে যখন কোনো অন্যায় সংঘটিত হয় তখন হয়তো তার বিচার হয় না কিন্তু পরবর্তীতে ঠিকই তার বিচার হয়। সমাজকে এগিয়ে যেতে হলে একদিন না একদিন অপরাধের বিচার করতে হবে।এ ছাড়া কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র এগিয়ে যেতে পারে না। আর এই সমাজে যারা ক্ষমতায় থাকেন তারা মনে করেন যে তারা বিচারের উর্ধ্বে। তাদেরকেও বিষয়টা বুঝতে হবে যে আজকে হয়তো বিচার হচ্ছে না কিন্তু তারা যদি ১০/২০ বা ৩০ বছর বেঁচে থাকেন সেক্ষেত্রে একদিন না একদিন তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে। বিচার ছাড়া কোনো সমাজ এগোতে পারে না।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২৬