জুলাই ১১, ২০১৬ ১৫:২৩ Asia/Dhaka

আল-কুদস ও ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য দখলদার ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে এবং সংগ্রাম করতে হবে। প্রতিরোধের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রতিরোধ আন্দোলন কখনও ব্যর্থ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন আব্দুল কাদির সালেহ।

লন্ডন প্রবাসী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার সালেহ বলেন, জবরদখলকারী ইসরাইলের কাছ থেকে আল-কুদস ও ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার একমাত্র পথ হচ্ছে প্রতিরোধ আন্দোলন। আর প্রতিরোধে আন্দোলনে হামাস সফল হবে বলে আমি মনে করি।

রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আল-কুদসকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন সেটাই হচ্ছে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রধান ইস্যু এবং একমাত্র ইস্যু। আর সেটাকে জোরালোভাবে আকঁড়ে ধরলে মুসলমানরা একত্রিত হতে পারবে।

আবদুল কাদের সালেহ্‌'র পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব আবদুল কাদের সালেহ, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনী (র) পবিত্র রমজান মাসের শেষ শুক্রবারকে কুদস দিবস ঘোষণা করেছিলেন। সে সময়কার বাস্তবতায় এ ঘোষণা কতটা যুগোপযোগী ছিল? এখনই বা তার গুরুত্ব কতটা?

আব্দুল কাদির সালেহ: দেখুন যে সময় আল আকসাকে মুক্ত করার জন্য ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার জন্য কুদস দিবসের ঘোষণা দেয়া হয় সেটা ছিল অত্যন্ত সময়পোযোগী সিদ্ধান্ত। কারণ মুসলিম বিশ্ব তখন শতোধা বিভক্ত ছিল। তাদের অধিকারের বিষয়ে তারা একমত হতে পারছিল না। ঠিক এমন সময় এমন একটা ইস্যু প্রয়োজন ছিল যে ইস্যুতে দল-মত নির্বিশেষে সমস্ত মুসলমান একটি পয়েন্টে একমত হতে পারে।

আর এটা স্পষ্ট যে আল-আকসা ইহুদিরা দখল করে আছে। এটা ছিল মুসলমানদের। আল-আকসাকে মুক্ত করার জন্য বিশ্ব মুসলমানদের একসাথে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো কথা থাকতে পারে না। সে কারণে যখন এই দিবসটি ঘোষণা করা হয়- তখন সেটা ছিল বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য সংহতির প্রতীক। এর মাধ্যমেই দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালানো হয়। ফলে সে সময় আল-কুদসের ডাক ছিল অত্যন্ত সময়পোযোগী। কারণ এর মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় মুসলমানরা প্রতিবাদ জানিয়েছে। আর এর প্রয়োজনীয়তা এখনও একইরকমভাবে আছে। যে কারণে আজও দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রেডিও তেহরান: ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখনো মনে করে- মুসলিম বিশ্বের প্রধান সমস্যা 'কুদস ও ফিলিস্তিন'। এর পাশাপাশি ইরান মনে করে-দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক হচ্ছে কুদস শরিফ। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

আব্দুল কাদির সালেহ: আসলে আল- কুদস দিবস বা আল-কুদসকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন সেটাই হচ্ছে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রধান ইস্যু এবং একমাত্র ইস্যু। আর সেটাকে জোরালোভাবে আকঁড়ে ধরলে মুসলমানরা একত্রিত হতে পারবে। ফলে আমি মনে করি আল কুদস দিবসের প্রয়োজনীয়তা এখনও আছে। আমি মনে করি মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এবং মুসলমানরা যদি এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে, বুঝতে পারে এবং এরসাথে সম্পৃক্ত হতে পারে ততই দ্রুত ফিলিস্তিনকে মুক্ত করা ও আল কুদসকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

রেডিও তেহরান: কুদস শরিফকে ইহুদিকরণের জন্য ইহুদিবাদীরা আল-আকসা মসজিদ ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় খনন কাজসহ নানা ধরণের ধবংসাত্মক তৎপরতা চালাচ্ছে। এছাড়া, গত কয়েকদিন ধারাবাহিকভাবে আল-আকসা মসজিদে হামলা চালিয়েছে ইহুদিবাদীরা এবং মুসলমানদের সব ধরনের ইবাদত বন্দেগিতে বাধা দিচ্ছে। এর অবসানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের কী করণীয় রয়েছে?

আব্দুল কাদির সালেহ: মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে আমি বলব-এর বিরুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা। যার মাধ্যমে ইসরাইলের ওপর রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা যায় সেজন্য একসাথে বসা। তারপর এ ব্যাপারে স্ট্রাটেজি নির্ধারণ করা।

কারণ ইসরাইল প্রায় ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর যে কাজ করে যাচ্ছে তা নিন্দনীয়, গর্হিত, অমানবিক, মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন।এটা তারা করে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববাসী তাদের এই জবরদখলকারী মানসিকতা এবং তাদের কর্মকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এটি খুবই বড় সমস্যা। আর সেজন্য নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত হতে হবে। তাছাড়া যেকথা বললাম যে একসাথে বসে ইসরাইলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

রেডিও তেহরান: আপনি নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, সম্প্রতি তুরস্ক এবং ইসরাইল সম্পর্কোন্নয়নের জন্য চুক্তি করেছে। প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের মহাসচিব মোস্তফা বারগুছি বলেছেন, চুক্তিতে খুশি হওয়ার মতো কিছু নেই ফিলিস্তিনিদের জন্য। তুরস্কের এ চুক্তিকে অনেকে আপস চুক্তি বলছেন। আপনার অভিমত কী?

আব্দুল কাদির সালেহ: দেখুন গত প্রায় এক শতক ধরে বহু চুক্তি, বহু সিদ্ধান্ত এবং বহু টেবিল টক দেখেছি কিন্তু এগুলোর মধ্যমে মুসলমানদের জন্য কার্যকর কোনো ফায়দা আসেনি। এজন্য কিছু আলোচনা, কিছু চুক্তি, কিছু বৈঠক এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। বর্তমান সময়ে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্যই হচ্ছে বড় সমস্যা। মুসলমানদের মধ্যে যে বিভক্তি সেটাকে পুঁজি করে সুযোগ নিচ্ছে ইহুদিবাদী ইসরাইল।

আমি মনে করি ইসলামি যে শক্তিগুলো আছে যেমন ইরান, ইরাক, সৌদি আরব, জর্দান, তুরস্ক এরা যদি একত্রিত হয়ে লিড করতে পারত সেটা হত খুব বড় একটা বিষয়। কিন্তু কাউকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ইসরাইলের সাথে চুক্তি করলে বা সম্পর্ক স্থাপন করলে তার দ্বারা লাভবান হওয়া যাবে বলে আমি মনে করি না।

আমি মনে করি সমস্ত মুসলমান একত্রিত হয়ে কিভাবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে চাপ প্রয়োগ করতে পারে এবং সামগ্রিক প্রচেষ্টা চালাতে পারে সেই দিকে আমাদের এগোনো উচিত।

রেডিও তেহরান: ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের জন্য শান্তি পরিকল্পনার অভাব নেই। কিন্তু এসব শান্তি পরিকল্পনা যে ব্যর্থ হয়েছে তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। এর বিপরীতে গাজাভিত্তিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছে হামাস ও ইসলামি জিহাদ আন্দোলনের মতো কিছু সংগঠন। সামসাময়িক প্রেক্ষাপটে এই প্রতিরোধ আন্দোলনকে আপনি কিভাবে দেখেন? তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটা?

আব্দুল কাদির সালেহ: যেকোনো অন্যায় বা জবরদখলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ সঠিক বলে আমি মনে করি না। সেজন্য ইসরাইলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে হামাসের আন্দোলন অত্যন্ত সময়পোযোগী। আর ইসরাইলের জন্য একটি প্রতিরোধের ব্যুহ তারা তৈরি করেছে। আমি মনে করি তারা তাদের অধিকার আদায়ের যে দৃঢ়তা এবং শক্তিমত্তা তারা দেখিয়েছে এটা যদি অব্যাহত থাকে এবং মুসলমানদের সমর্থন তাদের পেছনে থাকে তাহলে অবশ্যই তারা বিজয়ী হবে। তবে কখনও ইসরাইলের সাথে আপোশ করে দাবি আদায় করা যাবে বা পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যাচারীদের সাথে সমঝোতা করে দাবি আদায় করা যায় এমন নজির নেই।

অবশ্যই দাবি আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে এবং সংগ্রাম করতে হবে। প্রতিরোধের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর তখনই কেবল জবরদখলকারীরা বুঝতে পারবে যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব না। আর যতক্ষণ পর্যন্ত দখলদার ইসরাইলিরা টিকে থাকার সুযোগ পাবে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা জবরদখল চালিয়েই যেতে থাকবে।

পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা কলোনিয়াল শাসনগুলোতে এ চিত্র দেখেছি। ব্রিটেন –ফ্রান্সসহ অন্যান্যরা সারা বিশ্বকে কলোনি করে রাখতে সফল হয়েছিল ততদিন যতদিন- তাদের বিরুদ্ধে জোরদার প্রতিরোধ হয়নি। যখনই কড়া প্রতিরোধ হয়েছে প্রতিবাদ হয়েছে তখন তারা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।

ঠিক তেমনি বর্তমানেও আমি মনে করি ফিলিস্তিনে ইসরাইলি জবরদখলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, স্বাধীকার এবং নিজ ভূমি ফিরিয়ে আনার জন্য হামাসের যে আন্দোলন সেটি অত্যন্ত কার্যকর। এর বাইরে আলোচনা করে দাবি জানিয়ে ফিলিস্তিনের মুক্তি আসতে পারে না।

আর সম্ভাবনার যে কথা বলছেন সে বিষয়ে আমি বলব, আসলে প্রতিরোধ আন্দোলন কখনও ব্যর্থ হয় না। হতে পারে কখনও প্রতিরোধ আন্দোলনে কখনও কখনও সময় লাগতে পারে কিন্তু কখনও ব্যর্থ হয় না। আমি হামাসের আন্দোলনের মধ্যে যে দৃঢ়তা ও বলিষ্টতা দেখেছি তাছাড়া লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের যে তীব্রতা দেখেছি তা কখনও ব্যর্থ হতে পারে না। অবশ্যই তারা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে বলে আমি মনে করি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১১